1 সীতারামের সাথে বসন্ত রায়ের আকস্মিক প্রস্থান

সন্ধ্যার পর বসন্তরায় একাকী বহির্ব্বাটিতে বসিয়া আছেন। এমন সময়ে সীতারাম তাঁহাকে আসিয়া প্রণাম করিল।

বসন্তরায় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“কি সীতারাম, কি খবর?”

সীতারাম কহিলেন, “সে পরে বলিব, আপনাকে আমার সঙ্গে আসিতে হইবে।”

বসন্তরায় কহিলেন, “কেন, কোথায় সীতারাম?”

সীতারাম তখন কাছে আসিয়া বসিল। চুপি চুপি ফিস্ ফিস্ করিয়া কি বলিল। বসন্তরায় চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিলেন, “সত্য নাকি?”

সীতারাম কহিল, “আজ্ঞা হাঁ মহারাজ।”

বসন্তরায় মনে মনে অনেক ইতস্তত করিতে লাগিলেন। কহিলেন— “এখনি যাইতে হইবে না কি!”

সীতারাম—“আজ্ঞা হাঁ!”

বসন্তরায়—“একবার বিভার সঙ্গে দেখা করিয়া আসিব না?”

সীতারাম—“আজ্ঞা—না—আর সময় নাই!”

বসন্তরায়—“কোথায় যাইতে হইবে?”

সীতারাম—“আমার সঙ্গে আসুন, আমি লইয়া যাইতেছি।”

বসন্তরায় উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিলেন—“একবার বিভার সঙ্গে দেখা করিয়া আসি না কেন?”

সীতারাম—“আজ্ঞা না, মহারাজ! দেরি হইলে সমস্ত নষ্ট হইয়া যাইবে!”

বসন্তরায় তাড়াতাড়ি কহিলেন, “তবে কাজ নাই—কাজ নাই!” উভয়ে চলিলেন।

আবার কিছু দূর গিয়া কহিলেন, “একটু বিলম্ব করিলে কি চলে না?”

সীতারাম —“না মহারাজ তাহা হইলে বিপদ হইবে!”

“দুর্গা বল” বলিয়া বসন্তরায় প্রাসাদের বাহির হইয়া গেলেন।

2 কারাগার থেকে উদয়াদিত্যের উদ্ধার

বসন্তরায় যে আসিয়াছেন, তাহা উদয়াদিত্য জানেন না। বিভা তাহাকে বলে নাই। কেন না যখন উভয়ের দেখা হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না, তখন এ সংবাদ তাঁহার কষ্টের কারণ হইত। সন্ধ্যার পর বিদায় লইয়া বিভা কারাগার হইতে চলিয়া গিয়াছে। উদয়াদিত্য একটি প্রদীপ লইয়া একখানি সংস্কৃত গ্রন্থ পড়িতেছেন। জানালার ভিতর দিয়া বাতাস আসিতেছে, দীপের ক্ষীণ শিখা কাঁপিতেছে, অক্ষর ভাল দেখা যাইতেছে না। কীট পতঙ্গ আসিয়া দীপের উপর পড়িতেছে। এক একবার দীপ নিভ নিভ হইতেছে। একবার বাতাস বেগে আসিল—দীপ নিভিয়া গেল। উদয়াদিত্য পুঁথি ঝাঁপিয়া তাঁহার খাটে গিয়া বসিলেন। একে একে কত কি ভাবনা আসিয়া পড়িল। বিভার কথা মনে আসিল। আজ বিভা কিছু দেরী করিয়া আসিয়াছিল, কিছু সকাল সকাল চলিয়া গিয়াছিল। আজ বিভাকে কিছু বিশেষ স্নান দেখিয়াছিলেন;—তাহাই লইয়া মনে মনে আলোচনা করিতেছিলেন। পৃথিবীতে যেন তাঁহার আর কেহ নাই—সমস্ত দিন বিভাকে ছাড়া আর কাহাকেও দেখিতে পান না— বিভাই তাঁহার একমাত্র আলোচ্য। বিভার প্রত্যেক হাসিটি প্রত্যেক কথাটি তাঁহার মনে সঞ্চিত হইতে থাকে—তৃষিত ব্যক্তি তাহার পানীয়ের প্রত্যেক বিন্দুটি পর্য্যন্ত যেমন উপভোগ করে, তেমনি বিভার প্রীতির অতি সামান্য চিহ্নটুকু পর্য্যন্ত তিনি প্রাণ-মনে উপভোগ করেন। আজ তাই এই বিজন ক্ষুদ্র অন্ধকার ঘরের মধ্যে একলা শুইয়া স্নেহের প্রতিমা বিভার ম্লান মুখখানি ভাবিতে ছিলেন। সেই অন্ধকারে বসিয়া তাঁহার একবার মনে হইল—“বিভার কি ক্রমেই বিরক্তি ধরিতেছে? এই নিরানন্দ কারাগারের মধ্যে এক বিষণ্ণ অন্ধকার মুর্ত্তির সেবা করিতে আর কি তাহার ভাল লাগিতেছে না? আমাকে কি ক্রমেই সে তাহার সুখের বাধা— তাহার সংসার-পথের কণ্টক বলিয়া দেখিবে? আজ দেরি করিয়া আসিয়াছে—কাল হয় ত আরো দেরি করিয়া আসিবে—তাহার পরে এক দিন হয় ত সমস্ত দিন বসিয়া আছি কখন্ বিভা আসিবে—বিকাল হইল—সন্ধ্যা হইল—রাত্রি হইল, বিভা আর আসিল না!—তাহার পর হইতে আর হয় ত বিভা আসিবে না।” উদয়াদিত্যের মনে যতই এই কথা উদয় হইতে লাগিল, ততই তাঁহার মনটা হা-হা করিতে লাগিল— তাঁহার কল্পনা-রাজ্যের চারিদিক কি ভয়ানক শূন্যময় দেখিতে লাগিলেন। এক দিন আসিবে যে দিন বিভা তাঁহাকে স্নেহশূন্য নয়নে তাহার সুখের কণ্টক বলিয়া দেখিবে—সেই অতি দূর কল্পনার আভাস মাত্র লাগিয়া তাঁহার হৃদয় একবারে ব্যাকুল হইয়া উঠিল। একবার মনে করিতেছেন “আমি কি ভয়ানক স্বার্থপর! আমি বিভাকে ভালবাসি বলিয়া তাহার যে ঘোরতর শত্রুতা করিতেছি, কোন শত্রুও বোধ করি এমন পারে না।” বার বার করিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছেন আর বিভার উপর নির্ভর করিবেন না—কিন্তু যখনি কল্পনা করিতেন তিনি বিভাকে হারাইয়াছেন, তখনি তাঁহার মনে সে বল চলিয়া যাইতেছে, তখনি তিনি অকুল পাথারে পড়িয়া যাইতেছেন—মরণাপন্ন মজ্জমান ব্যক্তির মত বিভার কাল্পনিক মূর্ত্তিকে আকুল ভাবে আঁকড়িয়া ধরিতেছেন।

এমন সময় বহির্দ্দেশে সহসা “আগুন—আগুন” বলিয়া এক ঘোরতর কোলাহল উঠিল। উদয়াদিত্যের বুক কাঁপিয়া উঠিল—বাহিরে শত শত কণ্ঠরোল একত্রে উঠিল, সহসা নানা কষ্টের নানাবিধ চীৎকার সহিত আকাশে শত লোকের দ্রুত পদশব্দ শুনা গেল। উদয়াদিত্য বুঝিলেন, প্রাসাদের কাছাকাছি কোথাও আগুন লাগিয়াছে। অনেকক্ষণ ধরিয়া গোলমাল চলিতে লাগিল—তাঁহার মন অত্যন্ত অধীর হইয়া উঠিল। সহসা দ্রুতবেগে তাঁহার কারাগারের দ্বার খুলিয়া গেল। কে একজন তাঁহার অন্ধকার গৃহে প্রবেশ করিল—তিনি চমকিয়া উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“কে ও?”

সে উত্তর করিল, “আমি সীতারাম, আপনি বাহির হইয়া আসুন।”

উদয়াদিত্য কহিলেন—“কেন?”

সীতারাম কহিল—“যুবরাজ কারাগৃহে আগুন লাগিয়াছে, শীঘ্র বাহির হইয়া আসুন!” বলিয়া তাঁহাকে ধরিয়া প্রায় তাঁহাকে বহন করিয়া কারাগারের বাহিরে লইয়া গেল।

অনেক দিনের পর উদয়াদিত্য আজ মুক্ত স্থানে আসিলেন—মাথার উপরে সহসা অনেকটা আকাশ দেখিতে পাইলেন, বাতাস যেন তাহার বিস্তৃত বক্ষ প্রসারিত করিয়া তাঁহাকে আলিঙ্গন করিতে লাগিল। চোখের বাধা চারিদিক হইতে খুলিয়া গেল। সেই অন্ধকার রাত্রে, আকাশের অসংখ্য তারকার দৃষ্টির নিম্নে, বিস্তৃত মাঠের মধ্যে কোমল তৃণজালের উপর দাঁড়াইয়া সহসা তাঁহার মনের মধ্যে এক অপরিসীম অনির্ব্বচনীয় আনন্দের উদয় হইল। সেই আনন্দে কিয়ৎক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া তাহার পর সীতারামকে জিজ্ঞাসা করিলেন —“কি করিব, কোথায় যাইব?” অনেক দিন সঙ্কীর্ণ স্থানে বদ্ধ ছিলেন, চলেন ফেরেন নাই—আজ এই বিস্তৃত মাঠের মধ্যে আসিয়া অসহায় ভাবে সীতারামকে জিজ্ঞাসা করিলেন “কি করিব? কোথায় যাইব?” সীতারাম কহিল —“আসুন, আমার সঙ্গে আসুন!”

3 উদয়াদিত্যের পলায়ন এবং রুক্মিণীর রুদ্রমূর্তি

এদিকে আগুন খুব জ্বলিতেছে। বৈকালে কতকগুলি প্রজা প্রধান কর্ম্মচারীদের নিকট কি-একটা নিবেদন করিবার জন্য আসিয়াছিল। তাহারা প্রাসাদের প্রাঙ্গণে একত্র বসিয়াছিল—তাহারাই প্রথমে আগুনের গোল তোলে। প্রহরীদের বাসের জন্য কারাগারের কাছে একটি দীর্ঘ কুটীরশ্রেণী ছিল—সেই খানেই তাহাদের চারপাই, বাসন, কাপড়চোপড় জিনিষপত্র, সমস্তই থাকে। অগ্নির সংবাদ পাইয়াই যত প্রহরী পারিল সকলেই ছুটিয়া গেল, যাহারা নিতান্তই পারিল না, তাহারা হাত পা আছড়াইতে লাগিল। উদয়াদিত্যের গৃহদ্বারেও দুই একজন প্রহরী ছিল বটে, কিন্তু সেখানে কড়াক্কড় পাহারা দিবার কোন প্রয়োজনই ছিল না। দস্তুর ছিল বলিয়া তাহারা পাহারা দিত মাত্র। কারণ উদয়াদিত্য এমন শান্ত ভাবে তাঁহার গৃহে বসিয়া থাকিতেন যে বোধ হইত না যে তিনি কখন পালাইবার চেষ্টা করিবেন বা তাঁহার পালাইবার ইচ্ছা আছে। এই জন্য তাঁহার দ্বারে প্রহরীরা সর্ব্বাগ্রে ছুটিয়া গিয়াছিল। রাত হইতে লাগিল, আগুন নেবে না—কেহ বা জিনিষ পত্র সরাইতে লাগিল, কেহ বা জল ঢালিতে লাগিল, কেহ বা কিছুই না করিয়া কেবল গোলমাল করিয়াই বেড়াইতে লাগিল; আগুন নিবিলে পর তাহারাই সকলের অপেক্ষা অধিক বাহবা পাইয়াছিল। এইরূপ সকলে ব্যস্ত আছে, এমন সময়ে একজন স্ত্রীলোক তাহাদের মধ্যে ছুটিয়া আসিল, সে কি-একটা বলিতে চায়—কিন্তু তাহার কথা শোনে কে? কেহ তাহাকে গালাগালি দিল, কেহ তাহাকে ঠেলিয়া ফেলিয়া দিল— কেহই তাহার কথা শুনিল না। যে শুনিল সে কহিল, “যুবরাজ পালাইলেন তাতে আমার কি মাগি, তোরই বা কি? সে দয়াল সিং জানে—আমার ঘর ফেলিয়া এখন আমি কোথাও যাইতে পারি না।”

বলিয়া সে ভিড়ের মধ্যে মিশিয়া গেল। এইরূপ বারবার প্রতিহত হইয়া সেই রমণী অতি প্রচণ্ডা হইয়া উঠিল। একজন যাহাকে সমুখে পাইল তাহাকেই সবলে ধরিয়া কহিল—“পোড়ারমুখো, তোমরা কি চোখের মাথা খাইয়াছ? রাজার চাকরী কর সে জ্ঞান কি নাই? কাল রাজাকে বলিয়া হেঁটোয় কাঁটা উপরে কাঁটা দিয়া তোমাদের মাটিতে পুঁতিব তবে ছাড়িব। যুবরাজ যে পালাইয়া গেল!”

“ভালই হইয়াছে—তোর তাহাতে কি?” বলিয়া সে তাহাকে উত্তমরূপে প্রহার করিল—যাহারা ঘরে আগুন লাগাইয়াছিল, এ ব্যক্তি তাহাদের মধ্যে একজন। প্রহার খাইয়া সেই রমণীর মূর্ত্তি অতি ভীষণ হইয়া উঠিল—ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মত তাহার চোখ দুটা জ্বলিতে লাগিল, তাহার চুলগুলা ফুলিয়া উঠিল; সে দাঁতে দাঁতে কিড়মিড় করিতে লাগিল, তাহার সেই মুখের উপর বহ্ণিশিখার আভা পড়িয়া তাহার মুখ পিশাচীর মত দেখিতে হইল। সম্মুখে একটা কাষ্ঠখণ্ড জ্বলিতেছিল, সেইটি তুলিয়া লইল, হাত পুড়িয়া গেল, কিন্তু তাহা ফেলিল না, সেই জ্বলন্ত কাষ্ঠ লইয়া তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিল। কিছুতে ধরিতে না পারিয়া—সেই কাষ্ঠ তাহার প্রতি ছুঁড়িয়া মারিল।

1 সীতারামের সাথে বসন্ত রায়ের আকস্মিক প্রস্থান

সন্ধ্যা নামার পর বসন্ত রায় একা বাইরের ঘরে বসেছিলেন। এমন সময় সীতারাম এসে তাঁকে প্রণাম করল।

বসন্ত রায় তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী সীতারাম, কী খবর?”

সীতারাম বলল, “সেকথা পরে বলব, আপনাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে।”

বসন্ত রায় বললেন, “কেন, কোথায় সীতারাম?”

সীতারাম তখন কাছে এসে বসল। চুপিচুপি ফিসফিস করে কী যেন বলল। বসন্ত রায় চোখ বড় বড় করে বললেন, “সত্যি নাকি?”

সীতারাম বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, মহারাজ।”

বসন্ত রায় মনে মনে খুব ইতস্তত করতে লাগলেন। বললেন, “এক্ষুনি যেতে হবে নাকি!”

সীতারাম— “আজ্ঞে হ্যাঁ!”

বসন্ত রায়— “একবার বিভার সঙ্গে দেখা করে আসব না?”

সীতারাম— “আজ্ঞে না— আর সময় নেই!”

বসন্ত রায়— “কোথায় যেতে হবে?”

সীতারাম— “আমার সঙ্গে আসুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

বসন্ত রায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “একবার বিভার সঙ্গে দেখা করে আসি না কেন?”

সীতারাম— “আজ্ঞে না, মহারাজ! দেরি হলে সব নষ্ট হয়ে যাবে!”

বসন্ত রায় তাড়াতাড়ি বললেন, “তাহলে আর দরকার নেই— দরকার নেই!” দু'জনে চললেন।

আবার কিছুটা দূর গিয়ে বললেন, “একটু দেরি করলে কি চলে না?”

সীতারাম— “না মহারাজ, তাহলে বিপদ হবে!”

“দুর্গা বল” বলে বসন্ত রায় প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলেন।

2 কারাগার থেকে উদয়াদিত্যের উদ্ধার

বসন্ত রায় যে এসেছেন, তা উদয়াদিত্য জানেন না। বিভা তাঁকে বলেনি। কারণ, দুজনের দেখা হওয়ার যখন কোনো সম্ভাবনা ছিল না, তখন এই খবর তাঁর কষ্টের কারণ হতো। সন্ধ্যার পর বিদায় নিয়ে বিভা কারাগার থেকে চলে গেছে। উদয়াদিত্য একটি প্রদীপ জ্বেলে একটি সংস্কৃত গ্রন্থ পড়ছিলেন। জানলা দিয়ে বাতাস আসছে, প্রদীপের ক্ষীণ শিখা কাঁপছে, অক্ষর ভালো দেখা যাচ্ছে না। পোকামাকড় এসে প্রদীপের উপর পড়ছে। এক-একবার প্রদীপটা নিভে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। হঠাৎ জোরে বাতাস আসায় প্রদীপটা নিভে গেল। উদয়াদিত্য বইটা বন্ধ করে তাঁর খাটে গিয়ে বসলেন। একে একে কত কী ভাবনা এসে পড়ল। বিভার কথা মনে এল। আজ বিভা একটু দেরি করে এসেছিল, আবার একটু তাড়াতাড়ি চলেও গিয়েছিল। আজ বিভাকে তাঁর কিছু বেশি ম্লান লেগেছিল;—সেই কথাই তিনি মনে মনে আলোচনা করছিলেন। পৃথিবীতে যেন তাঁর আর কেউ নেই—সারাদিন বিভাকে ছাড়া আর কাউকেই তিনি দেখতে পান না—বিভাই তাঁর একমাত্র আলোচনার বিষয়। বিভার প্রত্যেকটি হাসি, প্রত্যেকটি কথা তাঁর মনে জমা হতে থাকে—তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন তার পানীয়ের প্রতিটি বিন্দু পর্যন্ত উপভোগ করে, তেমনি তিনিও বিভার ভালোবাসার অতি সামান্য চিহ্নটুকুও মনপ্রাণ দিয়ে উপভোগ করেন। তাই আজ এই নির্জন, ছোট্ট অন্ধকার ঘরের মধ্যে একা শুয়ে তিনি স্নেহের প্রতিমা বিভার ম্লান মুখখানি ভাবছিলেন। সেই অন্ধকারে বসে তাঁর একবার মনে হলো—"বিভার কি ক্রমশ বিরক্তি ধরছে? এই নিরানন্দ কারাগারের মধ্যে এক বিষণ্ণ, অন্ধকার মূর্তির সেবা করতে আর কি তার ভালো লাগছে না? আমাকে কি সে ধীরে ধীরে তার সুখের বাধা—তার সংসার-পথের কাঁটা বলে দেখবে? আজ দেরি করে এসেছে—কাল হয়তো আরও দেরি করে আসবে—তারপর একদিন হয়তো সারাদিন বসে আছি কখন বিভা আসবে—বিকাল হলো—সন্ধ্যা হলো—রাত হলো, বিভা আর এল না!—তারপর থেকে হয়তো বিভা আর আসবেই না।" উদয়াদিত্যের মনে যতই এই কথা উদয় হতে লাগল, ততই তাঁর মনটা হাহাকার করে উঠল—তাঁর কল্পনার রাজ্যের চারদিক কী ভয়ানক শূন্য মনে হতে লাগল। একদিন আসবে যেদিন বিভা তাঁকে স্নেহহীন চোখে তার সুখের কাঁটা বলে দেখবে—সেই অতি দূর কল্পনার আঁচ লাগতেই তাঁর হৃদয় একেবারে ব্যাকুল হয়ে উঠল। একবার ভাবছেন, "আমি কী ভয়ানক স্বার্থপর! আমি বিভাকে ভালোবাসি বলে তার যে ভয়ঙ্কর শত্রুতা করছি, কোনো শত্রুও বোধহয় এমন পারে না।" বারবার প্রতিজ্ঞা করছেন, আর বিভার উপর নির্ভর করবেন না—কিন্তু যখনই কল্পনা করছেন তিনি বিভাকে হারিয়েছেন, তখনই তাঁর মনের সেই বল চলে যাচ্ছে, তখনই তিনি অকূল পাথারে পড়ে যাচ্ছেন—ডুবন্ত মরণাপন্ন মানুষের মতো বিভার কাল্পনিক মূর্তিকে আকুলভাবে আঁকড়ে ধরছেন।

এমন সময় বাইরে হঠাৎ "আগুন—আগুন" বলে এক প্রচণ্ড শোরগোল উঠল। উদয়াদিত্যের বুক কেঁপে উঠল—বাইরে শত শত কণ্ঠস্বর একসাথে গর্জে উঠল, হঠাৎ নানা কষ্টের বিভিন্ন রকমের চিৎকারের সাথে আকাশে বহু লোকের দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। উদয়াদিত্য বুঝলেন, প্রাসাদের কাছাকাছি কোথাও আগুন লেগেছে। অনেকক্ষণ ধরে গোলমাল চলতে লাগল—তাঁর মন অত্যন্ত অধীর হয়ে উঠল। হঠাৎ দ্রুতবেগে তাঁর কারাগারের দরজা খুলে গেল। কে একজন তাঁর অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করল—তিনি চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন—"কে ও?"

সে উত্তর দিল, "আমি সীতারাম, আপনি বেরিয়ে আসুন।"

উদয়াদিত্য বললেন—"কেন?"

সীতারাম বলল—"যুবরাজ, কারাগারে আগুন লেগেছে, শীঘ্র বেরিয়ে আসুন!" বলে তাঁকে ধরে প্রায় বহন করেই কারাগারের বাইরে নিয়ে গেল।

অনেকদিন পর উদয়াদিত্য আজ মুক্ত জায়গায় এলেন—মাথার উপর হঠাৎ অনেকটা আকাশ দেখতে পেলেন, বাতাস যেন তার প্রশস্ত বুক মেলে দিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করতে লাগল। চোখের চারদিকের বাধা খুলে গেল। সেই অন্ধকার রাতে, আকাশের অসংখ্য তারার দৃষ্টির নিচে, বিস্তৃত মাঠের মধ্যে নরম ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে হঠাৎ তাঁর মনের মধ্যে এক অপরিসীম ও অনির্বচনীয় আনন্দের উদয় হলো। সেই আনন্দে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি সীতারামকে জিজ্ঞাসা করলেন —"কী করব, কোথায় যাব?" অনেকদিন সংকীর্ণ জায়গায় বন্দী ছিলেন, হাঁটাচলা করেননি—আজ এই বিস্তৃত মাঠের মধ্যে এসে অসহায়ভাবে সীতারামকে জিজ্ঞাসা করলেন, "কী করব? কোথায় যাব?" সীতারাম বলল—"আসুন, আমার সঙ্গে আসুন!"

3 উদয়াদিত্যের পলায়ন এবং রুক্মিণীর রুদ্রমূর্তি

এদিকে আগুন বেশ জ্বলে উঠেছে। বিকেলে কিছু প্রজা প্রধান কর্মচারীদের কাছে কোনো একটা আর্জি জানাতে এসেছিল। তারা প্রাসাদের উঠোনে একজোট হয়ে বসেছিল—তারাই প্রথম ‘আগুন আগুন’ বলে চিৎকার করে। কারাগারের কাছে প্রহরীদের থাকার জন্য সারি সারি কুঁড়েঘর ছিল—সেখানেই তাদের খাট, বাসনপত্র, জামাকাপড়, সব জিনিস থাকত। আগুনের খবর পেয়েই যত প্রহরী পারল, সবাই ছুটে গেল। যারা যেতে পারল না, তারা হতাশায় হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। উদয়াদিত্যের ঘরের দরজাতেও দু-একজন প্রহরী ছিল, কিন্তু সেখানে কড়া পাহারা দেওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। নিয়ম ছিল বলেই তারা পাহারা দিত। কারণ উদয়াদিত্য এত শান্তভাবে তাঁর ঘরে বসে থাকতেন যে, মনেই হতো না তিনি কখনও পালানোর চেষ্টা করবেন বা তাঁর পালানোর ইচ্ছা আছে। এই জন্য তাঁর দরজার প্রহরীরাই সবার আগে ছুটে গিয়েছিল। রাত বাড়তে লাগল, কিন্তু আগুন নেভে না। কেউ জিনিসপত্র সরাতে লাগল, কেউ জল ঢালতে লাগল, আবার কেউ কিছুই না করে শুধু চেঁচামেচি করে বেড়াতে লাগল। আগুন নেভার পর এই শেষোক্তরাই সবার চেয়ে বেশি প্রশংসা পেয়েছিল। যখন সবাই এভাবে ব্যস্ত, সেই সময় একজন মহিলা তাদের মধ্যে ছুটে এল। সে কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু তার কথা শোনে কে? কেউ তাকে গালি দিল, কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল—কেউই তার কথা শুনল না। যে শুনল, সে বলল, “যুবরাজ পালালে তাতে আমার কী, তোরই বা কী? সে দয়াল সিং জানে। আমার ঘর ফেলে আমি এখন কোথাও যেতে পারব না।”

এই বলে সে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। এভাবে বারবার বাধা পেয়ে সেই মহিলা প্রচণ্ড রেগে উঠল। সামনে যাকে পেল, তাকেই সজোরে ধরে বলল, “পোড়ামুখো, তোরা কি চোখে দেখিস না? রাজার চাকরি করিস, সেই জ্ঞানটুকুও নেই? কাল রাজাকে বলে মাটিতে পুঁতে ওপরে কাঁটা চাপা দেব, তবে ছাড়ব। যুবরাজ যে পালিয়ে গেল!”

“বেশ করেছে—তোর তাতে কী?” বলে লোকটা তাকে আচ্ছা করে মারল। যারা ঘরে আগুন লাগিয়েছিল, এই লোকটা তাদেরই একজন। মার খেয়ে মহিলাটির চেহারা ভয়ংকর হয়ে উঠল। ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো তার চোখ দুটো জ্বলতে লাগল, তার চুলগুলো ফুলে উঠল, সে দাঁতে দাঁত ঘষতে লাগল। তার মুখের ওপর আগুনের শিখার আলো পড়ে মুখটা ডাইনির মতো দেখাচ্ছিল। সামনে একটা জ্বলন্ত কাঠের টুকরো পড়েছিল, সে সেটা তুলে নিল। হাত পুড়ে গেল, কিন্তু সে তা ফেলল না। সেই জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে লোকটার পিছনে ছুটল। কিছুতেই ধরতে না পেরে, সেই কাঠটা তার দিকে ছুঁড়ে মারল।

1 सीताराम के साथ बसंत राय का आकस्मिक प्रस्थान

शाम के बाद बसंत राय बाहरी बैठक में अकेले बैठे थे। उसी समय सीताराम ने आकर उन्हें प्रणाम किया।

बसंत राय ने उनसे पूछा— “क्या सीताराम, क्या ख़बर है?”

सीताराम ने कहा, “वह बाद में बताऊँगा, आपको मेरे साथ चलना होगा।”

बसंत राय ने कहा, “क्यों, कहाँ सीताराम?”

तब सीताराम पास आकर बैठ गया। उसने धीरे-धीरे फुसफुसाकर कुछ कहा। बसंत राय ने आँखें फाड़कर कहा, “क्या यह सच है?”

सीताराम ने कहा, “जी हाँ, महाराज।”

बसंत राय मन ही मन बहुत हिचकिचाने लगे। उन्होंने कहा— “क्या अभी ही जाना होगा!”

सीताराम—“जी हाँ!”

बसंत राय—“क्या एक बार विभा से मिलकर आऊँ?”

सीताराम—“जी—नहीं—और समय नहीं है!”

बसंत राय—“कहाँ जाना होगा?”

सीताराम—“मेरे साथ चलिए, मैं लिए चलता हूँ।”

बसंत राय उठकर खड़े हो गए और कहा—“एक बार विभा से मिलकर क्यों न आऊँ?”

सीताराम—“जी नहीं, महाराज! देर होने पर सब कुछ नष्ट हो जाएगा!”

बसंत राय ने जल्दी से कहा, “तो फिर रहने दो—रहने दो!” दोनों चल पड़े।

फिर कुछ दूर जाकर उन्होंने कहा, “थोड़ी देर करने से काम नहीं चलेगा क्या?”

सीताराम —“नहीं महाराज, वैसा करने से विपत्ति आ जाएगी!”

“दुर्गा बोलो” कहकर बसंत राय महल से बाहर निकल गए।

2 कारागार से उदयादित्य का उद्धार

उदयादित्य नहीं जानते कि बसंत राय आ गए हैं। विभा ने उन्हें बताया नहीं था। क्योंकि जब दोनों के मिलने की कोई संभावना नहीं थी, तो यह समाचार उनके कष्ट का कारण बनता। शाम के बाद विदा लेकर विभा कारागार से चली गई है। उदयादित्य एक दीपक जलाकर एक संस्कृत ग्रंथ पढ़ रहे हैं। खिड़की से हवा आ रही है, दीपक की क्षीण लौ काँप रही है, अक्षर ठीक से दिखाई नहीं दे रहे हैं। कीड़े-मकौड़े आकर दीपक पर गिर रहे हैं। दीपक बार-बार बुझने-बुझने को हो रहा है। एक बार हवा का तेज झोंका आया—दीपक बुझ गया। उदयादित्य ने ग्रंथ बंद करके अपने खाट पर जा बैठे। एक-एक करके न जाने कितने विचार मन में आने लगे। विभा का खयाल आया। आज विभा कुछ देर से आई थी, और कुछ जल्दी चली गई थी। आज उन्होंने विभा को कुछ विशेष उदास देखा था;—उसी के बारे में वह मन ही मन सोच रहे थे। जैसे इस दुनिया में उनका और कोई नहीं है—सारे दिन विभा के सिवा और किसी को देख भी नहीं पाते—विभा ही उनकी चर्चा का एकमात्र विषय है। विभा की हर एक मुस्कान, हर एक बात उनके मन में संचित होती रहती है—जैसे प्यासा व्यक्ति अपने पेय की हर एक बूँद का आनंद लेता है, वैसे ही वे विभा के स्नेह के अत्यंत सामान्य चिह्न का भी पूरे मन से आनंद लेते हैं। इसलिए आज इस निर्जन, छोटी, अँधेरी कोठरी में अकेले लेटे हुए वे स्नेह की प्रतिमा विभा के उदास चेहरे के बारे में सोच रहे थे। उस अँधेरे में बैठे-बैठे उनके मन में एक बार खयाल आया—"क्या विभा धीरे-धीरे ऊब रही है? इस नीरस कारागार में एक उदास, अंधकारमय मूर्ति की सेवा करना क्या अब उसे अच्छा नहीं लग रहा? क्या वह धीरे-धीरे मुझे अपनी खुशी में बाधा—अपने संसार के मार्ग का काँटा समझने लगेगी? आज देर से आई है—कल शायद और देर से आएगी—उसके बाद एक दिन शायद मैं सारा दिन बैठा रहूँगा कि कब विभा आएगी—दोपहर हुई—शाम हुई—रात हो गई, विभा नहीं आई!—उसके बाद से शायद विभा कभी नहीं आएगी।" जैसे-जैसे उदयादित्य के मन में यह बात उठने लगी, वैसे-वैसे उनका मन हाहाकार करने लगा—उन्हें अपनी कल्पना का संसार चारों ओर से कितना भयानक रूप से सूना दिखाई देने लगा। एक दिन आएगा जब विभा उन्हें स्नेहहीन आँखों से अपनी खुशी का काँटा समझेगी—उस बहुत दूर की कल्पना की मात्र झलक से ही उनका हृदय एकदम व्याकुल हो उठा। एक बार सोच रहे हैं, "मैं कितना भयानक स्वार्थी हूँ! मैं विभा से प्यार करता हूँ, इसलिए उसकी जो घोर शत्रुता कर रहा हूँ, वैसी तो शायद कोई शत्रु भी नहीं कर सकता।" वे बार-बार प्रतिज्ञा कर रहे हैं कि अब विभा पर निर्भर नहीं रहेंगे—लेकिन जैसे ही वे कल्पना करते कि उन्होंने विभा को खो दिया है, वैसे ही उनके मन की वह शक्ति चली जाती, वे अथाह सागर में गिर पड़ते—और मरणासन्न डूबते हुए व्यक्ति की तरह विभा की काल्पनिक मूर्ति को व्याकुलता से पकड़ लेते।

तभी बाहर अचानक "आग—आग" का ज़ोरदार कोलाहल मच गया। उदयादित्य का दिल काँप उठा—बाहर सैकड़ों कंठों की आवाज़ एक साथ उठी, अचानक तरह-तरह की दर्द भरी चीखों के साथ सैकड़ों लोगों के तेज़ कदमों की आहट सुनाई दी। उदयादित्य समझ गए कि महल के आसपास कहीं आग लगी है। काफी देर तक शोरगुल चलता रहा—उनका मन अत्यंत अधीर हो उठा। अचानक तेज़ी से उनके कारागार का दरवाज़ा खुल गया। कोई उनके अँधेरे कमरे में घुसा—उन्होंने चौंककर पूछा—"कौन है?"

उसने उत्तर दिया, "मैं सीताराम हूँ, आप बाहर आ जाइए।"

उदयादित्य ने कहा—"क्यों?"

सीताराम ने कहा—"युवराज, कारागार में आग लग गई है, जल्दी बाहर आ जाइए!" कहकर उसने उन्हें पकड़ा और लगभग उठाकर ही कारागार से बाहर ले गया।

बहुत दिनों बाद उदयादित्य आज एक खुली जगह पर आए—सिर के ऊपर अचानक उन्हें बहुत बड़ा आकाश दिखाई दिया, हवा जैसे अपनी चौड़ी छाती फैलाकर उनका आलिंगन करने लगी। आँखों के सामने से चारों ओर के बंधन खुल गए। उस अँधेरी रात में, आकाश के असंख्य तारों की दृष्टि के नीचे, विस्तृत मैदान में कोमल घास पर खड़े होकर अचानक उनके मन में एक असीम, अवर्णनीय आनंद का उदय हुआ। उस आनंद में कुछ क्षण चुप रहने के बाद उन्होंने सीताराम से पूछा—"क्या करूँ, कहाँ जाऊँ?" बहुत दिनों तक एक तंग जगह में बंद थे, चले-फिरे नहीं थे—आज इस विस्तृत मैदान में आकर उन्होंने असहाय भाव से सीताराम से पूछा, "क्या करूँ? कहाँ जाऊँ?" सीताराम ने कहा—"आइए, मेरे साथ आइए!"

3 उदयादित्य का पलायन और रुक्मिणी का रुद्र रूप

उधर आग बहुत तेज़ जल रही थी। दोपहर बाद कुछ प्रजाजन मुख्य कर्मचारियों के पास कुछ निवेदन करने आए थे। वे महल के आँगन में एक साथ बैठे थे—सबसे पहले आग का शोर उन्हीं लोगों ने मचाया। पहरेदारों के रहने के लिए कारागार के पास झोपड़ियों की एक लंबी कतार थी—वहीं उनकी चारपाई, बर्तन, कपड़े-लत्ते, सारा सामान रहता था। आग की ख़बर पाते ही जितने भी पहरेदार थे, सब दौड़ पड़े, और जो बिल्कुल नहीं जा सके, वे हाथ-पैर पटकने लगे। उदयादित्य के कक्ष के द्वार पर भी एक-दो पहरेदार थे, लेकिन वहाँ कड़ी निगरानी की कोई ज़रूरत नहीं थी। दस्तूर था, इसलिए वे बस पहरा देते थे। क्योंकि उदयादित्य इतनी शांति से अपने कक्ष में बैठे रहते थे कि ऐसा लगता ही नहीं था कि वे कभी भागने की कोशिश करेंगे या उनकी भागने की कोई इच्छा है। इसीलिए उनके द्वार के पहरेदार सबसे पहले भागे थे। रात होने लगी, पर आग बुझ नहीं रही थी—कोई सामान हटाने लगा, कोई पानी डालने लगा, तो कोई कुछ न करके बस शोर मचाता घूम रहा था; आग बुझने के बाद सबसे ज़्यादा वाहवाही उन्हीं को मिली। ऐसे में एक स्त्री उनके बीच दौड़ती हुई आई, वह कुछ कहना चाहती थी—पर उसकी बात सुनता कौन? किसी ने उसे गाली दी, किसी ने उसे धक्का देकर गिरा दिया—किसी ने भी उसकी बात नहीं सुनी। जिसने सुना, उसने कहा, "युवराज भाग गए तो मेरा क्या, और तेरा क्या? वह तो दयाल सिंह जाने—मैं अपना घर छोड़कर अभी कहीं नहीं जा सकता।"

यह कहकर वह भीड़ में गायब हो गया। इस तरह बार-बार दुत्कारे जाने पर वह स्त्री अत्यंत प्रचंड हो उठी। सामने जो मिला, उसे बलपूर्वक पकड़कर कहा—"अभागो, क्या तुम्हारी आँखें फूट गई हैं? राजा की नौकरी करते हो, इसका भी होश नहीं है? कल राजा से कहकर, नीचे काँटे और ऊपर काँटे बिछवाकर तुम्हें ज़मीन में गड़वा दूँगी, तब छोडूंगी। युवराज भाग गए हैं!"

"अच्छा हुआ—तेरा इससे क्या?" कहकर उसने उसकी अच्छी-ख़ासी पिटाई कर दी—यह व्यक्ति उन्हीं में से एक था जिन्होंने घर में आग लगाई थी। मार खाकर उस स्त्री का रूप अत्यंत भयानक हो गया—क्रोधित बाघिन की तरह उसकी आँखें जलने लगीं, उसके बाल खड़े हो गए; वह दाँत किटकिटाने लगी, और उसके चेहरे पर आग की लपटों की आभा पड़ने से उसका मुँह पिशाचिनी जैसा दिखने लगा। सामने लकड़ी का एक टुकड़ा जल रहा था, उसने उसे उठा लिया, उसका हाथ जल गया, लेकिन उसने उसे फेंका नहीं, और उसी जलती लकड़ी को लेकर उसके पीछे-पीछे दौड़ी। जब उसे किसी तरह पकड़ नहीं पाई, तो वही लकड़ी का टुकड़ा उसकी ओर फेंक मारा।

1 Basanta Ray's Sudden Departure With Sitaram

After evening fell, Basanta Ray was sitting alone in the outer quarters. At that moment, Sitaram came and bowed to him.

Basanta Ray asked him, “Well, Sitaram, what is the news?”

Sitaram replied, “I will tell you later; you must come with me.”

Basanta Ray said, “Why, where to, Sitaram?”

Sitaram then came closer and sat down. He whispered something very softly. His eyes widening, Basanta Ray exclaimed, “Is it true?”

Sitaram replied, “Yes, it is, Maharaj.”

Basanta Ray hesitated for a long time in his mind. He said, “Must we go right now?”

Sitaram— “Yes, Maharaj!”

Basanta Ray— “Shouldn't I go see Vibha first?”

Sitaram— “No, Maharaj—there is no more time!”

Basanta Ray— “Where must we go?”

Sitaram— “Come with me, I will take you.”

Basanta Ray stood up and said, “Why shouldn't I just go and see Vibha?”

Sitaram— “No, Maharaj! If we are late, everything will be ruined!”

Basanta Ray said quickly, “Then never mind—never mind!” The two of them set off.

After going a little further, he asked again, “Can we not delay just a little?”

Sitaram— “No, Maharaj, that would lead to danger!”

Saying, “Durga,” Basanta Ray went out of the palace.

2 Udayaditya's Rescue From Prison

Udayaditya did not know that Basanta Ray had arrived. Vibha had not told him, because when there was no possibility of them meeting, the news would only be a cause for his suffering. After bidding him farewell in the evening, Vibha had left the prison. Udayaditya was reading a Sanskrit text with a lamp. The wind was coming through the window, the lamp's faint flame was flickering, and the letters were not clearly visible. Insects were coming and falling onto the lamp. Again and again, the lamp came close to going out. Once, the wind came with a gust—the lamp went out. Udayaditya closed the book and went to sit on his cot. One by one, so many thoughts came to him. He thought of Vibha. Today, Vibha had come a little late and left a little early. Today, he had seen her looking particularly somber; he was pondering this in his mind. It was as if he had no one else on earth—all day long, he saw no one but Vibha—she was his only subject of contemplation. Every one of Vibha’s smiles, every one of her words, was stored in his mind—just as a thirsty person savors every single drop of his drink, so too did he savor the slightest sign of Vibha's affection with his heart and soul. So today, lying alone in this solitary, small, dark room, he was thinking of the sad face of Vibha, the very idol of affection. Sitting in that darkness, it occurred to him—"Is Vibha gradually growing weary of this? Does she no longer enjoy serving a gloomy, dark figure in this joyless prison? Will she increasingly see me as an obstacle to her happiness—a thorn on the path of her life? Today she came late—tomorrow perhaps she will come even later—and then one day, perhaps I will be sitting all day waiting for Vibha to come—afternoon will turn to evening—evening will turn to night, and Vibha will not come!—And after that, perhaps Vibha will not come at all." As this thought continued to rise in Udayaditya’s mind, a gaping void seemed to open up in his heart—he saw the world of his imagination become terrifyingly empty. A day would come when Vibha would look at him with eyes devoid of affection, as the thorn in her happiness—the mere hint of that distant fantasy made his heart utterly distraught. At one point he thought, "How terribly selfish I am! The enmity I am showing Vibha out of my love for her is something perhaps not even an enemy could inflict." Again and again, he resolved not to depend on Vibha anymore—but whenever he imagined he had lost her, that strength would leave him, and he would be cast into a shoreless sea—like a dying, drowning man, he would desperately cling to the imagined image of Vibha.

At that moment, a great commotion of "Fire! Fire!" suddenly erupted outside. Udayaditya's chest tightened—outside, hundreds of voices rose at once, and suddenly, amid various cries of distress, the sound of a hundred people's rapid footsteps was heard in the air. Udayaditya understood that a fire had broken out somewhere near the palace. The clamor continued for a long time—his mind grew extremely restless. Suddenly, the door to his prison was thrown open. Someone entered his dark room—he started and asked, "Who is it?"

He replied, "It is I, Sitaram, please come out."

Udayaditya said—"Why?"

Sitaram said—"Yubaraj, the prison is on fire, come out quickly!" Saying this, he grabbed him and almost carried him out of the prison.

After many days, Udayaditya came to an open space—he suddenly saw a vast expanse of sky above his head, and the air seemed to embrace him, spreading its wide chest. The barriers before his eyes were gone. In that dark night, under the gaze of the countless stars in the sky, standing on the soft web of grass in the wide field, an immense, indescribable joy suddenly arose in his mind. Remaining silent for a moment in that joy, he then asked Sitaram—"What should I do? Where should I go?" He had been confined in a narrow space for a long time, had not walked or moved about—today, having come to this vast field, he asked Sitaram helplessly, "What should I do? Where should I go?" Sitaram said—"Come, come with me!"

3 Udayaditya's Escape and Rukmini's Furious Form

Meanwhile, the fire was raging. In the afternoon, some subjects had come to present a petition to the chief officials. They were sitting together in the palace courtyard—they were the first to raise the alarm about the fire. Near the prison, there was a long row of huts for the guards to live in—that was where their cots, utensils, clothes, and all their belongings were kept. Upon hearing news of the fire, every guard who could ran off; those who absolutely couldn't, started wringing their hands in despair. There were indeed a couple of guards at Udayaditya’s door, but there was no need for a strict watch there. They guarded it merely because it was custom. For Udayaditya would sit so quietly in his room that it never seemed he would try to escape, or even had the desire to. For this reason, the guards at his door had been the first to run away. Night began to fall, but the fire would not go out. Some started moving belongings, others started pouring water, and still others did nothing at all, simply wandering about and making a commotion. After the fire was extinguished, it was they who received more praise than anyone. While everyone was thus occupied, a woman came running into their midst. She wanted to say something—but who would listen to her? Some cursed her, others pushed her away—no one listened to her. One who did listen said, “The Yubaraj has escaped, so what's it to me, you wench, and what's it to you? Dayal Singh knows about it—I can’t leave my own house now.”

Saying this, he vanished into the crowd. Being rebuffed like this again and again, the woman became utterly furious. She forcefully grabbed the first person she found and said, “You wretch, are you blind? Have you no sense that you are in the king’s service? Tomorrow, I will tell the king and have you buried in the ground with thorns below and thorns above! The Yubaraj has escaped!”

“Good for him—what's it to you?” he said, and gave her a sound beating. This man was one of those who had set the fire. After being beaten, the woman’s appearance became terrifying. Her eyes blazed like an angry tigress’s, her hair fanned out, and she ground her teeth. The glow of the flames falling on her face made it look like that of a demoness. A piece of wood was burning in front of her; she picked it up. Her hand was burned, but she did not drop it. Taking the burning log, she ran after him. Unable to catch him, she threw the piece of wood at him.

1 シタラムと共にバサンタ・ライの急な出発

日が暮れてから、バサンタ・ライは一人、屋敷の表座敷に座っていた。そこへシタラムがやって来て、彼にお辞儀をした。

バサンタ・ライは尋ねた。「どうした、シタラム。何か知らせか?」

シタラムは言った。「それは後ほど申し上げます。あなた様には私とご一緒いただかねばなりません。」

バサンタ・ライは言った。「なぜだ、どこへ行くのだ、シタラム?」

シタラムはそばに寄って座った。そして、ひそひそと何かを囁いた。バサンタ・ライは目を見開いて言った。「まことか?」

シタラムは言った。「は、マハラジャ。」

バサンタ・ライは心の中で大いにためらった。そして言った。「今すぐ行かねばならんのか!」

シタラムは「はっ!」と答えた。

バサンタ・ライは「一度ビバに会ってくるわけにはいかんか?」と尋ねた。

シタラムは「なりませぬ。もはや時間がございません!」と言った。

バサンタ・ライは「どこへ行くのだ?」と聞いた。

シタラムは「私にお従いください。私がご案内いたします」と答えた。

バサンタ・ライは立ち上がって言った。「なぜビバに一目会ってきてはならんのだ?」

シタラムは「なりませぬ、マハラジャ!遅れれば万事休すにございます!」と訴えた。

バサンタ・ライは慌てて言った。「ならばやむを得ん、やむを得ん!」二人は歩き出した。

また少し進んでから、彼は言った。「少しでも遅らせることはできんのか?」

シタラムは「なりませぬ、マハラジャ。さすれば危険が!」と答えた。

「ドゥルガよ」と呟き、バサンタ・ライは王宮の外へ出た。

2 牢獄からのウダヤディティヤの救出

バサンタ・ライが来ていることを、ウダヤディティヤは知らない。ビバは彼に告げなかった。なぜなら、二人が会える見込みがない以上、その知らせは彼の苦しみを増すだけだったからだ。夕方、別れを告げてビバは牢獄から去って行った。ウダヤディティヤは灯りを一つともし、サンスクリット語の書物を読んでいた。窓から風が吹き込み、灯りの弱い炎が揺れ、文字がよく見えない。虫が灯りに飛び込んでくる。炎は何度も消えそうになる。一度、風が強く吹き込み――灯りは消えてしまった。ウダヤディティヤは書物を閉じ、寝台に腰掛けた。次から次へと考えが浮かんでは消えた。ビバのことが心に浮かんだ。今日はビバが来るのが少し遅く、帰るのが少し早かった。今日の彼女はいつもより沈んで見えた。――そのことを心の中で反芻していた。この世に、彼には他に誰もいないかのようだった。一日中ビバ以外には誰にも会わない。ビバだけが彼の関心のすべてなのだ。彼女の微笑みの一つ一つ、言葉の一言一言が彼の心に蓄えられていく。喉の渇いた者が飲み物の一滴まで味わうように、彼はビバの愛情のどんな些細な印までも心と魂で味わうのだった。だから今日、この寂しい小さな暗い部屋の中で一人横になり、愛しい妹ビバの沈んだ顔を思い浮かべていた。その暗闇に座りながら、ふと彼は思った。「ビバはだんだん嫌気がさしてきたのだろうか?この陰鬱な牢獄で、暗い顔をした者の世話をするのがもう嫌になったのだろうか?私のことを、彼女の幸せの妨げ――人生の道の棘だと思うようになるのだろうか?今日は来るのが遅かった。明日はもっと遅くなるかもしれない。そしていつか、一日中ビバがいつ来るかと待っていても――夕方になり、夜になっても、ビバはもう来ない!――そしてその日から、もうビバは来なくなるのかもしれない」。ウダヤディティヤの心にこの考えが浮かぶにつれて、彼の心は虚しくなり、想像の世界が恐ろしいほど空虚に見えた。「いつかビバが愛情のない目で、自分を幸せの棘として見る日が来る」――そのあまりに遠い想像の気配に触れただけで、彼の心はすっかりかき乱されてしまった。「私はなんて恐ろしく利己的なんだ!ビバを愛しているからといって、私は彼女にひどい仕打ちをしている。どんな敵でもこれほどのことはできないだろう」。もうビバに頼らないと何度も心に誓うが、ビバを失うことを想像した途端、その力は消え失せ、彼は果てしない大海に投げ出されたようになる。溺れ死ぬ寸前の者のように、ビバの幻の姿に必死でしがみつくのだった。

その時、外で突然「火事だ!火事だ!」というすさまじい騒ぎ声が上がった。ウダヤディティヤの胸は高鳴った。外では百もの声が一度に上がり、様々な苦しみの叫び声と共に、空に響くように大勢の人の慌ただしい足音が聞こえた。ウダヤディティヤは、宮殿の近くのどこかで火事が起きたのだと悟った。しばらく騒ぎは続いた。彼の心はひどく落ち着かなくなった。突然、彼の牢獄の扉が勢いよく開かれた。誰かが彼の暗い部屋に入ってきた。彼は驚いて立ち上がり、尋ねた。「誰だ?」

その者は答えた。「私です、シタラムです。さあ、外へ出てください。」

ウダヤディティヤは言った。「なぜだ?」

シタラムは言った。「王太子、牢獄に火がつきました。早く外へ出てください!」そう言って彼を掴み、ほとんど抱えるようにして牢獄の外へ連れ出した。

長い月日の後、ウダヤディティヤは今日、開けた場所に出た。頭上には突然、広大な空が見えた。風がその広い胸を広げて彼を抱きしめるかのようだった。視界を遮るものが四方から取り払われた。その暗い夜、空に無数に輝く星々の眼差しの下、広々とした野原の柔らかな草の上に立ち、突然、彼の心に計り知れない、言葉にできない喜びが湧き上がった。その喜びにしばらく黙然としていたが、やがてシタラムに尋ねた。「どうすればいい?どこへ行けばいい?」長い間、狭い場所に閉じ込められ、歩き回ることもなかった。今日、この広い野原に出てきて、彼は途方に暮れたようにシタラムに尋ねた。「どうすればいい?どこへ行けばいい?」シタラムは言った。「さあ、私と一緒に来てください!」

3 ウダヤディティヤの脱出とルクミニの鬼女の相

一方、火は激しく燃え上がっていた。午後、何人かの民が役人たちに何かを請願するために来ており、宮殿の中庭に集まっていたが、その民たちが最初に火事を知らせる叫び声を上げた。牢獄の近くには衛兵たちが寝泊まりするための長い小屋が立ち並んでおり、そこには彼らの寝台や食器、衣服、家財道具のすべてが置かれていた。火事の知らせを聞くやいなや、駆けつけられる限りの衛兵が皆そこへ走り、どうしても駆けつけられない者たちは、手足をばたつかせてじたばたするばかりだった。ウダヤディティヤの部屋の戸口にも二、三人の衛兵はいたが、そこを厳重に見張る必要はまったくなかった。慣例であったために見張りをしていたにすぎない。というのも、ウダヤディティヤはあまりにも静かに部屋に座っていたため、彼が逃亡を企てたり、その意志があったりするようには到底思えなかったからだ。そのため、彼の戸口にいた衛兵たちが真っ先に駆けつけていったのである。夜になっても火は消えない。ある者は家財道具を運び出し、ある者は水をかけ、またある者は何もせずただ騒ぎ立てて歩き回っていた。火が消えた後、この最後の者たちが誰よりも多くの称賛を浴びたのであった。皆がこのようにてんてこ舞いになっている最中、一人の女が彼らの中に駆け込んできた。彼女は何かを言いたがっていたが、その言葉に耳を貸す者などいるだろうか。ある者は彼女を罵り、ある者は突き飛ばした。誰も彼女の話を聞かなかった。話を聞いた者も、「王太子様が逃げられただと?それが俺に何の関係がある、この女め!お前にもだ!それはダヤル・シンの知ったことだ。俺は自分の家を放って今どこへも行けん」と言った。

そう言うと、彼は人混みの中へ紛れてしまった。このように何度も突き返され、その女は猛烈に激高した。手近にいた一人を力ずくで捕まえると、言った。「このろくでなしども!目は節穴か!王に仕えているという自覚はないのか!明日、王に申し上げて、下にも上にも茨を敷いて土に埋めてもらってからでなければ、承知しないからな。王太子様が逃げられたというのに!」

「結構なことじゃないか。それがお前に何の関係がある」と言って、男は彼女をさんざんに打ちのめした。この男は、小屋に火を放った者たちの一人だったのである。打ちのめされた女の形相は、凄まじいものとなった。怒れる雌虎のように両眼が燃え、髪は逆立ち、歯ぎしりを始めた。その顔に炎の光が照り映え、鬼女のように見えた。目の前で燃えていた木切れを一つ拾い上げた。手は焼けたが、それを放そうとはしなかった。その燃えさかる木切れを手に、男の後を追った。どうしても追いつけないとわかると、その木切れを男に向かって投げつけた。