1 বসন্ত রায়ের সন্ধানে উদয়াদিত্য

বিজন পথ দিয়া বিদ্যুদ্বেগে যুবরাজ অশ্ব ছুটাইয়া চলিয়াছেন। অন্ধকার রাত্রি, কিন্তু পথ দীর্ঘ সরল প্রশস্ত বলিয়া কোন ভয়ের আশঙ্কা নাই। স্তব্ধ রাত্রে অশ্বের খুরের শব্দে চারিদিক প্রতিধ্বনিত হইতেছে, দুই একটি কুকুর ঘেউ-ঘেউ করিয়া ডাকিয়া উঠিতেছে, দুই একটা শৃগাল চকিত হইয়া পথ ছাড়িয়া বাঁশঝাড়ের মধ্যে লুকাইতেছে। আলোকের মধ্যে আকাশে তারা ও পথপ্রান্তস্থিত গাছে জোনাকি; শব্দের মধ্যে ঝিঁ ঝিঁ পোকার অবিশ্রাম শব্দ; মনুষ্যের মধ্যে কঙ্কাল-অবশেষ একটি ভিখারী বৃদ্ধা গাছের তলায় ঘুমাইয়া আছে! পাঁচ ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া, যুবরাজ পথ ছাড়িয়া একটা মাঠে নামিলেন। অশ্বের বেগ অপেক্ষাকৃত সংযম করিতে হইল! দিনের বেলায় বৃষ্টি হইয়াছিল, মাটি ভিজা ছিল, পদে পদে অশ্বের পা বসিয়া যাইতেছে। যাইতে যাইতে সম্মুখের পায়ে ভর দিয়া অশ্ব তিনবার পড়িয়া গেল। শ্রান্ত অশ্বের নাসারন্ধ্র বিস্ফারিত, মুখে ফেন, পশ্চাতের পদদ্বয়ের ঘর্ষণে ফেন জন্মিয়াছে, পঞ্জরের ভিতর হইতে একটা শব্দ বাহির হইতেছে, সর্ব্বাঙ্গ ঘর্ম্মে প্লাবিত। এদিকে দারুণ গ্রীষ্ম, বাতাসের লেশ মাত্র নাই, এখনো অনেকটা পথ অবশিষ্ট রহিয়াছে। বহুতর জলা ও চষা মাঠ অতিক্রম করিয়া যুবরাজ অবশেষে একটা কাঁচা রাস্তায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। অশ্বকে আবার দ্রুতবেগে ছুটাইলেন। একবার তাহার স্কন্ধ চাপড়াইয়া উৎসাহ দিয়া ডাকিলেন, “সুগ্রীব!” সে চকিতে একবার কান খাড়া করিয়া বড় বড় চোখ, বঙ্কিম দৃষ্টিতে প্রভুর দিকে চাহিল, একবার গ্রীবা বাঁকাইয়া হ্রেষাধ্বনি করিল ও সবলে মুখ নামাইয়া রাশ শিথিল করিয়া লইল ও গ্রীবা নত করিয়া ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটিতে লাগিল। দুই পার্শ্বের গাছপালা চোখে ভাল দেখা যাইতেছে না, আকাশে চাহিলে মনে হইতেছে যেন দলে দলে নক্ষত্রেরা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত সবেগে উড়িয়া যাইতেছে এবং সেই স্তব্ধবায়ু আকাশে তরঙ্গিত হইয়া কানের কাছে সাঁ সাঁ করিতে লাগিল। রাত্রি যখন তৃতীয় প্রহর, লোকালয়ের কাছে শৃগালেরা যখন ডাকিয়া গেল, তখন যুবরাজ, শিমুলতলীর চটির দুয়ারে আসিয়া দাঁড়াইলেন, তাঁহার অশ্ব তৎক্ষণাৎ গতজীবন হইয়া ভূমিতে পড়িয়া গেল। নামিয়া তাহার পিঠ চাপড়াইলেন, তাহার মুখ তুলিয়া ধরিলেন, সুগ্রীব বলিয়া কতবার ডাকিলেন, সে আর নড়িল না। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া যুবরাজ দ্বারে গিয়া আঘাত করিলেন। বার বার আঘাতের পর চটির অধ্যক্ষ দ্বার না খুলিয়া জানালার মধ্য দিয়া কহিল—“এতরাত্রে তুমি কেগো?” দেখিল একজন সশস্ত্র যুবক দ্বারে দাঁড়াইয়া।

যুবরাজ কহিলেন “একটা কথা জিজ্ঞাসা করিব দ্বার খোল।”

সে কহিল, “দ্বার খুলিবার আবশ্যক কি, যাহা জিজ্ঞাসা করিবার আছে, জিজ্ঞাসা কর না!”

যুবরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন—“রায়গড়ের রাজা বসন্তরায় এখানে আছেন?”

সে কহিল—“আজ্ঞা সন্ধ্যার পর তাঁহার আসিবার কথা ছিল বটে, কিন্তু এখনো আসেন নাই। আজ বোধ করি, তাঁহার আসা হইল না।”

যুবরাজ দুইটি মুদ্রা লইয়া শব্দ করিয়া কহিলেন—“এই লও।”

সে তাড়াতাড়ি ছুটিয়া আসিয়া দ্বার খুলিয়া মুদ্রা দুইটি লইল। তখন যুবরাজ তাহাকে কহিলেন—“বাপু আমি একবারটি তোমার চটি অনুসন্ধান করিয়া দেখিব, কে কে আছে?”

চটি-রক্ষক সন্দিগ্ধ ভাবে কহিল—“না মহাশয় তাহা হইবেক না।”

উদয়াদিত্য কহিলেন—“আমাকে বাধা দিও না। আমি রাজবাটির কর্ম্মচারী। দুই জন অপরাধীর অনুসন্ধানে আসিয়াছি।”

এই কথা বলিয়াই তিনি প্রবেশ করিলেন। চটি-রক্ষক তাঁহাকে আর বাধা দিল না। তিনি সমস্ত অনুসন্ধান করিয়া দেখিলেন। না বসন্ত রায়, না তাঁহার অনুচর, না কোন পাঠানকে দেখিতে পাইলেন। কেবল দুই জন সুপ্তোত্থিতা প্রৌঢ়া চেঁচাইয়া উঠিল “আ মরণ মিন্সে অমন করিয়া তাকাইতেছিস্ কেন?”

চটি হইতে বাহির হইয়া পথে দাঁড়াইয়া যুবরাজ ভাবিতে লাগিলেন। একবার মনে করিলেন যে, ভালই হইয়াছে, হয়ত আজ দৈবক্রমে তিনি আসিতে পারেন নাই। আবার মনে করিলেন যদি ইহার পূর্ব্ববর্তী কোন চটিতে থাকেন ও পাঠানেরা তাঁহার অনুসন্ধানে সেখানে গিয়া থাকে? এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে সেই পথ বাহিয়া চলিতে লাগিলেন। কিয়দ্দূর গিয়া দেখিলেন, বিপরীত দিক্ হইতে একজন অশ্বারোহী আসিতেছে। নিকটে আসিলে কহিলেন “কেও? রতন নাকি?” সে অশ্ব হইতে তৎক্ষণাৎ নামিয়া তাঁহাকে প্রণাম করিয়া কহিল “আজ্ঞা হাঁ। যুবরাজ আপনি এতরাত্রে এখানে যে?”

যুবরাজ কহিলেন “তাহার কারণ পরে বলিব। এখন বল ত দাদা মহাশয় কোথায় আছেন।”

“আজ্ঞা, তাঁহার ত চটিতেই থাকিবার কথা।”

“সে কি? সেখানে ত তাঁহাকে দেখিলাম না।”

সে অবাক্ হইয়া কহিল “ত্রিশ জন অনুচর সমেত মহারাজ যশোর উদ্দেশে যাত্রা করিয়াছেন। আমি কার্য্যবশত পিছাইয়া পড়িয়াছিলাম। এই চটিতে আজ সন্ধ্যাবেলা তাঁহার সহিত মিলিবার কথা।”

“পথে যেরূপ কাদা, তাহাতে পদচিহ্ন থাকিবার কথা, তাহাই অনুসরণ করিয়া আমি তাঁহার অনুসন্ধানে চলিলাম। তোমার ঘোটক লইলাম। তুমি পদব্রজে এস!”

1 বসন্ত রায়ের সন্ধানে উদয়াদিত্য

নির্জন পথ দিয়ে বিদ্যুৎবেগে যুবরাজ ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন। অন্ধকার রাত, কিন্তু পথ দীর্ঘ, সোজা ও চওড়া হওয়ায় কোনো ভয়ের আশঙ্কা নেই। নিস্তব্ধ রাতে ঘোড়ার খুরের শব্দে চারিদিক প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, দু-একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠছে, দু-একটি শেয়াল চমকে গিয়ে পথ ছেড়ে বাঁশঝাড়ের মধ্যে লুকাচ্ছে। আলো বলতে আকাশে তারা আর পথের ধারের গাছে জোনাকি; শব্দ বলতে ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা ডাক; আর মানুষের মধ্যে কঙ্কালসার এক ভিখারি বুড়ি গাছের তলায় ঘুমিয়ে আছে! পাঁচ ক্রোশ পথ পেরিয়ে যুবরাজ পথ ছেড়ে একটা মাঠে নামলেন। ঘোড়ার বেগ কিছুটা কমাতে হলো। দিনের বেলায় বৃষ্টি হয়েছিল, মাটি ভেজা ছিল, পদে পদে ঘোড়ার পা বসে যাচ্ছে। যেতে যেতে সামনের পায়ে ভর দিয়ে ঘোড়াটা তিনবার পড়ে গেল। ক্লান্ত ঘোড়াটার নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, মুখে ফেনা, পেছনের দুই পায়ের ঘষায় ফেনা জমেছে, পাঁজরের ভেতর থেকে একটা শব্দ বেরোচ্ছে, সারা শরীর ঘামে ভেসে যাচ্ছে। এদিকে প্রচণ্ড গরম, বাতাসের লেশমাত্র নেই, এখনও অনেকটা পথ বাকি। অনেক জলাজমি আর চাষ করা মাঠ পেরিয়ে যুবরাজ অবশেষে একটা কাঁচা রাস্তায় এসে পৌঁছালেন। ঘোড়াটাকে আবার দ্রুতবেগে ছোটালেন। একবার তার কাঁধে চাপড় মেরে উৎসাহ দিয়ে ডাকলেন, “সুগ্রীব!” সে চকিতে একবার কান খাড়া করে বড় বড় চোখে, বাঁকা দৃষ্টিতে প্রভুর দিকে চাইল, একবার ঘাড় ঘুরিয়ে চিঁহিঁ করে ডেকে উঠল এবং সবলে মুখ নামিয়ে লাগাম আলগা করে নিল ও ঘাড় নিচু করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। দুই পাশের গাছপালা চোখে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, আকাশের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে যেন ঝাঁকে ঝাঁকে নক্ষত্র আগুনের ফুলকির মতো সবেগে উড়ে যাচ্ছে এবং সেই থমথমে বাতাস যেন ঢেউ তুলে কানের কাছে সাঁ সাঁ করতে লাগল। রাত যখন তৃতীয় প্রহর, জনবসতির কাছে শেয়ালেরা যখন ডেকে উঠল, তখন যুবরাজ শিমুলতলীর চটির দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁর ঘোড়াটা সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। নেমে তার পিঠ চাপড়ালেন, তার মুখ তুলে ধরলেন, সুগ্রীব বলে কতবার ডাকলেন, সে আর নড়ল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে যুবরাজ দরজায় গিয়ে আঘাত করলেন। বারবার আঘাতের পর চটির মালিক দরজা না খুলে জানালার মধ্যে দিয়ে বলল— “এত রাতে তুমি কে হে?” দেখল একজন সশস্ত্র যুবক দরজায় দাঁড়িয়ে।

যুবরাজ বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব, দরজা খোলো।”

সে বলল, “দরজা খোলার দরকার কী, যা জিজ্ঞেস করার আছে, করো না!”

যুবরাজ জিজ্ঞেস করলেন— “রায়গড়ের রাজা বসন্ত রায় এখানে আছেন?”

সে বলল— “আজ্ঞে, সন্ধ্যের পর তাঁর আসার কথা ছিল বটে, কিন্তু এখনও আসেননি। আজ বোধহয় তাঁর আসা হলো না।”

যুবরাজ দুটো মুদ্রা নিয়ে শব্দ করে বললেন— “এই নাও।”

সে তাড়াতাড়ি ছুটে এসে দরজা খুলে মুদ্রা দুটো নিল। তখন যুবরাজ তাকে বললেন— “বাপু, আমি একবার তোমার চটিটা খুঁজে দেখব, কে কে আছে?”

চটির রক্ষক সন্দিগ্ধভাবে বলল— “না মহাশয়, তা হবে না।”

উদয়াদিত্য বললেন— “আমাকে বাধা দিও না। আমি রাজবাড়ির কর্মচারী। দুজন অপরাধীর খোঁজে এসেছি।”

এই কথা বলেই তিনি ভেতরে ঢুকলেন। চটির রক্ষক তাঁকে আর বাধা দিল না। তিনি সবটা খুঁজে দেখলেন। না বসন্ত রায়, না তাঁর অনুচর, না কোনো পাঠানকে দেখতে পেলেন। কেবল ঘুম থেকে ওঠা দুজন প্রৌঢ়া চেঁচিয়ে উঠল, “আ মরণ! মিনসে, অমন করে তাকাচ্ছিস কেন?”

চটি থেকে বেরিয়ে পথে দাঁড়িয়ে যুবরাজ ভাবতে লাগলেন। একবার মনে করলেন যে, ভালোই হয়েছে, হয়তো আজ দৈবক্রমে তিনি আসতে পারেননি। আবার মনে করলেন, যদি এর আগের কোনো চটিতে থাকেন আর পাঠানেরা তাঁর খোঁজে সেখানে গিয়ে থাকে? এইরকম ভাবতে ভাবতে সেই পথ ধরে চলতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়ে দেখলেন, উল্টো দিক থেকে একজন অশ্বারোহী আসছে। কাছে এলে বললেন, “কে? রতন নাকি?” সে ঘোড়া থেকে তৎক্ষণাৎ নেমে তাঁকে প্রণাম করে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ। যুবরাজ, আপনি এত রাতে এখানে যে?”

যুবরাজ বললেন, “তার কারণ পরে বলব। এখন বলো তো দাদামশাই কোথায় আছেন?”

“আজ্ঞে, তাঁর তো চটিতেই থাকার কথা।”

“সে কী? সেখানে তো তাঁকে দেখলাম না।”

সে অবাক হয়ে বলল, “তিরিশজন অনুচর সঙ্গে নিয়ে মহারাজ যশোরের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। আমি কাজের জন্য পিছিয়ে পড়েছিলাম। এই চটিতে আজ সন্ধ্যাবেলা তাঁর সঙ্গে মেলার কথা।”

“পথে যেমন কাদা, তাতে পায়ের ছাপ থাকার কথা। আমি সেই ছাপ অনুসরণ করে তাঁর খোঁজে চললাম। তোমার ঘোড়াটা নিলাম। তুমি পায়ে হেঁটে এসো!”

1 बसंत राय की खोज में उदयादित्य

युवराज निर्जन पथ पर बिजली की गति से घोड़ा दौड़ाए चले जा रहे थे। रात अंधेरी थी, लेकिन रास्ता लंबा, सीधा और चौड़ा होने के कारण किसी भय की आशंका नहीं थी। स्तब्ध रात्रि में घोड़े की टापों की आवाज़ से चारों दिशाएँ प्रतिध्वनित हो रही थीं, एक-दो कुत्ते भौं-भौं कर उठते, तो एक-दो सियार चौंककर रास्ता छोड़ बांस की झाड़ियों में छिप जाते। रोशनी के नाम पर आकाश में तारे और रास्ते के किनारे पेड़ों पर जुगनू थे; ध्वनि के नाम पर झींगुरों की अविराम झंकार; और मनुष्यों में, कंकाल-मात्र एक बूढ़ी भिखारिन पेड़ के नीचे सो रही थी! पाँच कोस का रास्ता तय करके, युवराज ने राह छोड़ी और एक खेत में उतर गए। घोड़े की गति को अपेक्षाकृत धीमा करना पड़ा! दिन में बारिश हुई थी, मिट्टी गीली थी, और कदम-कदम पर घोड़े के पैर धँस रहे थे। चलते-चलते आगे के पैरों पर ज़ोर पड़ने से घोड़ा तीन बार गिर गया। थके हुए घोड़े के नथुने फूल गए थे, मुँह में झाग था, पिछले दोनों पैरों के घर्षण से भी झाग बन गया था, पसलियों के भीतर से एक अजीब आवाज़ निकल रही थी, और सारा शरीर पसीने से लथपथ था। इधर भयंकर गर्मी थी, हवा का नामोनिशान तक नहीं था, और अभी भी बहुत रास्ता बाकी था। कई दलदलों और जुते हुए खेतों को पार कर युवराज आखिरकार एक कच्ची सड़क पर पहुँचे। उन्होंने घोड़े को फिर से तेज़ी से दौड़ाया। एक बार उसकी पीठ थपथपाकर उत्साह देते हुए पुकारा, “सुग्रीव!” उसने चौंककर एक बार कान खड़े किए, बड़ी-बड़ी आँखों से तिरछी नज़र से अपने स्वामी को देखा, एक बार गर्दन मोड़कर हिनहिनाया और ज़ोर से मुँह नीचे करके लगाम ढीली कर ली और गर्दन झुकाकर बेतहाशा दौड़ने लगा। दोनों ओर के पेड़-पौधे ठीक से दिखाई नहीं दे रहे थे, आकाश की ओर देखने पर ऐसा लगता था मानो तारों के झुंड आग की चिंगारियों की तरह तेज़ी से उड़ रहे हों और वही शांत हवा कानों के पास से गुज़रते हुए सांय-सांय करने लगी। जब रात्रि का तीसरा पहर था, जब आबादी के पास सियार बोल उठे, तब युवराज, सिमुलतली की सराय के द्वार पर आकर खड़े हुए, और उनका घोड़ा तुरंत ही प्राणहीन होकर भूमि पर गिर पड़ा। उतरकर उन्होंने उसकी पीठ थपथपाई, उसका मुँह उठाकर पकड़ा, 'सुग्रीव' कहकर कई बार पुकारा, पर वह हिला तक नहीं। एक लंबी साँस छोड़कर युवराज ने द्वार पर जाकर दस्तक दी। बार-बार दस्तक देने के बाद सराय के प्रबंधक ने दरवाज़ा खोले बिना खिड़की से कहा— “इतनी रात गए तुम कौन हो?” उसने देखा कि एक सशस्त्र युवक द्वार पर खड़ा है।

युवराज ने कहा, “एक बात पूछनी है, दरवाज़ा खोलो।”

उसने कहा, “दरवाज़ा खोलने की क्या ज़रूरत है, जो पूछना है, पूछ लो न!”

युवराज ने पूछा— “क्या रायगढ़ के राजा बसंत राय यहाँ हैं?”

उसने कहा— “जी, शाम के बाद उनके आने की बात तो थी, लेकिन अभी तक आए नहीं हैं। लगता है आज उनका आना नहीं होगा।”

युवराज ने दो सिक्के निकालकर खनखनाते हुए कहा— “यह लो।”

वह जल्दी से दौड़कर आया, दरवाज़ा खोला और दोनों सिक्के ले लिए। तब युवराज ने उससे कहा— “भाई, मैं एक बार तुम्हारी सराय की तलाशी लेकर देखना चाहता हूँ कि कौन-कौन है?”

सराय के रक्षक ने संदिग्ध भाव से कहा— “नहीं महाशय, यह नहीं हो सकता।”

उदयादित्य ने कहा— “मुझे रोको मत। मैं राजमहल का कर्मचारी हूँ। दो अपराधियों की तलाश में आया हूँ।”

यह कहकर उन्होंने प्रवेश किया। सराय के रक्षक ने उन्हें और नहीं रोका। उन्होंने सब कुछ खोजकर देखा। न तो बसंत राय, न उनके अनुचर, और न ही कोई पठान दिखाई दिया। केवल नींद से जागी दो प्रौढ़ महिलाएँ चिल्ला उठीं, “अरे मुए, ऐसे क्यों घूर रहा है?”

सराय से बाहर निकलकर रास्ते में खड़े होकर युवराज सोचने लगे। एक बार सोचा कि अच्छा ही हुआ, शायद आज दैवयोग से वह आ नहीं पाए। फिर सोचा, यदि वह इससे पहले की किसी सराय में ठहरे हों और पठान उनकी खोज में वहाँ जा पहुँचे हों तो? यही सब सोचते-सोचते वह उसी रास्ते पर आगे बढ़ने लगे। कुछ दूर जाकर उन्होंने देखा कि विपरीत दिशा से एक घुड़सवार आ रहा है। निकट आने पर उन्होंने कहा, “कौन? रतन हो क्या?” वह घोड़े से तुरंत उतरकर उन्हें प्रणाम करते हुए बोला, “जी हाँ। युवराज, आप इतनी रात को यहाँ कैसे?”

युवराज ने कहा, “इसका कारण बाद में बताऊँगा। अभी बताओ, दादा महाशय कहाँ हैं।”

“जी, उन्हें तो सराय में ही होना चाहिए था।”

“यह क्या? मैंने तो उन्हें वहाँ नहीं देखा।”

उसने आश्चर्यचकित होकर कहा, “महाराज तो तीस अनुचरों के साथ यशोर के लिए निकले हैं। मैं एक काम की वजह से पीछे रह गया था। आज शाम इसी सराय में उनसे मिलने की बात थी।”

“रास्ते में जैसी कीचड़ है, उसमें पदचिह्न होने चाहिए, मैं उन्हीं का अनुसरण करते हुए उनकी खोज में चलता हूँ। मैंने तुम्हारा घोड़ा ले लिया। तुम पैदल आओ!”

1 Udayaditya's Search for Basanta Ray

The Yubaraj galloped his horse at lightning speed down the desolate path. It was a dark night, but as the path was long, straight, and wide, there was no fear of danger. In the still night, the sound of the horse's hooves echoed all around; a dog or two barked 'ghue-ghue', and a couple of jackals, startled, left the path to hide in the bamboo groves. For light, there were stars in the sky and fireflies in the trees by the roadside; for sound, there was the incessant chirping of crickets; for humanity, there was a single skeletal old beggar woman sleeping under a tree! After covering a distance of five kroshas, the Yubaraj left the path and descended into a field. He had to rein in the horse's speed. It had rained during the day, the ground was wet, and the horse's hooves sank at every step. As it went, the horse fell three times, putting its weight on its front legs. The exhausted horse's nostrils were flared, its mouth was foaming, foam had formed from the chafing of its hind legs, a sound was emerging from within its ribs, and its entire body was drenched in sweat. Meanwhile, the heat was oppressive, there was not a trace of wind, and there was still a long way to go. After crossing numerous marshes and ploughed fields, the Yubaraj finally reached an unpaved road. He urged the horse to gallop again. He patted its neck once encouragingly and called, 'Sugriva!' Startled, the horse pricked up its ears for a moment and looked at its master with large, slanted eyes, then arched its neck and neighed, forcefully lowered its head to slacken the reins, and, with neck bent, began to run breathlessly. The trees on either side were barely visible; looking at the sky, it seemed as if groups of stars were flying by furiously like sparks of fire, and the still air, rippling, began to whoosh past his ears. When it was the third watch of the night, as the jackals began to howl near the human settlements, the Yubaraj stopped at the door of the inn at Simultali; his horse, instantly lifeless, fell to the ground. He dismounted, patted its back, lifted its head, and called 'Sugriva' many times, but it did not move again. With a deep sigh, the Yubaraj went to the door and knocked. After repeated knocks, the innkeeper, without opening the door, spoke through a window—'Who are you at this late hour?' He saw an armed young man standing at the door.

The Yubaraj said, 'Open the door, I have a question to ask.'

He replied, 'What need is there to open the door? Just ask what you have to ask!'

The Yubaraj asked—'Is King Basanta Ray of Raigarh here?'

He replied—'Sir, he was supposed to arrive after evening, but he has not come yet. I suppose he will not be coming today.'

The Yubaraj took out two coins, and making them jingle, said—'Take these.'

He hurried over, opened the door, and took the two coins. Then the Yubaraj said to him—'My good man, I would like to search your inn to see who is here.'

The innkeeper said suspiciously—'No, sir, that cannot be done.'

Udayaditya said—'Do not stop me. I am an official from the royal palace. I have come in search of two criminals.'

Saying this, he entered. The innkeeper did not stop him any longer. He searched the entire place. He found neither Basanta Ray, nor his attendants, nor any Pathan. Only two middle-aged women, woken from their sleep, shrieked, 'Death to you, you wretch! Why are you staring like that?'

Emerging from the inn, the Yubaraj stood on the path and began to think. For a moment, he thought that it was for the best; perhaps by a stroke of fate, his uncle had been unable to come today. Then again, he thought, what if he is at a previous inn and the Pathans have gone there in search of him? Lost in such thoughts, he started walking down that path. After going a short distance, he saw a horseman approaching from the opposite direction. When he came closer, he called out, 'Who is it? Ratan?' The man immediately dismounted from his horse, bowed to him, and said, 'Indeed, sire. Yubaraj, what brings you here at this hour?'

The Yubaraj said, 'I will tell you the reason later. For now, tell me, where is my grand-uncle?'

'Sire, he was supposed to be at the inn.'

'What? But I did not see him there.'

The man, astonished, said, 'The Maharaj set out for Jessore with thirty attendants. I was delayed on an errand. I was supposed to meet him at this inn this evening.'

'With this much mud on the road, there ought to be footprints. I will follow them to find him. I am taking your horse. You follow on foot!'

1 バサンタ・ライを捜すウダヤディティヤ

人気のない道を、王太子は稲妻のような速さで馬を走らせていた。闇夜であったが、道は長くまっすぐで広いため、何の恐れもなかった。静寂の夜に馬の蹄の音が四方に響き渡り、二、三匹の犬がワンワンと吠え、二、三匹のジャッカルが驚いて道を離れ、竹やぶの中に隠れている。光といえば空には星、道端の木々には蛍。音といえばコオロギの絶え間ない鳴き声。人間といえば、骸骨同然の年老いた物乞いの老婆が木の下で眠っているだけだった!五クロースの道を進んだ後、王太子は道を外れて野原に出た。馬の速度をいくぶん抑えなければならなかった。日中に雨が降ったため土は濡れており、一歩ごとに馬の足がめり込んでいく。進むうちに、馬は前足に体重をかけて三度も転んでしまった。疲れ果てた馬は鼻孔を広げ、口から泡を吹き、後ろ足の摩擦でも泡が生じ、肋骨の中からぜいぜいと音がし、全身が汗でびっしょりになっていた。その上、ひどい暑さで風は微塵もなく、まだかなりの道のりが残っていた。多くの沼地や耕された畑を越え、王太子はようやく未舗装の道にたどり着いた。再び馬を速く走らせた。一度その肩を叩いて励まし、「スグリーヴァ!」と呼びかけた。馬はっと耳を立て、大きな目で主人を横目で見、一度首を曲げていななき、力強く頭を下げて手綱を緩めさせると、首をうなだれて息を切らしながら走り出した。両側の木々はよく見えず、空を見上げれば、まるで星の群れが火の粉のように猛スピードで飛び去っていくように思え、その静まり返った空気が波打って耳元でびゅうびゅうと鳴り響いた。夜が第三刻になり、人里近くでジャッカルが鳴いた頃、王太子はシムルタリの旅籠の戸口にたどり着いた。彼の馬は、その瞬間に命尽きて地面に倒れた。馬から降りてその背を叩き、顔を持ち上げ、「スグリーヴァ」と何度も呼んだが、もはや動かなかった。深いため息をつき、王太子は戸口へ行って扉を叩いた。何度も叩いた後、旅籠の主は扉を開けずに窓越しに言った。「こんな夜更けに、あんたは誰だね?」見ると、武装した若者が戸口に立っていた。

王太子は言った。「聞きたいことがある。扉を開けろ」

主は言った。「扉を開ける必要がどこにある。聞きたいことがあるなら、そうやって聞けばいいだろう!」

王太子は尋ねた。「ライガルの王、バサンタ・ライ殿はここにおられるか?」

主は言った。「へえ、夕方過ぎにお見えになるという話でしたが、まだいらっしゃいませんな。今日はもう、お越しにはならないんでしょう」

王太子は二枚の貨幣を取り出して音を立てて言った。「これを取れ」

主は急いで駆け寄ってきて扉を開け、貨幣二枚を受け取った。すると王太子は彼に言った。「おい、お前の旅籠を一度調べさせてもらう。誰がいるのかをな」

旅籠の主は疑わしげに言った。「いえ、旦那様、それはできかねます」

ウダヤディティヤは言った。「邪魔をするな。私は王宮の役人だ。二人の罪人を探しに来た」

そう言うなり、彼は中に入った。旅籠の主はもう彼を止めなかった。彼は隅々まで調べた。しかし、バサンタ・ライも、その従者も、どのパターン人も見当たらなかった。ただ、眠りから覚めた二人の初老の女が「あらまあ、死にぞこないの男が、何をじろじろ見てるんだい!」と叫んだだけだった。

旅籠から出て道に立ち、王太子は考え込んだ。一度は、これでよかった、おそらく今日は偶然にも来られなかったのだろう、と思った。だがまた、もしこの手前のいずれかの旅籠におられ、パターン人たちがそこへ捜しに行ったとしたら?と考えながら、その道をたどって歩き始めた。しばらく行くと、反対方向から一人の騎馬の者が来るのが見えた。近くに来ると、彼は言った。「誰だ?ラタンか?」その者はすぐに馬から下りて彼にお辞儀をし、「はっ。王太子様、このような夜更けに、なぜこちらに?」と言った。

王太子は言った。「その理由は後で話す。今は、大おじ様がどこにおられるか言え」

「はっ、旅籠におられるはずですが」

「何だと?そこにはおられなかったぞ」

彼は驚いて言った。「三十人の従者とともに、マハラジャはジョソールへ向けて出発されました。私は所用で遅れ、今夜この旅籠で合流する予定でした」

「道はこれほどぬかるんでいるのだから、足跡が残っているはずだ。それを追って私は大おじ様を探しに行く。お前の馬を借りる。お前は徒歩で来い!」