Gemini-generated summary of each chapter, in Bengali.

Chapter 1

গভীর রাতে যুবরাজ উদয়াদিত্য তাঁর স্ত্রী সুরমার কাছে রাজপরিবারে জন্মগ্রহণের জন্য নিজের দুঃখ এবং হতাশা প্রকাশ করছেন। তিনি তাঁর পিতা প্রতাপাদিত্যের কাছ থেকে স্নেহ না পেয়ে কেবলই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং নিজেকে রাজ্যশাসনের অযোগ্য মনে করেন। সুরমা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, উদয়াদিত্য মনে করেন যে তাঁর পিতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল তাঁর উপর চাপ বাড়িয়েই চলবে।

উদয়াদিত্য তাঁর অসুখী শৈশবের কথা এবং রায়গড়ে দাদামশাইয়ের কাছে আশ্রয় পাওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি রুক্মিণী নামের এক বিধবার সঙ্গে তাঁর অতীতের এক ভুলের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন, যা তাঁর জীবনকে কলঙ্কিত করেছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি তাঁর স্ত্রী সুরমার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান, কারণ সুরমাই তাঁকে হতাশা থেকে উদ্ধার করে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছেন। শেষে, তিনি রাজপ্রাসাদে সুরমার অপমান ও লাঞ্ছনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এই পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন, কিন্তু সুরমা তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে থাকাতেই তাঁর আনন্দ।

গভীর রাতে উদয়াদিত্যের বোন বিভা আতঙ্কিত অবস্থায় এসে এক ভয়ংকর সর্বনাশের খবর দেয়। পিতার ক্রোধের ভয় সত্ত্বেও উদয়াদিত্য তৎক্ষণাৎ সাহায্যের জন্য বেরিয়ে যান। বিভা তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করলেও সুরমা স্বামীর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। উদয়াদিত্য চলে যাওয়ার পর, সুরমা ভীত বিভাকে সান্ত্বনা দেয় এবং অসহায়ের সহায় ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে।

Chapter 2

মহারাজ প্রতাপাদিত্য তাঁর মন্ত্রীকে তাঁর কাকা বসন্ত রায়কে হত্যার আদেশের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করছেন। মন্ত্রী দ্বিধা প্রকাশ করলে, প্রতাপাদিত্য ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন যে ম্লেচ্ছদের (মোগলদের) মিত্র এবং বংশের কলঙ্কস্বরূপ বসন্ত রায়কে হত্যা করা আর্যধর্ম রক্ষা এবং বঙ্গদেশকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য একটি পবিত্র কর্তব্য। তিনি পৌরাণিক উদাহরণ দিয়ে নিজের কাজকে সমর্থন করেন। পরিশেষে, বর্ণনাকারী প্রকাশ করেন যে মন্ত্রীর দ্বিধাটি আসলে নৈতিক ছিল না, বরং রাজার আস্থা অর্জনের একটি কৌশল ছিল।

মহারাজ প্রতাপাদিত্যের মন্ত্রী তাঁকে তাঁর কাকা বসন্ত রায়কে হত্যার পরিকল্পনা থেকে বিরত করার চেষ্টা করেন। মন্ত্রী দিল্লীর সম্রাটের ক্রোধ এবং প্রজাদের বিদ্রোহের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু প্রতাপাদিত্য সমস্ত আপত্তি উড়িয়ে দিয়ে ক্রুদ্ধ হন এবং বলেন যে তিনি ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি মন্ত্রীকে ভয় দেখিয়ে তাঁকে তাঁর সংকল্প থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করতে বারণ করেন এবং কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দিল্লীশ্বরের নাম উচ্চারণ করতেও নিষেধ করে দেন।

মন্ত্রী মহারাজ প্রতাপাদিত্যকে জানান যে যুবরাজ উদয়াদিত্য আগের রাতে একা প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেছেন এবং এখনও ফেরেননি। এই সংবাদে প্রতাপাদিত্য অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি উদয়াদিত্যকে 'স্ত্রৈণ' বলে উপহাস করেন এবং তার দুর্বল চরিত্রের জন্য তার মাতুল বংশ ও শ্রীপুরের সঙ্গে বিবাহকে দায়ী করেন। প্রহরীদের কর্তব্যে গাফিলতির জন্য তিনি মন্ত্রীকে দায়ী করেন এবং হুমকি দেন। এরপর মন্ত্রী জানান যে দিল্লীর সম্রাটের কাছে রাজার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, যা শুনে প্রতাপাদিত্য তাচ্ছিল্যের সাথে ঘোষণা করেন যে অভিযোগকারী যেই হোক, তিনিই তার বিচার করবেন।

Chapter 3

উদয়াদিত্য তাঁর কাকা বসন্ত রায়কে আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচাতে বিদ্যুৎবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে শিমুলতলীর এক চটিতে (সরাইখানা) পৌঁছান। সেখানে পৌঁছেই তাঁর বিশ্বস্ত ঘোড়াটি ক্লান্তিতে মারা যায়। তিনি চটিতে বসন্ত রায়কে খুঁজে পান না। পথে বসন্ত রায়ের এক অনুচর, রতনের সাথে তাঁর দেখা হয় এবং তিনি জানতে পারেন যে বসন্ত রায় আগেই যশোরের দিকে রওনা হয়ে গেছেন। উদয়াদিত্য তখন পথের কাদায় পায়ের ছাপ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং রতনের ঘোড়া নিয়ে একা এগিয়ে যান।

Chapter 4

নির্জন পথে একাকী বৃদ্ধ বসন্ত রায় তাঁর পালকির কাছে এক পাঠান প্রহরীর সাথে আলাপচারিতায় মগ্ন। বসন্ত রায় পাঠানের কৃত্রিম বিনয় ও কাব্যচর্চায় মুগ্ধ হয়ে তাকে একজন সম্ভ্রান্ত কিন্তু দুর্ভাগা ব্যক্তি বলে মনে করেন। তিনি নিজের সঙ্গীতপ্রীতি ও নাতি-নাতনিদের প্রতি গভীর স্নেহের কথা বলেন এবং সেতার বাজিয়ে গান শোনান। অন্যদিকে, পাঠান প্রহরীটি, যে আসলে একজন গুপ্তঘাতক, মনে মনে বসন্ত রায়কে হত্যা করার পুণ্য এবং তাঁর উদারতার সুযোগ নিয়ে নিজের ভাগ্য ফেরানোর সম্ভাবনার মধ্যে দ্বিধাগ্রস্ত হয়।

উদয়াদিত্য তাঁর দাদামশাই বসন্ত রায়কে খুঁজে পান। তখন প্রতাপাদিত্যের পাঠানো গুপ্তঘাতক পাঠানটি নিজের ষড়যন্ত্রের কথা স্বীকার করে এবং প্রাণভিক্ষা চায়। উদার বসন্ত রায় তাকে ক্ষমা করে দেন। এরপর, উদয়াদিত্যের নিষেধ সত্ত্বেও, বসন্ত রায় প্রতাপাদিত্যকে এই ভয়ঙ্কর পাপ থেকে বিরত করার জন্য যশোরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ ভাইপোর প্রতি তাঁর স্নেহ অক্ষুণ্ণ ছিল।

বসন্ত রায়ের অনুচরেরা ফিরে এসে জানায় যে পাঠান প্রহরীটি তাদের প্রতারণা করে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল। তারা বিশৃঙ্খলভাবে ঘটনাটি বর্ণনা করে, আর উদার বসন্ত রায় তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। উদয়াদিত্য ধৈর্য ধরে তাদের কথা শোনেন। প্রতারিত অনুচরেরা শেষে দাবি করে যে তারা আগে থেকেই পাঠানটির উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিল।

Chapter 5

প্রতাপাদিত্য তাঁর কাকা বসন্ত রায়ের হত্যার খবর পেতে অধৈর্য হয়ে ওঠেন। তিনি উদয়াদিত্যের অবাধ্যতার জন্য তার স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়িকে দায়ী করেন। একজন হত্যাকারী ফিরে এসে জানায় যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যদিও সে নিজে তা দেখেনি। রাজা এই খবর গোপন রাখার নির্দেশ দিলে, মন্ত্রী যুক্তি দেন যে এটি প্রকাশ পাবেই। রাজার ক্রোধের মুখে মন্ত্রী পদত্যাগের প্রস্তাব দিলে রাজা শান্ত হন। প্রমাণ লোপাটের জন্য হত্যাকারীদের মেরে ফেলার প্রস্তাব দিলে মন্ত্রী তার বিরোধিতা করেন। পরিশেষে, রাজা প্রজাদের ভয় পান না বলে দম্ভ করলেও, মন্ত্রী মনে মনে রাজার আসল ভয়টি উপলব্ধি করে হাসেন।

প্রতাপাদিত্য তাঁর কাকা বসন্ত রায়ের মৃত্যুর পর রায়গড়ের সিংহাসন দখলের কথা ভাবার সময়েই মৃত বলে ধরে নেওয়া বসন্ত রায় তাঁর সামনে উপস্থিত হন। প্রতাপাদিত্য তাঁকে দেখে ভূত ভেবে হতবাক ও নির্বাক হয়ে যান। বসন্ত রায় তাঁকে আশ্বস্ত করেন এবং তাঁকে হত্যার চেষ্টার জন্য নিজের গভীর দুঃখ প্রকাশ করে এই পাপ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেন। প্রতাপাদিত্য নিরুত্তর ও অনুশোচনাহীন থাকলে, বসন্ত রায় প্রসঙ্গ পরিবর্তন করেন। হঠাৎ, প্রতাপাদিত্য গুপ্তঘাতক পাঠানটিকে পালাতে দেখে তাঁর চেপে রাখা ক্রোধ প্রকাশ করেন এবং তাকে ধরার জন্য চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

প্রতাপাদিত্য আগের রাতের ঘটনার জন্য অজুহাত খুঁজতে প্রথমে মন্ত্রীকে অকারণে তিরস্কার করেন এবং প্রহরীদের কারাবাসের দণ্ড দেন। পরে তিনি অন্তঃপুরে গিয়ে উদয়াদিত্যের অবাধ্যতার জন্য মহিষীকে দোষারোপ করেন। মহিষী সমস্ত দোষ পুত্রবধূ সুরমার উপর চাপিয়ে দেন। এরপর উদয়াদিত্যকে ডেকে, তাঁর সামনেই সুরমাকে তাঁর দুর্ভাগ্যের কারণ বলে অপমান করা হয় এবং একজন দাসী সুরমার বিরুদ্ধে জাদু-টোনা করার অভিযোগও তোলে। এই অপমানে সুরমা নীরবে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। পরে, মহিষী রাজাকে জানান যে তিনি উদয়াদিত্যকে বুঝিয়ে বলেছেন এবং তাঁর 'চোখ খুলে গেছে', যা ছিল পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা।

Chapter 6

সুরমা তার ননদ বিভার মন খারাপের কারণ বুঝতে পারে। বিভা তার স্বামী রামচন্দ্র রায়ের কথা ভেবে দুঃখিত, কারণ তার বাবা প্রতাপাদিত্য তাকে আমন্ত্রণ জানাননি এবং সম্মান দেননি। সুরমা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলে, বিভা আবেগের বশে তার স্বামীর অপমান এবং নিজের অসহায়তার কথা প্রকাশ করে কেঁদে ফেলে। শেষে সুরমা তাকে স্নেহ ও মমতা দিয়ে শান্ত করে।

অনেকক্ষণ মন খারাপ করে থাকার পর বিভা ধীরে ধীরে শান্ত হয়। এমন সময় তার দাদামশাই বসন্ত রায় এসে উপস্থিত হন। তিনি গান গেয়ে এবং মজা করে বিভার মন ভালো করার চেষ্টা করেন। সুরমাও এই ঠাট্টা-তামাশায় যোগ দেয়। বসন্ত রায়ের টাক নিয়ে রসিকতার এক পর্যায়ে, সাধারণত চুপচাপ থাকা বিভাও কথা বলে এবং হেসে ওঠে, যা দেখে তাঁর দাদামশাই খুব খুশি হন।

সুরমা বিভার দুঃখের কথা তার দাদামশাই বসন্ত রায়কে বলতে চেষ্টা করে। বিভা ঠাট্টা করে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চায় এবং ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর সুরমা গম্ভীরভাবে বসন্ত রায়কে জানায় যে, স্বামী রামচন্দ্র রায়কে আমন্ত্রণ না জানানোয় এবং অপমান করায় বিভা মনে মনে খুব কষ্ট পায় ও লুকিয়ে কাঁদে। এই কথা শুনে বসন্ত রায় অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং তৎক্ষণাৎ বিভার সাথে দেখা করতে চান।

বিভাকে কাঁদতে দেখে তার দাদামশাই বসন্ত রায় কারণ জানতে চান এবং তার নিষেধ সত্ত্বেও, প্রতাপাদিত্যের কাছে গিয়ে বিভার স্বামী রামচন্দ্র রায়কে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য বলেন। প্রতাপাদিত্য বিনা আপত্তিতে রাজি হন। পরে বসন্ত রায় বিভার মন ভালো করার চেষ্টা করেন এবং রাজপরিবারের অবিশ্বাস সত্ত্বেও উদয়াদিত্যের ছোট ভাই সমরাদিত্যকেও স্নেহে বশ করেন।

Chapter 7

চন্দ্রদ্বীপের রাজা রামচন্দ্র রায়ের রাজসভায়, ভাঁড় রমাই সেনাপতি ফর্ণাণ্ডিজকে নিয়ে একটি ঠাট্টা শুরু করে। সে এক চোরের গল্প বলে যে সেনাপতির বাড়িতে ঢুকেছিল এবং সেনাপতির ভীরুতা ও নির্বুদ্ধিতার কারণে সহজেই সব চুরি করে নিয়ে যায়। রাজা ও মন্ত্রী এই গল্প শুনে হাসিতে ফেটে পড়েন, আর সেনাপতিকে বাধ্য হয়ে হাসতে হয়, যা রাজার অন্যতম প্রধান বিনোদন।

রাজা রামচন্দ্র রায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ভাঁড় রমাই প্রথমে শ্বশুরবাড়ির প্রশংসা করে এবং পরে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে স্থূল রসিকতা করে। এরপর সে সেনাপতি ফর্ণাণ্ডিজকে তাঁর ভীরুতা নিয়ে উপহাস করে। রাজা রমাই ও সেনাপতি উভয়কেই তাঁর সাথে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে আদেশ দেন।

রাজা রামচন্দ্র রায় তাঁর ভাঁড় রমাইয়ের সাথে শ্বশুরবাড়িতে তাঁর পূর্বের অপমান নিয়ে আলোচনা করেন। রমাইয়ের একটি বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে খুশি হয়ে রাজা এই বাচনিক জয়কে আসল যুদ্ধের সমান গুরুত্ব দেন এবং আসন্ন যাত্রায় জেতার সংকল্প করেন। তিনি তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য রমাইকে প্রতাপাদিত্যের অন্তঃপুরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁর দেহরক্ষীদের প্রধান হিসেবে শক্তিশালী রামমোহন মালকে নিযুক্ত করেন, যাকে রমাই ভয় পায়।

Chapter 8

যশোর রাজবাড়িতে জামাই রামচন্দ্র রায়ের আগমনের জন্য সাজ সাজ রব। মহিষী আনন্দের সাথে তাঁর মেয়ে বিভাকে সাজাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর পুরোনো দিনের রুচি বিভার অস্বস্তির কারণ হচ্ছে। তিনি বিভার চুলের সাজ পছন্দ না হওয়ায় পুত্রবধূ সুরমাকে হিংসার জন্য দায়ী করেন। বিভা তার আনন্দ ও অস্বস্তি নিয়ে দিশেহারা। উদয়াদিত্য ও বসন্ত রায় বিভার এই সলজ্জ আনন্দ দেখে অত্যন্ত খুশি হন এবং বসন্ত রায় রসিকতা করে পরিবেশ হালকা করেন।

প্রতাপাদিত্য তাঁর জামাই রামচন্দ্র রায়কে অভ্যর্থনা জানানোর ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। এই সামান্য আয়োজন ও ছোট হাতি দেখে রামচন্দ্র রায় নিজেকে অপমানিত বোধ করেন। তাঁর ভাঁড় রমাই প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে ব্যঙ্গ করলে, দেহরক্ষী রামমোহন মাল রেগে যায়, কিন্তু রাজা রামচন্দ্র রায় রমাইকে থামানোর বদলে তার রসিকতায় আমোদ পান।

রামচন্দ্র রায় তাঁর শ্বশুর প্রতাপাদিত্যের দ্বারা অপমানিত বোধ করেন এবং তাঁর সামনে নিজের গুরুত্ব জাহির করার সংকল্প করেন। কিন্তু প্রতাপাদিত্য তাঁকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, রাজকার্যের আলোচনায় ব্যস্ত থেকে এবং তাঁকে অবজ্ঞার সাথে অন্তঃপুরে পাঠিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে ক্ষমতার দম্ভে নয়, বরং শীতল ঔদাসীন্য ও ব্যক্তিত্বের জোরেই তিনি শ্রেষ্ঠ।

Chapter 9

রামচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষী রামমোহন মাল অন্তঃপুরে বিভার সাথে দেখা করে। তাদের মধ্যে স্নেহপূর্ণ কথাবার্তা হয়, রামমোহন বিভাকে চন্দ্রদ্বীপের গল্প শোনায় এবং একটি আগমনী গান গেয়ে তাকে ও মহিষীকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। পরে, জামাই রামচন্দ্র রায় অন্তঃপুরে এলে পুরনারীরা তাঁকে ঘিরে ধরে হাসি-ঠাট্টা ও জ্বালাতন শুরু করে। পরিস্থিতি চরমে উঠলে, একজন প্রৌঢ়া রমণী তাঁর পক্ষ নিয়ে অন্যদের তীক্ষ্ণ ভাষায় আক্রমণ করে তাড়িয়ে দেয়, যার ফলে রামচন্দ্র রায় স্বস্তি পান।

ভাঁড় রমাই নারীর ছদ্মবেশে অন্তঃপুরে ধরা পড়ে যাওয়ায় রাজা রামচন্দ্র রায়ের উপর প্রতাপাদিত্য প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন এবং তাঁকে হত্যার আদেশ দেন। শ্যালকের অনুরোধে তিনি আদেশ বদলে পরদিন সকালে হত্যার নির্দেশ দেন। শ্যালক বিভাকে সতর্ক করতে যান। এদিকে, স্বামীর ঔদাসীন্যে ব্যথিত বিভাকে কাঁদতে দেখে রামচন্দ্র রায়ের মন গলে যায় এবং তিনি তাকে সান্ত্বনা দেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের দরজায় বিপদ এসে উপস্থিত হয়।

Chapter 10

শ্যামলক রমাপতির কাছে নিজের আসন্ন মৃত্যুদণ্ডের খবর পেয়ে রামচন্দ্র রায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। রমাপতি তাঁকে তৎক্ষণাৎ পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বিভা সব জানতে পেরে ভয়ে ভেঙে পড়ে। রমাপতি পালানোর পথ খুঁজতে গেলে, রামচন্দ্র রায় একাকী অন্ধকারে আততায়ীর ভয়ে কাঁপতে থাকেন এবং এমনকি নিজের শ্যালককেও সন্দেহ করতে শুরু করেন। শেষে, বিভা সাহায্যের জন্য তার দাদা উদয়াদিত্যের কাছে ছুটে যায়।

আতঙ্কিত বিভা তার দাদা উদয়াদিত্যের কাছে ছুটে এসে কেঁদে পড়ে। তারা জানতে পারে যে মহারাজ প্রতাপাদিত্য বিভার স্বামী রামচন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সুরমার পরামর্শে, উদয়াদিত্য তাঁর দাদামশাই বসন্ত রায়কে ঘুম থেকে তোলেন। খবর শুনে হতবাক বসন্ত রায় প্রতাপাদিত্যের সাথে কথা বলতে এবং এই ভয়ঙ্কর কাজ থেকে তাঁকে বিরত করতে রাজি হন।

বসন্ত রায় তাঁর ভাইপো প্রতাপাদিত্যের কাছে জামাই রামচন্দ্র রায়ের প্রাণভিক্ষা করতে আসেন। প্রতাপাদিত্য প্রচণ্ড রেগে রামচন্দ্রের কাজকে রাজবংশের জন্য চরম অপমান বলে ব্যাখ্যা করেন এবং মৃত্যুদণ্ডের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি বসন্ত রায়কেও মোগলদের সঙ্গে মিত্রতার জন্য তিরস্কার করেন। তখন বসন্ত রায় বিভার দুঃখের কথা ভেবে নিজের জীবন দিয়ে রামচন্দ্রকে বাঁচানোর প্রস্তাব দেন। প্রতাপাদিত্য কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে যান এবং পালানোর সমস্ত পথ বন্ধ করার জন্য রাজপ্রাসাদের খাল বন্ধ করার নির্দেশ দেন, যা তাঁর নিষ্ঠুর সংকল্পকেই প্রকাশ করে।

Chapter 11

রামচন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আশঙ্কায়, উদয়াদিত্য, সুরমা, বিভা ও বসন্ত রায় তাঁকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে কিন্তু প্রাসাদের সব দরজা বন্ধ পায়। হতাশ হয়ে তারা বিভার ঘরে প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেয়। সুরমার পরামর্শে উদয়াদিত্য বলপ্রয়োগ করে পথ বের করতে যান। উদয়াদিত্য চলে যাওয়ার পর, সুরমা একা তার স্বামীর সুরক্ষার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে এবং অশুভ লক্ষণ দেখে আতঙ্কিত হয়। অন্যদিকে, রামচন্দ্র রায় নিজের বিপদের জন্য তাঁর ভৃত্য রামমোহনকে মনে মনে দোষারোপ করতে থাকেন।

উদয়াদিত্য বলপ্রয়োগে প্রাসাদের প্রহরীকে পরাস্ত করে পালানোর পথ তৈরি করেন। তিনি রামচন্দ্র রায়ের বিশ্বস্ত দেহরক্ষী রামমোহন মালের সাথে দেখা করেন। ক্রুদ্ধ রামচন্দ্র রায় বিপদের জন্য রামমোহনকে দায়ী করে তাকে বরখাস্ত করেন, কিন্তু রামমোহন তাঁর প্রতি অটল আনুগত্য প্রকাশ করে তাঁকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হয়।

রামচন্দ্র রায়কে বাঁচানোর জন্য রামমোহন প্রথমে ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে উদয়াদিত্যের বুদ্ধিতে, কয়েকটি মোটা চাদর দিয়ে দড়ি তৈরি করা হয়। রামচন্দ্রকে পিঠে নিয়ে সেই দড়ি বেয়ে রামমোহন ছাদ থেকে নিচের খালে থাকা নৌকায় নামার জন্য প্রস্তুত হয়।

রামমোহন দড়ির সাহায্যে রামচন্দ্র রায়কে নিয়ে ছাদ থেকে নৌকায় নামিয়ে দেয়, যা দেখে বিভা অজ্ঞান হয়ে যায়। প্রহরীরা তাদের পালানো দেখেও নিজেদের অকর্মণ্যতা ও বিশৃঙ্খলার কারণে আটকাতে ব্যর্থ হয়। নৌকা আনতে পাঠানো প্রহরী পথে তামাক খায় এবং দেনা আদায় করতে যায়। যখন নৌকা আসে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। ভোরের দিকে, ফর্ণাণ্ডিজের ছোড়া কামানের শব্দে প্রতাপাদিত্যের ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি দেখেন যে প্রহরীরাও পালিয়েছে।

Chapter 12

প্রতাপাদিত্য ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে তাঁর জামাই রামচন্দ্র রায় পালিয়ে গেছেন এবং প্রহরীরাও হয় পলাতক অথবা বন্দী। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মন্ত্রী রাজার ক্রোধ থেকে বাঁচতে ভাঁড় রমাইকে রাজার সামনে উপস্থিত করেন, কিন্তু প্রতাপাদিত্য রমাইকে দেখে অত্যন্ত বিরক্ত ও ঘৃণাবশত তাকে অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে দিতে বলেন। এরপর তিনি পলাতক প্রহরীদের খুঁজে বের করার এবং অন্তঃপুরের বন্দি প্রহরীদের তাঁর সামনে হাজির করার নির্দেশ দেন।

রামচন্দ্র রায়ের পলায়নের পর, উদয়াদিত্য, সুরমা, বিভা এবং অত্যন্ত বিচলিত বসন্ত রায় বিনিদ্র রজনী যাপন করেন। বিভ্রান্ত এবং অপরাধবোধে জর্জরিত বসন্ত রায় উদয়াদিত্যকে রক্ষা করার জন্য প্রহরীকে কাবু করার দায় নিজের কাঁধে নিতে চান। এক প্রহরী, সীতারাম, এতে রাজি হয়। কিন্তু অন্য প্রহরী, ভাগবত, প্রথমে নৈতিকতার দোহাই দিয়ে অস্বীকার করলেও বসন্ত রায়ের দেওয়া ঘুষ পেয়ে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে যায়।

প্রতাপাদিত্য পলায়ন-কাণ্ডে যুক্ত দুই প্রহরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রহরী সীতারাম ভয়ে যুবরাজ উদয়াদিত্যের নাম বলে ফেলে। বসন্ত রায় উদয়াদিত্যকে বাঁচাতে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলেন। প্রতাপাদিত্য উদয়াদিত্যকে দুর্বল ও পরনির্ভরশীল মনে করে শাস্তি দেওয়ার অযোগ্য বলেন, কিন্তু বসন্ত রায়কে হুমকি দেন যেন তিনি আর উদয়াদিত্যের সাথে দেখা না করেন। তিনি উদয়াদিত্যকে একা করার জন্য তাঁর স্ত্রী সুরমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নেন।

Chapter 13

প্রতাপাদিত্য উদয়াদিত্যের সাথে বসন্ত রায়ের দেখা করা নিষিদ্ধ করলে, বসন্ত রায় বিদায় জানাতে আসেন। উদয়াদিত্য এই বিচ্ছেদের সম্ভাবনায় ভেঙে পড়েন। এরপর উদয়াদিত্য তাঁর স্ত্রী সুরমার কাছেও বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় প্রকাশ করেন। সুরমা দৃঢ়ভাবে তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে মৃত্যু ছাড়া কেউ তাদের আলাদা করতে পারবে না এবং এই বিশ্বাসে সে নিজের মনকে শক্ত করে।

উদয়াদিত্য তাঁর স্ত্রী সুরমার কাছে দাদামশাই বসন্ত রায়ের সঙ্গে বিচ্ছেদের সম্ভাবনায় দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বসন্ত রায়ের দয়ালু স্বভাবের স্মৃতিচারণ করেন। পরে তাঁরা বিভার ঘরে গিয়ে দেখেন, বিভা তাঁর দাদামশাইয়ের পাকা চুল তুলে দিচ্ছে এবং বসন্ত রায় জীবন ও মৃত্যুর দর্শন নিয়ে একটি গান গাইছেন।

বসন্ত রায় তাঁর নাতি-নাতনিদের কাছ থেকে বিদায় নিতে আসেন। তিনি রসিকতা করে ও গান গেয়ে পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা করলেও বিভার কান্না দেখে নিজেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। অবশেষে, কথা বলতে না পেরে এবং সেতার বাজাতে ব্যর্থ হয়ে, তিনি উদয়াদিত্যকে তাঁর সেতারটি দিয়ে যান এবং অশ্রুসজল চোখে পালকিতে উঠে বিদায় নেন।

Chapter 14

রাজবাড়ির দাসী মাতঙ্গিনী, মঙ্গলা নামের এক গ্রাম্য মহিলার কাছে আসে, যে জাদু-টোনা জানে বলে পরিচিত। নিজের প্রেমঘটিত সমস্যার কথা বলার পর, মাতঙ্গিনী রাজবাড়ির gossip শুরু করে। সে যুবরানি সুরমার নামে মিথ্যা দোষারোপ করে বলে যে, সুরমার জন্যই রাজা রামচন্দ্র রায় পালিয়ে গেছেন এবং এই কারণে মহারাজ প্রতাপাদিত্য সুরমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে চান। এই সুযোগে, মঙ্গলা সুরমার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র করার পরিকল্পনা করে এবং রাজবাড়িতে প্রবেশ করার জন্য মাতঙ্গিনীর সাহায্য চায়।

Chapter 15

বসন্ত রায় চলে যাওয়ার পর বিভা দুঃখে ভেঙে পড়ে এবং রাজবাড়িকে আর নিজের ঘর বলে মনে করতে পারে না। এদিকে, যুবরাজ উদয়াদিত্য তাঁর কারণে কর্মচ্যুত প্রহরী সীতারামের দুর্দশার কথা শুনে তাকে এবং অন্য প্রহরী ভাগবতকে মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। এই খবর পেয়ে মহারাজ প্রতাপাদিত্য ক্রুদ্ধ হন এবং উদয়াদিত্যকে এই সাহায্য বন্ধ করার কঠোর নির্দেশ দেন। উদয়াদিত্য এই আদেশে ব্যথিত হলেও, তাঁর স্ত্রী সুরমা স্বামীর সম্মান ও কর্তব্যরক্ষার জন্য গোপনে প্রহরী পরিবারদের সাহায্য চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেন। সুরমা এক বিশ্বস্ত দাসীর মাধ্যমে এই কাজ করলেও, দাসীটি গ্রামের জাদু-টোনা জানা মহিলা মঙ্গলার কাছে সব বলে দেয়, যা ভবিষ্যতের ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করে।

Chapter 16

প্রহরীদের গোপনে সাহায্য করার কথা জানতে পেরে প্রতাপাদিত্য সুরমাকে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার আদেশ দেন। সুরমা প্রথমে যেতে অস্বীকার করেন, কিন্তু যখন প্রতাপাদিত্য উদয়াদিত্যকে কারারুদ্ধ করার হুমকি দেন, তখন শাশুড়ির কাছে এই খবর পেয়ে স্বামীর সুরক্ষার জন্য সুরমা যেতে রাজি হন। এই সিদ্ধান্ত সুরমা এবং উদয়াদিত্যের মধ্যে এক হৃদয়বিদারক বিদায়ের পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে তারা আসন্ন বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েন।

Chapter 17

গল্পের শুরুতে উল্লিখিত রুক্মিণীই যে আসলে মঙ্গলা, তা প্রকাশ পায়। সে যুবরাজ উদয়াদিত্যের উপর প্রতিশোধ ও ক্ষমতা লাভের আশায় ষড়যন্ত্র করে। মহিষী যখন উদয়াদিত্যের মন ফেরানোর জন্য মঙ্গলার কাছে বশীকরণের ঔষধ চান, তখন মঙ্গলা সেই সুযোগে বিষ তৈরি করে। সুরমার বিদায়ের আগের দিন সন্ধ্যায়, সেই বিষ প্রয়োগে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং উদয়াদিত্যের কোলে মাথা রেখে মারা যায়। খবর পেয়ে অনুতপ্ত মহিষী ছুটে আসেন এবং সুরমাকে 'ঘরের লক্ষ্মী' বলে সম্বোধন করে থেকে যেতে অনুরোধ করেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। উদয়াদিত্য তাঁর মৃত স্ত্রীর পাশে সারারাত নির্বাক হয়ে বসে থাকেন।

Chapter 18

সুরমার মৃত্যুর পর তার ননদ বিভা ও স্বামী উদয়াদিত্য শোকে ভেঙে পড়েন। দুজনেই সুরমার অনুপস্থিতি তীব্রভাবে অনুভব করেন। বিভার দুঃখ দেখে উদয়াদিত্য তাকে তার শ্বশুরবাড়ি চন্দ্রদ্বীপে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু প্রতাপাদিত্য অহংকারের বশে রাজি হন না; তিনি বলেন যে জামাই রামচন্দ্র রায়ের পরিবার থেকে লোক এসে মেয়েকে 'ভিক্ষা' না চাইলে তিনি পাঠাবেন না। রাজমহিষী মেয়ের জন্য চিন্তা করে রাজাকে অনুরোধ করলেও, প্রতাপাদিত্য তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

Chapter 19

রাজা রামচন্দ্র রায় মান-অপমান বিষয়ে অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। তুচ্ছ কারণে তিনি বিশাল কাণ্ড বাধিয়ে দেন, যেমন পালকি দেখে উঠে না দাঁড়ানোয় দুজন তাঁতীকে শাস্তি দেওয়া বা সামান্য ভুল করায় শ্বশুড়বাড়ির চাকরদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা। তাঁর রাজসভায় এখন প্রতিদিন শ্বশুর প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। একদিন এক দরিদ্র প্রজাকে প্রতাপাদিত্য সংক্রান্ত আলোচনার জন্য তলব করা হয় এবং ভাঁড় রমাই প্রতাপাদিত্যের বংশকে অপমান করে রাজাকে খুশি করে। অবশেষে, রাজা সন্তুষ্ট হয়ে সেই প্রজাকে ক্ষমা করে দেন।

রাজা রামচন্দ্র রায়ের সভায় মন্ত্রী ও ভাঁড় রমাই প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে থাকে। বর্ণনাকারী রামচন্দ্রের অগভীর ও আত্মকেন্দ্রিক চরিত্রের বিশ্লেষণ করেন। রামচন্দ্র তাঁর প্রাণরক্ষাকারী উদয়াদিত্যের প্রতি অকৃতজ্ঞ, কারণ তিনি মনে করেন জগৎ তাঁর জন্যই সৃষ্ট। তিনি তাঁর স্ত্রী বিভার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করলেও, অহংকার, লোকের কথার ভয় এবং শ্বশুর প্রতাপাদিত্যের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছার কারণে তাঁকে ফিরিয়ে আনতে দ্বিধা করেন।

রাজসভার ভাঁড় ও মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর, রাজার বিশ্বস্ত দেহরক্ষী রামমোহন মাল এসে তাঁর স্ত্রী বিভাকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনুমতি চায়। রাজা প্রতাপাদিত্যের মেয়েকে ফিরিয়ে আনলে সম্মানহানি হবে বলে আপত্তি করেন। কিন্তু রামমোহন আবেগ ও যুক্তির সাথে বোঝায় যে, নিজের স্ত্রীকে পরের ঘরে ফেলে রাখাই আসল অসম্মান। তার তীব্র যুক্তিতে পরাস্ত হয়ে এবং তার ক্রোধ দেখে, রাজা অবশেষে বিভাকে আনার জন্য গোপনে অনুমতি দেন, তবে শর্ত দেন যে এই খবর যেন আপাতত মন্ত্রী বা ভাঁড় রমাই না জানতে পারে, কারণ তিনি উপস্থিত লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে চান।

Chapter 20

সুরমার মৃত্যুর পর যুবরাজ উদয়াদিত্য গভীর শোকে ভেঙে পড়েন এবং তাঁর বোন বিভা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে। এই শোক উদয়াদিত্যকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। তিনি তাঁর পিতা প্রতাপাদিত্যের প্রতি এক необ্যাখ্যেয় ভয়ে আক্রান্ত হন, যার ফলে তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলেন এবং আগের মতো প্রজাদের রক্ষা করতে বা সাহায্য করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। এই ভয় তাঁর ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়।

Chapter 21

কর্মচ্যুত প্রহরী সীতারাম একজন শৌখিন কিন্তু কপর্দকশূন্য লোক। সে তার আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে বিধবা মঙ্গলার (রুক্মিণী) কাছে যায়, যে সুদে টাকা খাটায়। সীতারাম নানা বড়াই ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে মঙ্গলার কাছ থেকে টাকা ধার চায়। মঙ্গলা, যে সীতারামের আসল অবস্থা জানে, সে মনে মনে হেসে তাকে টাকা ধার দেয়, কারণ সে জানে এই টাকা আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

মঙ্গলার কাছ থেকে আপাত স্নেহ পেয়ে উৎসাহিত হয়ে, সীতারাম তার সাথে রসিকতা ও প্রেম করার চেষ্টা করে। সে নিজেকে 'জগন্নাথ' এবং মঙ্গলাকে 'সুভদ্রা' বলে, যা শুনে মঙ্গলা তাকে তার বোকামির জন্য তিরস্কার করে। এরপর মঙ্গলার কথায় সীতারাম ভালোবাসার নানা সম্বোধন আওড়ায়। কিন্তু যখনই সে ধার করা টাকার সুদের কথা জিজ্ঞাসা করে, মঙ্গলা ভালোবাসা নিয়ে ব্যবসার কথা তোলার জন্য কপট রাগ দেখায়। এতে ঘাবড়ে গিয়ে সীতারাম দাবি করে যে সে আসলে ঠাট্টা করছিল।

সীতারাম ও রুক্মিণী (মঙ্গলা) একটি গোপন ষড়যন্ত্র করে। এক ঝড়ের রাতে, রুক্মিণী শোকসন্তপ্ত উদয়াদিত্যের ঘরে প্রবেশ করে। উদয়াদিত্য প্রথমে তাকে সুরমার আত্মা ভেবে ভুল করেন। রুক্মিণী তাঁকে পুরোনো সম্পর্কের দোহাই দিয়ে নিজের সর্বনাশ করার জন্য অভিযুক্ত করে এবং তাঁর ভালোবাসা দাবি করে। যখন সে উদয়াদিত্য ও সুরমার বিছানায় বসতে যায়, উদয়াদিত্য তাকে বাধা দেন এবং তার থেকে মুক্তি পেতে নিজের আঙুলের আংটি খুলে দিয়ে দেন। রুক্মিণী চলে গেলে, উদয়াদিত্য সুরমার জন্য শোকে ভেঙে পড়েন।

Chapter 22

কর্মচ্যুত প্রহরী ভাগবত ও সীতারাম একটি ষড়যন্ত্র করে। তারা युवराज উদয়াদিত্যের নামে একটি জাল দরখাস্ত তৈরি করে, যাতে দেখানো হয় যে উদয়াদিত্য তাঁর পিতা প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে সম্রাটের কাছে অভিযোগ করে রাজ্য দখল করতে চাইছেন। এই কাজে তারা রুক্মিণীর কাছ থেকে পাওয়া উদয়াদিত্যের সীলমোহর যুক্ত আংটি ব্যবহার করে। কিন্তু ধূর্ত ভাগবত সীতারামকে না জানিয়ে সেই জাল দরখাস্তটি প্রতাপাদিত্যের কাছে নিয়ে যায় এবং বলে যে সে উদয়াদিত্যের এক ভৃত্যের কাছ থেকে এটি উদ্ধার করেছে। এই মিথ্যা আনুগত্য দেখিয়ে সে রাজার বিশ্বাস অর্জন করে এবং পুনরায় রাজবাড়িতে চাকরি পায়।

Chapter 23

রামচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষী রামমোহন মাল শোকার্ত বিভাকে চন্দ্রদ্বীপে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আসে। প্রথমে রাজি হলেও, ভাই উদয়াদিত্যের গভীর দুঃখ ও একাকিত্ব দেখে বিভা নিজের সিদ্ধান্ত বদলায়। ভাইয়ের কষ্টের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে, তাঁকে একা ফেলে রেখে নিজের সুখের জন্য যেতে অস্বীকার করে এবং তাঁর পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

ভাই উদয়াদিত্যের শোকে তাঁর পাশে থাকার জন্য বিভা চন্দ্রদ্বীপে ফিরে যেতে অস্বীকার করে, যা রামমোহনকে হতাশ ও ক্রুদ্ধ করে। বিভা দুঃখে ছায়ার মতো জীবনযাপন করতে থাকে। এই সুযোগে, প্রহরী ভাগবত একটি জাল দরখাস্ত দেখিয়ে প্রতাপাদিত্যকে বোঝায় যে উদয়াদিত্য তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। প্রতাপাদিত্য পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও, সাবধানতা হিসেবে উদয়াদিত্যকে কারারুদ্ধ করার আদেশ দেন।

Chapter 24

রামচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষী রামমোহন মাল একাকী চন্দ্রদ্বীপে ফিরে এলে রাজা রামচন্দ্র রায় প্রচণ্ড রেগে যান। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর শ্বশুর প্রতাপাদিত্য বিভাকে পাঠাতে অস্বীকার করে তাঁকে অপমান করেছেন। কিন্তু রামমোহন জানায় যে প্রতাপাদিত্য বাধা দেননি, বরং বিভা নিজেই ভাইয়ের দুঃখের সময়ে তাঁকে ছেড়ে আসতে রাজি হননি। এই অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখ্যান রামমোহনের মনে গভীরভাবে আঘাত করে এবং সে রাজার সামনে কেঁদে ফেলে।

বিভা চন্দ্রদ্বীপে ফিরে আসতে অস্বীকার করায় রাজা রামচন্দ্র রায় প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন। তিনি এই ঘটনায় নিজেকে অপমানিত বোধ করেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকেন। এই খবর প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারাও রাজার অপমানের প্রতিশোধ চায়। সভায় মন্ত্রী রাজাকে আবার বিয়ে করার পরামর্শ দেন এবং ভাঁড় রমাই সেই কথায় সায় দিয়ে বিভাকে উপহাস করে। রাজা ও সভাসদরা এতে আমোদ পেলেও, বর্ণনাকারী রাজার সম্মান রক্ষার অগভীর ধারণা নিয়ে মন্তব্য করেন।

রাজা রামচন্দ্র রায়ের দ্বিতীয় বিবাহের সিদ্ধান্ত হয়, যা তাঁর শ্বশুর প্রতাপাদিত্য এবং স্ত্রী বিভার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে দেখা হয়। ভাঁড় রমাই এই পরিস্থিতি নিয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা করে, যা সভাসদদের আনন্দ দেয়। দেওয়ানজির একটি রসিকতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, কিন্তু রাজার দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।

Chapter 25

উদয়াদিত্যকে রাজপ্রাসাদের সংলগ্ন একটি অট্টালিকায় বন্দী করে রাখা হয়। তাঁর বোন বিভা, পরিবারের এই দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে, তাঁর সাথে দেখা করতে এসে সান্ত্বনা খোঁজে। বিভা নিজেকে ভাইয়ের সেবায় উৎসর্গ করে, যা উদয়াদিত্যের বন্দী জীবনে কিছুটা আনন্দ নিয়ে আসে। কিন্তু নিজের দুর্দশায় বোনকে জড়িয়ে ফেলার জন্য উদয়াদিত্য অপরাধবোধে ভোগেন। অবশেষে, তিনি বিভাকে নিজের সুরক্ষার জন্য শ্বশুরবাড়ি চলে যেতে অনুরোধ করেন, কিন্তু বিভার নীরবতা দেখে বোঝেন যে, তাঁর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সে তাঁকে ছেড়ে যাবে না।

Chapter 26

অপমানিত বোধ করে রামচন্দ্র রায় প্রতাপাদিত্যকে একটি চিঠি লেখেন, যাতে তিনি বিভাকে ত্যাগ করার কথা জানান। রামমোহন এই চিঠি নিয়ে যেতে অস্বীকার করলে, নয়নচাঁদ নামে এক বৃদ্ধকে পাঠানো হয়। নয়নচাঁদ ভয় পেয়ে চিঠিটি সরাসরি রাজমহিষীকে দেন। পুত্র উদয়াদিত্যের কারাবাস ও কন্যা বিভার দুঃখে এমনিতেই জর্জরিত মহিষী এই চিঠি পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। তিনি প্রতাপাদিত্যের কাছে গিয়ে ঘুরিয়ে বিষয়টি তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু রাজার ক্রোধ দেখে আসল কথা বলতে ভয় পেয়ে যান। পরিবর্তে তিনি উদয়াদিত্যের মুক্তি ও বিভার ভবিষ্যৎ নিয়ে আকুতি জানালে, বিরক্ত প্রতাপাদিত্য তাঁকে ফিরিয়ে দেন।

Chapter 27

উদয়াদিত্যের কারাবাসের খবর পেয়ে, ষড়যন্ত্রকারী সীতারাম তার সহযোগী রুক্মিণীকে দায়ী করে এবং তাকে হুমকি দেয়। সে যুবরাজকে মুক্ত করার জন্য রায়গড়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে। সীতারামের এই অধিকারবোধ দেখে রুক্মিণী প্রচণ্ড রেগে যায় এবং তাকে ব্যর্থ করার সংকল্প করে।

রায়গড়ের প্রাসাদে একা বসে, নাতি-নাতনিদের থেকে বিচ্ছিন্ন বসন্ত রায় অস্তগামী সূর্যের দিকে চেয়ে তাঁর একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা নিয়ে একটি গান গাইছেন। তাঁর চিরসঙ্গী সেতারটি আর তাঁর সাথে নেই। তিনি সেইসব সুখের দিনের কথা স্মরণ করছেন যখন তিনি তাঁর আনন্দ নাতি-নাতনিদের সাথে ভাগ করে নিতেন, কিন্তু এখন সেই স্মৃতিগুলো তাঁকে আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছে কারণ তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছেন।

একা থাকা বসন্ত রায়ের সাথে খাঁ সাহেব নামে এক চাটুকার দেখা করতে আসে। বসন্ত রায় নিজের একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা প্রকাশ করেন, যা তাঁর ভাঙা সেতারের রূপকের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। পরে একটি গানে মেতে উঠলেও, কর্মচ্যুত প্রহরী সীতারামের আগমনে তিনি চমকে ওঠেন এবং নাতি-নাতনিদের (উদয়াদিত্য ও বিভা) খবর জানতে চান।

কর্মচ্যুত প্রহরী সীতারামের কাছে যুবরাজ উদয়াদিত্যের কারাবাসের খবর শুনে বসন্ত রায় সম্পূর্ণ হতবাক ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাসই করতে পারেন না যে তাঁর প্রিয় নাতি কারাগারে বন্দী। শোকে বিহ্বল হয়ে তিনি সীতারামকে বারংবার একই প্রশ্ন করতে থাকেন এবং শেষে দুঃখে ভেঙে পড়ে উদয়াদিত্যকে নিজের কাছে ডেকে নেন।

Chapter 28

উদয়াদিত্যের কারাবাসের খবর শুনে বসন্ত রায় পরের দিনই যশোরে আসেন। নাতনি বিভাকে দেখে তাঁর প্রাথমিক আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়, কারণ পারিপার্শ্বিক নীরবতা ও বিভার মুখের ভাব সব দুঃসংবাদ সত্যি বলে প্রমাণ করে। সুরমার শূন্য ঘরের দিকে তাকিয়ে, তিনি পরিবারের এই চরম দুর্দশার মুখোমুখি হন এবং দুঃখে ভেঙে পড়ে একটি করুণ গান গেয়ে ওঠেন যে, তিনিই শুধু একা পড়ে আছেন।

বসন্ত রায় তাঁর নাতি উদয়াদিত্যকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রতাপাদিত্যের কাছে কাতর অনুরোধ করেন। তিনি প্রতাপাদিত্যকে তাঁর শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আবেগপ্রবণ আবেদন জানালেও, প্রতাপাদিত্য পাথরের মতো নির্দয় থাকেন। শেষে, বসন্ত রায় শুধু একবার উদয়াদিত্যের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইলেও, প্রতাপাদিত্য সেই তুচ্ছ অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন। প্রতাপাদিত্য উদয়াদিত্যের প্রতি এই সহানুভূতিকে নিজের বিরুদ্ধাচরণ বলে মনে করেন এবং আরও কঠোর ও একগুঁয়ে হয়ে ওঠেন।

প্রতাপাদিত্যের কাছ থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা বিষণ্ণ বসন্ত রায়কে তাঁর নাতনি বিভা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। নিজের দুঃখ আড়াল করতে বসন্ত রায় রসিকতা করেন। এরপর রানীমা তাঁকে ডেকে পাঠালে তিনি মহিষীর ঘরে যান, আর বিভা কারাগারে যায় (উদয়াদিত্যের কাছে)।

মহিষী তাঁর জামাই রামচন্দ্র রায়ের লেখা একটি চিঠি বসন্ত রায়কে দেখান, যেখানে বিভাকে ত্যাগ করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ছেলের কারাবাস ও মেয়ের এই অপমানের আশঙ্কায় ভেঙে পড়া মহিষীকে বসন্ত রায় পরামর্শ দেন যে, মান-অপমানের কথা না ভেবে বিভাকে অবিলম্বে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। তাঁরা একটি উপায় বের করেন: তাঁরা প্রচার করবেন যে রামচন্দ্র বিভাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে চিঠি পাঠিয়েছেন, যাতে বিভা যেতে রাজি হয় এবং রামচন্দ্রের রাগও কমে যায়।

Chapter 29

সীতারাম এসে বসন্ত রায়কে এক গোপন ও জরুরি খবর দেয় এবং তাঁকে তৎক্ষণাৎ নিজের সঙ্গে যেতে বলে। বসন্ত রায় ইতস্তত করেন এবং নাতনি বিভার সঙ্গে দেখা করতে চান, কিন্তু সীতারাম জানায় যে দেরি করলে ভয়ানক বিপদ হবে। অবশেষে, বসন্ত রায় রাজি হন এবং সীতারামের সাথে প্রাসাদ ত্যাগ করেন।

কারাগারে বন্দী উদয়াদিত্য তাঁর বোন বিভাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় মগ্ন। তাঁর ভয় হয়, হয়তো বিভা তাঁকে বোঝা মনে করতে শুরু করেছে। এই মানসিক যন্ত্রণার মধ্যেই হঠাৎ কারাগারে আগুন লাগার খবরে শোরগোল ওঠে। কর্মচ্যুত প্রহরী সীতারাম এসে তাঁকে উদ্ধার করে। দীর্ঘদিন পর খোলা আকাশের নিচে এসে উদয়াদিত্য মুক্তির আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েন এবং অসহায়ের মতো সীতারামের কাছে পথনির্দেশ চান।

কারাগার চত্বরে আগুন লাগায় প্রচণ্ড বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। প্রহরীরা উদয়াদিত্যের ঘরের পাহারা ছেড়ে আগুন নেভাতে যায়। এই সুযোগে এক মহিলা (রুক্মিণী) উদয়াদিত্যের পালানোর খবর সবাইকে জানানোর চেষ্টা করে, কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। বরং, আগুন লাগানো দুষ্কৃতীদের একজন তাকে মারধর করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মহিলাটি এক ভয়ংকর মূর্তি ধারণ করে এবং জ্বলন্ত কাঠ দিয়ে লোকটিকে আক্রমণ করে।

Chapter 30

সীতারামের সাহায্যে কারাগার থেকে পালিয়ে উদয়াদিত্য খালের ধারে নৌকার কাছে তাঁর দাদামশাই বসন্ত রায়ের সাথে মিলিত হন। প্রথমে তিনি পালাতে অস্বীকার করলেও, বোন বিভার দুঃখের কথা শুনে রাজি হন এবং পিতা, মাতা ও বোনের জন্য তিনটি চিঠি লেখেন। নৌকায় ওঠার মুহূর্তে, উন্মত্ত রুক্মিণী (মঙ্গলা) এসে তাদের আক্রমণ করে এবং সীতারামকে আহত করে। শেষে, সে তাদের অভিশাপ দিয়ে খালের জলে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে। এই ভয়ংকর অশুভ ঘটনার মধ্যেই উদয়াদিত্য ও বসন্ত রায় নৌকায় চেপে পালিয়ে যান।

Chapter 31

উদয়াদিত্যের পলায়নের পর, সীতারাম কারাগারে আগুন লাগিয়ে এবং ভুয়ো প্রমাণ সাজিয়ে তাঁর মৃত্যুর গুজব রটায়। এরপর সে মৃত বলে ধরে নেওয়া রুক্মিণীর বাড়িতে লুট করতে গিয়ে তাকে জীবিত ও প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত অবস্থায় পায়। প্রাণের ভয়ে সীতারাম সপরিবারে রায়গড়ে পালিয়ে যায়। এদিকে, রুক্মিণী রাজসভায় গিয়ে প্রতাপাদিত্যের কাছে উদয়াদিত্যের পলায়নের খবর ফাঁস করে দেয়। সমস্ত ঘটনা জানার পর, প্রতাপাদিত্য তাঁর এক পাঠান সেনাপতিকে একটি গোপন হত্যার আদেশ দেন।

Chapter 32

উদয়াদিত্যের পলায়নের পর তাঁর মা মহিষী এবং বোন বিভা মহারাজ প্রতাপাদিত্যের ক্রোধের ভয়ে আতঙ্কিত ছিলেন, কিন্তু রাজার নীরবতায় তাঁরা আশ্বস্ত হন। এরপর মহিষী বিভার মন ভালো করার জন্য একটি মিথ্যা বলেন—যে তাঁর স্বামী রামচন্দ্র রায় তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়েছেন। এই খবরে বিভার সব দুঃখ দূর হয়ে যায় এবং সে আগের মতো প্রাণবন্ত ও আনন্দিত হয়ে ওঠে। কিন্তু এই মিথ্যাচারের কারণে মহিষী বিভাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে দেরি করতে থাকেন। অবশেষে, অধৈর্য বিভা তাঁর মায়ের কাছে মিনতি করে জানতে চায় কবে তাকে পাঠানো হবে, যা মহিষীকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।

Chapter 33

কারাগার থেকে পালিয়ে রায়গড়ে এসেও উদয়াদিত্য তাঁর দাদামশাই বসন্ত রায়ের পরিণতির কথা ভেবে চিন্তিত। বসন্ত রায় তাঁকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রজাদের ভালোবাসায় উদয়াদিত্য সাময়িকভাবে স্বস্তি পেলেও, দাদামশাইয়ের জন্য তাঁর ভয় বাড়তে থাকে। অবশেষে, কারাগারের ভয়াবহ স্মৃতি সত্ত্বেও, তিনি দাদামশাইকে রক্ষা করতে গোপনে যশোরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

উদয়াদিত্য রায়গড়ে এসেও তাঁর দাদামশাই বসন্ত রায়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে চিন্তিত। তিনি গোপনে যশোরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার দিন, বসন্ত রায় একটি দুঃস্বপ্নের কথা বলেন এবং বিচ্ছেদের আশঙ্কায় উদয়াদিত্যকে রায়গড় ছেড়ে যেতে বারণ করেন। উদয়াদিত্য তাঁর মনের কথা গোপন রেখে দাদামশাইয়ের সাথে সারাদিন কাটান এবং বিকেলে সামান্য বেড়ানোর অজুহাতে একা ও নিরস্ত্র অবস্থায় প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যান।

রায়গড়ের কাছে এক মাঠে একা घूमने সময় যুবরাজ উদয়াদিত্য তাঁর লক্ষ্যহীন জীবন নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ, রুক্মিণীর ইশারায় প্রতাপাদিত্যের পাঠানো সৈন্যরা তাঁকে ঘিরে ফেলে। সেনাপতি মুক্তিয়ার খাঁ জানায় যে তাঁকে শুধু বন্দী করার নয়, তাঁর দাদামশাই বসন্ত রায়কে হত্যা করারও আদেশ রয়েছে। উদয়াদিত্যের সমস্ত অনুনয়, যুক্তি ও হুমকি ব্যর্থ হয়। উপায় না দেখে, তিনি বন্দী হওয়ার মুহূর্তে চিৎকার করে তাঁর দাদামশাইকে সাবধান করার চেষ্টা করেন। এরপর মুক্তিয়ার খাঁ ও তার সৈন্যরা বসন্ত রায়কে হত্যা করার জন্য ছদ্মবেশে রায়গড় দুর্গে প্রবেশ করে।

সন্ধ্যায় আহ্নিক করার সময়, প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি মুক্তিয়ার খাঁ বসন্ত রায়ের কাছে আসে। প্রথমে অতিথি আপ্যায়নের চেষ্টা করলেও, বসন্ত রায় শীঘ্রই প্রতাপাদিত্যের হাতে লেখা নিজের মৃত্যুদণ্ডাদেশ পত্রটি দেখেন। তিনি ভাইপোকে মানুষ করার স্মৃতিচারণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বন্দী নাতি উদয়াদিত্যের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অবশেষে, নিজের হত্যাকারীকে ক্ষমা করে এবং উদয়াদিত্যের সুরক্ষার ভার তার উপর দিয়ে, তিনি শান্তভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

Chapter 34

মুক্তিয়ার খাঁ দাদামশাই বসন্ত রায়কে হত্যা করে উদয়াদিত্যকে বন্দী হিসেবে যশোরে নিয়ে আসে। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া উদয়াদিত্য পিতা প্রতাপাদিত্যের সামনে সিংহাসনের দাবি ত্যাগ করেন। তিনি কাশীতে যাওয়ার অনুমতি চান এবং এর বিনিময়ে শপথ করেন যে তিনি আর কখনো যশোরের সিংহাসনে বসবেন না। এরপর তিনি মা ও বোন বিভার কাছ থেকে বিদায় নেন এবং বিভাকে তার শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। দাদামশাইয়ের ব্যাপারে বিভা জিজ্ঞাসা করলে, উদয়াদিত্য তাঁকে মিথ্যে আশ্বাস দেন।

Chapter 35

উদয়াদিত্য ও বিভা যশোরের রাজপ্রাসাদ থেকে চন্দ্রদ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। মায়ের কাছ থেকে অশ্রুসিক্ত বিদায় নিয়ে এবং প্রাসাদের ভীতিপ্রদ পরিবেশ পেছনে ফেলে তারা মুক্তির স্বাদ পায়। নৌকায় প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মাঝিদের গান উপভোগ করতে করতে বিভা তার শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছানোর আনন্দে বিহ্বল হয়। রামচন্দ্র রায়ের রাজ্যে পৌঁছে সে প্রজাদের দেখে ও তাদের প্রতি গভীর স্নেহ অনুভব করে। রাজধানীর কাছাকাছি এসে উদয়াদিত্য পরদিন সকালে খবর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, যদিও বিভা তখনই পৌঁছাতে উদগ্রীব।

Chapter 36

বিভা তার শ্বশুরবাড়ির রাজ্যের কাছে পৌঁছে সেখানকার উৎসবের আমেজ দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। সে ভাবে এই আয়োজন তাকে স্বাগত জানানোর জন্যই। কিন্তু তার স্বামীর বিশ্বস্ত দেহরক্ষী রামমোহন মাল এসে তাকে প্রাসাদে যেতে নিষেধ করে এবং তার ম্লান ও দ্বিধাগ্রস্ত আচরণে বিভার আনন্দ আতঙ্কে পরিণত হয়, কারণ সে বুঝতে পারে যে কিছু একটা ভয়ংকর অঘটন ঘটেছে।

রামমোহন বিভাকে জানায় যে রাজা রামচন্দ্র রায় আজই আবার বিয়ে করছেন। এই ভয়ংকর খবরে বিভা ভেঙে পড়ে এবং অজ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে সে আকুলভাবে রামচন্দ্র রায়ের সাথে দেখা করতে চায়, কিন্তু রামমোহন তাকে নিবৃত্ত করে।

বিভা তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবর পেয়ে, ভাই উদয়াদিত্যের অজান্তেই তাকে একবার দেখার জন্য সাধারণ নারীর বেশে যেতে চায়। রামমোহনের আপত্তি সত্ত্বেও, বিভার কাতর অনুরোধে সে রাজি হয় এবং অন্য ভৃত্যদের বাধা অগ্রাহ্য করে তাকে যেতে সাহায্য করে।

Chapter 37

সাধারণ নারীর ছদ্মবেশে বিভা তাঁর স্বামী রামচন্দ্র রায়ের প্রাসাদে পৌঁছায়। কিন্তু রামচন্দ্র তাঁকে চিনতে পেরেও ভাঁড়ের উপহাসের ভয়ে তাঁকে অপমান করে এবং নিজের স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করে। এই চরম অপমানে বিভা জ্ঞান হারায়। তাঁর বিশ্বস্ত ভৃত্য রামমোহন এর প্রতিবাদে চাকরি ছেড়ে দেয় এবং অজ্ঞান বিভাকে নিয়ে নৌকায় ফিরে আসে। শেষে, বিভা তাঁর ভাই উদয়াদিত্যের সাথে কাশীতে নির্বাসিত জীবন কাটায়। চন্দ্রদ্বীপের যে হাটে বিভার নৌকা থেমেছিল, তা আজও 'বৌ-ঠাকুরাণীর হাট' নামে পরিচিত।