1 রুদ্ধ প্রাসাদে রামচন্দ্রকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা

বসন্তরায় যখন অন্তঃপুরে ফিরিয়া আসিলেন, তাঁহাকে দেখিয়া বিভা একেবারে কাঁদিয়া উঠিল। বসন্তরায় আর অশ্রু-সম্বরণ করিতে পারিলেন না, তিনি উদয়াদিত্যের হাত ধরিয়া কহিলেন, “দাদা, তুমি ইহার একটা উপায় করিয়া দাও।” রামচন্দ্র রায় একেবারে অধীর হইয়া উঠিলেন। তখন উদয়াদিত্য তাঁহার তরবারি হস্তে লইলেন। কহিলেন, “এস, আমার সঙ্গে সঙ্গে এস।” সকলে সঙ্গে সঙ্গে চলিল। উদয়াদিত্য কহিলেন—“বিভা তুই এখানে থাক্‌, তুই আসিস্ নে।” বিভা শুনিল না। রামচন্দ্র রায়ও কহিলেন—“না, বিভা সঙ্গে সঙ্গেই আসুক।” সেই নিঃস্তব্ধ রাত্রে সকলে পা টিপিয়া চলিতে লাগিল। মনে হইতে লাগিল বিভীষিকা চারিদিক্ হইতে তাহার অদৃশ্য হস্ত প্রসারিত করিতেছে। রামচন্দ্র রায় সম্মুখে পশ্চাতে পার্শ্বে দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। মামার প্রতি মাঝে মাঝে সন্দেহ জন্মিতে লাগিল। অন্তঃপুর অতিক্রম করিয়া বহির্দ্দেশে যাইবার দ্বারে আসিয়া উদয়াদিত্য দেখিলেন দ্বার রুদ্ধ। বিভা ভয়কম্পিত রুদ্ধকণ্ঠে কহিল, “দাদা, নীচে যাইবার দরজা হয় ত বন্ধ করে নাই। সেইখানে চল!” সকলে সেই দিকে চলিল। দীর্ঘ অন্ধকার সিঁড়ি বাহিয়া নীচে চলিতে লাগিল। রামচন্দ্র রায়ের মনে হইল, এ সিঁড়ি দিয়া নামিলে বুঝি আর কেহ উঠে না—বুঝি বাসুকী-সাপের গর্ত্তটা এইখানে, পাতালে নামিবার সিঁড়ি এই। সিঁড়ি ফুরাইলে দ্বারের কাছে গিয়া দেখিলেন দ্বার বন্ধ। আবার সকলে ধীরে ধীরে উঠিল। অন্তঃপুর হইতে বাহির হইবার যতগুলি পথ আছে সমস্তই বন্ধ। সকলে মিলিয়া দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া বেড়াইল, প্রত্যেক দ্বারে ফিরিয়া ফিরিয়া দুই তিন বার করিয়া গেল। সকলগুলিই বন্ধ।

যখন বিভা দেখিল, বাহির হইবার কোন পথই নাই, তখন সে অশ্রু মুছিয়া ফেলিল। স্বামীর হাত ধরিয়া তাহার শয়নকক্ষে লইয়া গেল। দৃঢ় পদে দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া অকম্পিত স্বরে কহিল—“দেখিব, এ ঘর হইতে তোমাকে কে বাহির করিয়া লইতে পারে! তুমি যেখানে যাইবে, আমি তোমার আগে আগে যাইব, দেখিব আমাকে কে বাধা দেয়!” উদয়াদিত্য দ্বারের নিকট দাঁড়াইয়া কহিলেন, “আমাকে বধ না করিয়া কেহ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না।” সুরমা কিছু না বলিয়া স্বামীর পার্শ্বে গিয়া দাঁড়াইল। বৃদ্ধ বসন্তরায় সকলের আগে আসিয়া দাঁড়াইলেন। মামা ধীরে ধীরে চলিয়া গেলেন। কিন্তু রামচন্দ্র রায়ের এ বন্দোবস্ত কিছুতেই ভাল লাগিল না। তিনি ভাবিতেছেন, “প্রতাপাদিত্য যে রকম লোক দেখিতেছি তিনি কি না করিতে পারেন। বিভা ও উদয়াদিত্য মাঝে পড়িয়া কিছু করিতে পারিবেন, এমন ত ভরসা হয় না। এ বাড়ি হইতে কোন মতে বাহির হইতে পারিলেই বাঁচি।”

কিছুক্ষণ বাদে সুরমা উদয়াদিত্যকে মৃদুস্বরে কহিল, “আমাদের এখানে দাঁড়াইয়া থাকিলে যে কোন ফল হইবে তাহা ত বোধ হয় না; বরং উল্টা। পিতা যতই বাধা পাইবেন, ততই তাঁহার সংকল্প আরো দৃঢ় হইবে। আজ রাত্রেই কোন মতে প্রাসাদ হইতে পালাইবার উপায় কহিয়া দাও!”

উদয়াদিত্য চিন্তিতভাবে কিয়ৎক্ষণ সুরমার মুখের দিকে চাহিয়া কহিলেন “তবে আমি যাই, বলপ্রয়োগ করিয়া দেখিগে!”

সুরমা দৃঢ় ভাবে সম্মতি-সূচক ঘাড় নাড়িয়া কহিল—“যাও।”

উদয়াদিত্য তাঁহার উত্তরীয় বসন ফেলিয়া দিলেন—চলিলেন। সুরমা সঙ্গে সঙ্গে কিছু দূর গেল। নিভৃত স্থানে গিয়া সে উদয়াদিত্যের বক্ষ আলিঙ্গন করিয়া ধরিল। উদয়াদিত্য শির নত করিয়া তাহাকে একটি দীর্ঘ চুম্বন করিলেন; ও মুহূর্ত্তের মধ্যে চলিয়া গেলেন। তখন সুরমা তাহার শয়নকক্ষে আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহার দুই চোখ বহিয়া অশ্রু পড়িতে লাগিল। যোড় হস্তে কহিল—“মাগো—যদি আমি পতিব্রতা সতী হই, তবে এবার আমার স্বামীকে তাঁহার পিতার হাত হইতে রক্ষা কর। আমি যে তাঁহাকে আজ এই বিপদের মধ্যে বিদায় দিলাম, সে কেবল তোর ভরসাতেই মা! তুই যদি আমাকে বিনাশ করিস্, তবে পৃথিবীতে তোকে আর কেহ বিশ্বাস করিবে না।” বলিতে বলিতে কাঁদিয়া উঠিল। সুরমা সেই অন্ধকারে বসিয়া কতবার মনে মনে “মা” “মা” বলিয়া ডাকিল, কিন্তু মনে হইল যেন মা তাহার কথা শুনিতে পাইলেন না! মনে মনে তাঁহার পায়ে যে পুস্পাঞ্জলি দিল মনে হইল যেন, তিনি তাহা লইলেন না, তাঁহার পা হইতে পড়িয়া গেল। সুরমা কাঁদিয়া কহিল “কেন মা, আমি কি করিয়াছি?” তাহার উত্তর শুনিতে পাইল না। সে সেই চারিদিকের অন্ধকারের মধ্যে দেখিতে পাইল, প্রলয়ের মুর্ত্তি নাচিতেছে! সুরমা চারিদিক শূন্যময় দেখিতে লাগিল। সে একাকী সে ঘরে আর বসিয়া থাকিতে পারিল না। বাহির হইয়া বিভার ঘরে আসিল।

বসন্তরায় কাতর স্বরে কহিলেন—“দাদা এখনো ফিরিল না, কি হইবে?”

সুরমা দেয়ালে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, “বিধাতা যাহা করেন!”

রামচন্দ্র রায় তখন মনে মনে তাঁহার পুরাতন ভৃত্য রামমোহনের সর্ব্বনাশ করিতেছিলেন! কেন না, তাহা হইতেই এই সমস্ত বিপদ ঘটিল। তাহার যত প্রকার শাস্তি সম্ভব তাহার বিধান করিতেছিলেন। মাঝে মাঝে একবার চৈতন্য হইতেছে যে, শাস্তি দিবার বুঝি আর অবসর থাকিবে না।

2 রামমোহন মালের অটল আনুগত্য

উদয়াদিত্য তরবারি হস্তে অন্তঃপুর অতিক্রম করিয়া রুদ্ধদ্বারে গিয়া সবলে পদাঘাত করিলেন—কহিলেন, “কে আছিস্?”

বাহির হইতে উত্তর আসিল “আজ্ঞা, আমি সীতারাম!”

যুবরাজ দৃঢ় স্বরে কহিলেন—“শীঘ্র দ্বার খোল।”

সে অবিলম্বে দ্বার খুলিয়া দিল। উদয়াদিত্য চলিয়া যাইবার উপক্রম করিলে সে যোড়হস্তে কহিল,—“যুবরাজ মাপ করুন—আজ রাত্রে অন্তঃপুর হইতে কাহারো বাহির হইবার হুকুম নাই।”

যুবরাজ কহিলেন—“সীতারাম, তবে কি তুমিও আমার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিবে? আচ্ছা তবে এস।” বলিয়া অসি নিষ্কাশিত করিলেন।

সীতারাম যোড়হস্তে কহিল, “না যুবরাজ আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিতে পারিব না—আপনি দুইবার আমার প্রাণ রক্ষা করিয়াছেন।” বলিয়া তাঁহার পায়ের ধূলা মাথায় তুলিয়া লইল।

যুবরাজ কহিলেন, “তবে কি করিতে চাও, শীঘ্র কর—আর সময় নাই।”

সীতারাম কহিল—“যে প্রাণ আপনি দুইবার রক্ষা করিয়াছেন, এবার তাহাকে বিনাশ করিবেন না। আমাকে নিরস্ত্র করুন। এই লউন আমার অস্ত্র। আমাকে আপাদমস্তক বন্ধন করুন। নহিলে মহারাজের নিকট কাল আমার রক্ষা নাই।”

যুবরাজ তাহার অস্ত্র লইলেন, তাহার কাপড় দিয়া তাহাকে বাঁধিয়া ফেলিলেন। সে সেইখানে পড়িয়া রহিল, তিনি চলিয়া গেলেন। কিছু দূর গিয়া একটা অতি উচ্চ প্রাচীরের মত আছে। সে প্রাচীরের একটি মাত্র দ্বার, সে দ্বারও রুদ্ধ। সেই দ্বার অতিক্রম করিলেই একেবারে অন্তঃপুরের বাহিরে যাওয়া যায়। যুবরাজ দ্বারে আঘাত না করিয়া একেবারে প্রাচীরের উপর লাফ দিয়া উঠিলেন। দেখিলেন, একজন প্রহরী প্রাচীরে ঠেসান্ দিয়া দিব্য আরামে নিদ্রা যাইতেছে। অতি সাবধানে তিনি নামিয়া পড়িলেন। বিদ্যুদ্বেগে সেই নিদ্রিত প্রহরীর উপর গিয়া পড়িলেন। তাহার অস্ত্র কাড়িয়া দূরে ফেলিয়া দিলেন ও সেই হতবুদ্ধি অভিভূত প্রহরীকে আপাদমস্তক বাঁধিয়া ফেলিলেন। তাহার কাছে চাবি ছিল, সেই চাবি কাড়িয়া লইয়া দ্বার খুলিলেন। তখন প্রহরীর চৈতন্য হইল, বিস্মিত স্বরে কহিল—“যুবরাজ, করেন কি?”

যুবরাজ কহিলেন, “অন্তঃপুরের দ্বার খুলিতেছি।”

প্রহরী কহিল,—“কাল মহারাজের কাছে কি জবাব দিব?”

উদয়াদিত্য কহিলেন, “বলিস্, যুবরাজ বলপূর্ব্বক আমাদিগকে পরাভূত করিয়া অন্তঃপুরের দ্বার খুলিয়াছেন। তাহা হইলে খালাস পাইবি।”

উদয়াদিত্য অন্তঃপুর হইতে বাহির হইয়া যে ঘরে জামাতার লোক জন থাকে সেইখানে উপস্থিত হইলেন। সে ঘরে কেবল রামমোহন ও রমাই ভাঁড় ঘুমাইতেছিল, আর বাকি সকলে আহারাদি করিয়া নৌকায় গিয়াছে। যুবরাজ ধীরে ধীরে রামনোহনকে স্পর্শ করিলেন। সে চমকিয়া লাফাইয়া উঠিল। বিস্মিত হইয়া কহিল—“এ কি যুবরাজ?” যুবরাজ কহিলেন “বাহিরে এস।” রামমোহন বাহিরে আসিল। রামমোহনকে যুবরাজ সমস্ত কহিলেন।

তখন রামমোহন মাথায় চাদর বাঁধিয়া লাঠি বাগাইয়া ধরিল, ক্রোধে স্ফীত হইয়া কহিল, “দেখিব লছমন্ সর্দ্দার কত বড় লোক। যুবরাজ আমাদের মহারাজকে একবার কেবল আমার কাছে আনিয়া দিন। আমি একা এই লাঠি লইয়া একশ জন লোক ভাগাইতে পারি!”

যুবরাজ কহিলেন, “সে কথা আমি মানি, কিন্তু যশোহরের রাজপ্রাসাদে একশত অপেক্ষা অনেক অধিক লোক আছে! তুমি বলপূর্ব্বক কিছু করিতে পারিবে না। অন্য কোন উপায় দেখিতে হইবে।”

রামমোহন কহিল, “আচ্ছা, মহারাজকে একবার আমার কাছে আনুন, আমার পাশে তিনি দাঁড়াইলে আমি নিশ্চিন্ত হইয়া উপায় ভাবিতে পারি। তখন অন্তঃপুরে গিয়া উদয়াদিত্য রামচন্দ্রকে আহ্বান করিলেন। তিনি এবং তাহার সঙ্গে সকলেই আসিল।

রামচন্দ্র রামমোহনকে দেখিয়াই ক্রোধে অভিভূত হইয়া কহিলেন— “তোকে আমি এখনি ছড়াইয়া দিলাম—তুই দূর হইয়া যা’ তুই পুরানো লোক, তোকে আর অধিক কি শাস্তি দিব—যদি এ যাত্রা বাঁচিয়া যাই, তবে তোর মুখ আর আমি দেখিব না।” বলিতে বলিতে রামচন্দ্রের কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল। তিনি যথার্থ ই রামমোহনকে ভাল বাসিতেন, শিশুকাল হইতে রামমোহন তাঁহাকে পালন করিয়া আসিতেছে।

রামমোহন যোড় হাত করিয়া কহিল “তুমি আমাকে ছাড়াইবার কে মহারাজ? আমার এ চাকরি ভগবান্ দিয়াছেন। যে দিন যমের তলব পড়িবে, সে দিন ভগবান আমার এ চাকরি ছাড়াইবেন। তুমি আমাকে রাখ না রাখ আমি তোমার চাকর।” বলিয়া সে রামচন্দ্রকে আগলাইয়া দাঁড়াইল।

3 ছাদ থেকে রামচন্দ্রকে নিয়ে রামমোহনের অবতরণ

উদয়াদিত্য কহিলেন—“রামমোহন, কি উপায় করিলে?” রামমোহন কহিল, “আপনার শ্রীচরণাশীর্বাদে এই লাঠিই উপায়। আর মা কালীর চরণ ভরসা।”

উদয়াদিত্য ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন—“ও উপায় কোন কাজের নয়। আচ্ছ, রামমোহন তোমাদের নৌকা কোন্ দিকে আছে?”

রামমোহন কহিল, “রাজবাটির দক্ষিণ পার্শ্বের খালে।”

উদয়াদিত্য কহিলেন, “চল একবার ছাদে যাই।”

রামমোহনের মাথায় হঠাৎ একটা উপায় উদ্ভাবিত হইল—সে কহিল, “হাঁ, ঠিক কথা, সেই খানে চলুন।”

সকলে প্রাসাদের ছাদে উঠিলেন। ছাদ হইতে প্রায় ৭০ হাত নীচে খাল। সেই খালে রামচন্দ্রের চৌষট্টি দাঁড়ের নৌকা ভাসিতেছে। রামমোহন কহিল, রামচন্দ্র রায়কে পিঠে বাঁধিয়া লইয়া সে সেই খানে ঝাঁপাইয়া পড়িবে।

বসন্তরায় তাড়াতাড়ি শশব্যস্ত হইয়া রামমোহনকে ধরিয়া বলিয়া উঠিলেন—“না, না, না, সে কি হয়? রামমোহন তুমি অমন অসম্ভব কাজ করিতে যাইও না।”

বিভা চমকিয়া সত্রাসে বলিয়া উঠিল—“না, মোহন, তুই ও কি বলিতেছিস্।” রাম চন্দ্র বলিলেন—“না রামমোহন, তাহা হইবে না।”

তখন উদয়াদিত্য অন্তঃপুরে গিয়া কতকগুলা খুব মোটা বৃহৎ চাদর সংগ্রহ করিয়া আনিলেন। রামমোহন সে গুলি পাকাইয়া বাঁধিয়া বাঁধিয়া একটা প্রকাণ্ড রজ্জুর মত প্রস্তুত করিল। যে দিকে নৌকা ছিল, সেই দিককার ছাদের উপরের একটি ক্ষুদ্র স্তম্ভের সহিত রজ্জু বাঁধিল। রজ্জু নৌকার কিঞ্চিৎ ঊর্দ্ধে গিয়া শেষ হইল। রামমোহন রামচন্দ্র রায়কে কহিল, “মহারাজ, আপনি আমার পিঠ জড়াইয়া ধরিবেন, আমি রজ্জু বাহিয়া নামিয়া পড়িব।” রামচন্দ্র তাহাতে অগত্যা সম্মত হইলেন। তখন রামমোহন সকলকে একে একে প্রণাম করিল, ও সকলের পদধূলি লইল, কহিল “জয় মা কালী।” রামচন্দ্রকে পিঠে তুলিয়া লইল, রামচন্দ্র চোখ বুঁঝিয়া প্রাণপণে তাহার পিঠ আঁকড়িয়া ধরিলেন। বিভার দিকে চাহিয়া রামমোহন কহিল “মা, তবে আমি চলিলাম। তোমার সন্তান থাকিতে কোন ভয় করিও না!”

4 রামমোহনের সাহায্যে রামচন্দ্রের পলায়ন

রামমোহন রজ্জু আঁকড়িয়া ধরিল। বিভা স্তম্ভে ভর দিয়া প্রাণপণে দাঁড়াইয়া রহিল। বৃদ্ধ বসন্তরায় কম্পিত চরণে দাঁড়াইয়া চোখ বুঁজিয়া “দুর্গা” “দুর্গা” জপিতে লাগিলেন। রামমোহন রজ্জু বাহিয়া নামিয়া রজ্জুর শেষ প্রান্তে গেল। তখন সে হাত ছাড়িয়া দাঁত দিয়া রজ্জু কামড়াইয়া ধরিল, ও রামচন্দ্রকে পৃষ্ঠ হইতে ছাড়াইয়া দুই হস্তে ঝুলাইয়া অতি সাবধানে নৌকায় নামাইয়া দিল, ও নিজেও লাফাইয়া পড়িল। রামচন্দ্র যেমন নৌকায় নামিলেন অমনি মূর্চ্ছিত হইলেন। রামচন্দ্র যেমন নৌকায় নামিলেন, অমনি বিভা গভীর ও সুদীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলিয়া মূর্চ্ছিত হইয়া পড়িল। বসন্তরায় চোখ মেলিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“দাদা কি হইল?” উদয়াদিত্য মূর্চ্ছিতা বিভাকে সস্নেহে কোলে করিয়া অন্তঃপুরে চলিয়া গেলেন। সুরমা উদয়াদিত্যের হাত ধরিয়া কহিল, “এখন তোমার কি হইবে?” উদয়াদিত্য কহিলেন, “আমার জন্য আমি ভাবি না।”

এদিকে নৌকা খানিক দূর গিয়া আটক পড়িল। বড় বড় শাল কাঠে খাল বন্ধ! এমন সময়ে সহসা প্রহরীরা দূর হইতে দেখিল, নৌকা পালাইয়া যায়। পাথর ছুঁড়িতে আরম্ভ করিল, একটাও গিয়া পৌঁছিল না। প্রহরীদের হাতে তলোয়ার ছিল, বন্দুক ছিল না। একজন বন্দুক আনিতে গেল। খোঁজ খোঁজ করিয়া বন্দুক জুটিল ত চকমকি জুটিল না —“ওরে বারুদ কোথায়—গুলি কোথায়” করিতে করিতে রামমোহন ও অনুচরগণ কাঠের উপর দিয়া নৌকা টানিয়া তুলিয়া লইয়া গেল। প্রহরিগণ অনুসরণ করিবার জন্য একটা নৌকা ডাকিতে গেল। যাহার উপরে নৌকা ডাকিবার ভার পড়িল, পথের মধ্যে সে হরিমুদীর দোকানে এক ছিলিম তামাক খাইয়া লইল ও রামশঙ্করকে তাহার বিছানা হইতে উঠাইয়া তাহার পাওনা টাকা শীঘ্র পাইবার জন্য তাগাদা করিয়া গেল। যখন নৌকার প্রয়োজন একেবারে ফুরাইল তখন হাঁক ডাক করিতে করিতে নৌকা আসিল। বিলম্ব দেখিয়া সকলে নৌকা-আহ্বানকারীকে সুদীর্ঘ ভর্ৎসনা করিতে আরম্ভ করিল। সে কহিল, “আমি ত আর ঘোড়া নই!” একে একে সকলের যখন ভর্ৎসনা করা ফুরাইল, তখন তাহাদের চৈতন্য হইল যে, নৌকা ধরিবার আর কোন সম্ভাবনা নাই। নৌকা আনিতে যে বিলম্ব হইয়াছিল ভর্ৎসনা করিতে তাহার তিন গুণ বিলম্ব হইল। যখন রামচন্দ্রের নৌকা ভৈরব নদে গিয়া পৌঁছিল তখন ফর্ণাণ্ডিজ এক তোপের আওয়াজ করিল। প্রত্যুষে প্রতাপাদিত্যের নিদ্রাকর্ষণ হইয়াছিল। সেই তোপের শব্দে সহসা ঘুম ভাঙিয়া গেল। তিনি ডাকিয়া উঠিলেন “প্রহরি!” কেহই আসিল না। দ্বারের প্রহরিগণ সেই রাত্রেই পালাইয়া গেছে। প্রতাপাদিত্য উচ্চতর স্বরে ডাকিলেন—“প্রহরি!”

1 রুদ্ধ প্রাসাদে রামচন্দ্রকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা

বসন্ত রায় যখন অন্দরমহলে ফিরে এলেন, তাঁকে দেখে বিভা একেবারে কেঁদে ফেলল। বসন্ত রায় আর চোখের জল আটকাতে পারলেন না, তিনি উদয়াদিত্যের হাত ধরে বললেন, “দাদা, তুমি এর একটা উপায় করে দাও।” রামচন্দ্র রায় একেবারে অধীর হয়ে উঠলেন। তখন উদয়াদিত্য তাঁর তলোয়ার হাতে নিলেন। বললেন, “এসো, আমার সঙ্গে সঙ্গে এসো।” সবাই তাঁর সঙ্গে চলল। উদয়াদিত্য বললেন—“বিভা তুই এখানে থাক, তুই আসিস না।” বিভা শুনল না। রামচন্দ্র রায়ও বললেন—“না, বিভা সঙ্গেই আসুক।” সেই নিস্তব্ধ রাতে সবাই পা টিপে টিপে চলতে লাগল। মনে হতে লাগল, যেন বিভীষিকা চারদিক থেকে তার অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। রামচন্দ্র রায় সামনে, পেছনে, পাশে তাকাতে লাগলেন। মামার (বসন্ত রায়ের) প্রতি মাঝে মাঝে তাঁর সন্দেহ হচ্ছিল। অন্দরমহল পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার দরজার কাছে এসে উদয়াদিত্য দেখলেন দরজা বন্ধ। বিভা ভয়ে কাঁপা কাঁপা রুদ্ধ গলায় বলল, “দাদা, নীচে যাওয়ার দরজা হয়তো বন্ধ করেনি। চলো সেখানে যাই!” সবাই সেদিকে চলল। দীর্ঘ অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগল। রামচন্দ্র রায়ের মনে হল, এই সিঁড়ি দিয়ে নামলে বোধহয় আর কেউ ফেরে না—যেন এখানেই বাসুকি নাগের গর্ত, এটাই পাতালে নামার সিঁড়ি। সিঁড়ি শেষ হলে দরজার কাছে গিয়ে দেখলেন সেটাও বন্ধ। আবার সবাই ধীরে ধীরে ওপরে উঠল। অন্দরমহল থেকে বেরোনোর যতগুলো পথ আছে, সবই বন্ধ। সবাই মিলে দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াল, প্রত্যেক দরজায় বারবার করে দু-তিনবার গেল। সবগুলোই বন্ধ।

যখন বিভা দেখল, বাইরে বেরোনোর কোনো পথই নেই, তখন সে চোখের জল মুছে ফেলল। স্বামীর হাত ধরে তাঁকে শোবার ঘরে নিয়ে গেল। দৃঢ় পায়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অকম্পিত স্বরে বলল—“দেখব, এই ঘর থেকে তোমাকে কে বের করে নিয়ে যেতে পারে! তুমি যেখানে যাবে, আমি তোমার আগে আগে যাব, দেখব আমাকে কে বাধা দেয়!” উদয়াদিত্য দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমাকে বধ না করে কেউ ঘরের মধ্যে ঢুকতে পারবে না।” সুরমা কিছু না বলে স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বৃদ্ধ বসন্ত রায় সবার আগে এসে দাঁড়ালেন। মামা (রমাপতি) ধীরে ধীরে চলে গেলেন। কিন্তু রামচন্দ্র রায়ের এই ব্যবস্থা কিছুতেই ভালো লাগল না। তিনি ভাবতে লাগলেন, “প্রতাপাদিত্য যে রকম লোক দেখছি, তিনি কী না করতে পারেন! বিভা ও উদয়াদিত্য মাঝে পড়ে কিছু করতে পারবে, এমন তো ভরসা হয় না। এই বাড়ি থেকে কোনোভাবে বেরোতে পারলেই বাঁচি।”

কিছুক্ষণ পর সুরমা উদয়াদিত্যকে মৃদুস্বরে বলল, “আমাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে যে কোনো ফল হবে তা তো মনে হয় না; বরং উল্টোটাই হবে। বাবা যত বাধা পাবেন, তাঁর সংকল্প ততই আরও দৃঢ় হবে। আজ রাতেই কোনোভাবে প্রাসাদ থেকে পালানোর উপায় করে দাও!”

উদয়াদিত্য চিন্তিতভাবে কিছুক্ষণ সুরমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “তবে আমি যাই, বলপ্রয়োগ করে দেখি!”

সুরমা দৃঢ়ভাবে সম্মতি জানিয়ে ঘাড় নেড়ে বলল—“যাও।”

উদয়াদিত্য তাঁর চাদর ফেলে দিলেন—এবং চললেন। সুরমা সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা গেল। নির্জন জায়গায় গিয়ে সে উদয়াদিত্যের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। উদয়াদিত্য মাথা নিচু করে তাকে একটি দীর্ঘ চুম্বন করলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে চলে গেলেন। তখন সুরমা তার শোবার ঘরে এসে উপস্থিত হল। তার দুই চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। জোড়হাতে বলল—“মা গো—যদি আমি পতিব্রতা সতী হই, তবে এবার আমার স্বামীকে তাঁর বাবার হাত থেকে রক্ষা কোরো। আমি যে তাঁকে আজ এই বিপদের মধ্যে বিদায় দিলাম, সে কেবল তোমার ভরসাতেই মা! তুমি যদি আমাকে বিনাশ করো, তবে পৃথিবীতে তোমাকে আর কেউ বিশ্বাস করবে না।” বলতে বলতে কেঁদে ফেলল। সুরমা সেই অন্ধকারে বসে কতবার মনে মনে “মা” “মা” বলে ডাকল, কিন্তু মনে হল যেন মা তার কথা শুনতে পাচ্ছেন না! মনে মনে তাঁর পায়ে যে পুষ্পাঞ্জলি দিল, মনে হল যেন তিনি তা নিলেন না, তাঁর পা থেকে পড়ে গেল। সুরমা কেঁদে বলল, “কেন মা, আমি কী করেছি?” তার উত্তর শুনতে পেল না। সে সেই চারদিকের অন্ধকারের মধ্যে দেখতে পেল, প্রলয়ের মূর্তি নাচছে! সুরমার চারিদিক শূন্য মনে হতে লাগল। সে একা সেই ঘরে আর বসে থাকতে পারল না। বেরিয়ে বিভার ঘরে এল।

বসন্ত রায় কাতর স্বরে বললেন—“দাদা এখনও ফিরল না, কী হবে?”

সুরমা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “বিধাতা যা করেন!”

রামচন্দ্র রায় তখন মনে মনে তাঁর পুরোনো ভৃত্য রামমোহনের সর্বনাশ করছিলেন! কারণ, তার জন্যই এই সমস্ত বিপদ ঘটল। তার যত রকম শাস্তি সম্ভব, তার বিধান দিচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে একবার চৈতন্য ফিরছিল যে, শাস্তি দেওয়ার বোধহয় আর সুযোগ থাকবে না।

2 রামমোহন মালের অটল আনুগত্য

উদয়াদিত্য তলোয়ার হাতে অন্তঃপুর পার হয়ে বন্ধ দরজায় গিয়ে জোরে লাথি মারলেন এবং বললেন, “কে আছিস?”

বাইরে থেকে উত্তর এলো, “আজ্ঞা, আমি সীতারাম!”

যুবরাজ কঠোর স্বরে বললেন, “শীঘ্র দরজা খোল।”

সে সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দিল। উদয়াদিত্য চলে যেতে উদ্যত হলে সে হাতজোড় করে বলল, “যুবরাজ, ক্ষমা করুন—আজ রাতে অন্তঃপুর থেকে কারও বাইরে যাওয়ার হুকুম নেই।”

যুবরাজ বললেন, “সীতারাম, তাহলে কি তুমিও আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে? বেশ, তাহলে এসো।” বলে তিনি তলোয়ার বের করলেন।

সীতারাম হাতজোড় করে বলল, “না যুবরাজ, আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে পারব না—আপনি দুবার আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন।” বলে সে তাঁর পায়ের ধুলো মাথায় তুলে নিল।

যুবরাজ বললেন, “তাহলে কী করতে চাও, তাড়াতাড়ি করো—আর সময় নেই।”

সীতারাম বলল, “যে প্রাণ আপনি দুবার বাঁচিয়েছেন, এবার তা বিনাশ করবেন না। আমাকে নিরস্ত্র করুন। এই নিন আমার অস্ত্র। আমাকে আপাদমস্তক বেঁধে ফেলুন। নইলে কাল মহারাজের কাছে আমার রক্ষা নেই।”

যুবরাজ তার অস্ত্র নিলেন এবং তার কাপড় দিয়েই তাকে বেঁধে ফেললেন। সে সেখানেই পড়ে রইল, আর তিনি চলে গেলেন। কিছু দূর গিয়ে একটা খুব উঁচু পাঁচিলের মতো আছে। সেই পাঁচিলের একটাই দরজা, সেটাও বন্ধ। ওই দরজা পার হতে পারলেই একেবারে অন্তঃপুরের বাইরে যাওয়া যায়। যুবরাজ দরজায় আঘাত না করে এক লাফে পাঁচিলের উপর উঠে পড়লেন। দেখলেন, একজন প্রহরী পাঁচিলে হেলান দিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে। খুব সাবধানে তিনি নেমে পড়লেন এবং বিদ্যুতের গতিতে সেই ঘুমন্ত প্রহরীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার অস্ত্র কেড়ে নিয়ে দূরে ফেলে দিলেন এবং সেই হতবুদ্ধি, অভিভূত প্রহরীকে আপাদমস্তক বেঁধে ফেললেন। তার কাছে চাবি ছিল, সেই চাবি কেড়ে নিয়ে দরজা খুললেন। তখন প্রহরীর জ্ঞান ফিরল এবং সে অবাক হয়ে বলল, “যুবরাজ, কী করছেন?”

যুবরাজ বললেন, “অন্তঃপুরের দরজা খুলছি।”

প্রহরী বলল, “কাল মহারাজের কাছে কী জবাব দেব?”

উদয়াদিত্য বললেন, “বলবি, যুবরাজ জোর করে আমাদের হারিয়ে দিয়ে অন্তঃপুরের দরজা খুলেছেন। তাহলে ছাড়া পেয়ে যাবি।”

উদয়াদিত্য অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে জামাইয়ের লোকজন যে ঘরে থাকে, সেখানে পৌঁছলেন। সেই ঘরে তখন কেবল রামমোহন মাল ও রমাই ভাঁড় ঘুমাচ্ছিল, বাকি সবাই খাওয়া-দাওয়া করে নৌকায় চলে গেছে। যুবরাজ ধীরে ধীরে রামমোহনকে স্পর্শ করলেন। সে চমকে লাফিয়ে উঠল। অবাক হয়ে বলল, “এ কী! যুবরাজ?” যুবরাজ বললেন, “বাইরে এসো।” রামমোহন বাইরে এলে যুবরাজ তাকে সবটা বললেন।

তখন রামমোহন মাথায় চাদর বেঁধে, লাঠি বাগিয়ে ধরে, রাগে ফুলে উঠে বলল, “দেখব লক্ষ্মণ সর্দার কত বড় লোক! যুবরাজ, আমাদের মহারাজকে শুধু একবার আমার কাছে এনে দিন। আমি একাই এই লাঠি দিয়ে একশো লোককে তাড়িয়ে দিতে পারি!”

যুবরাজ বললেন, “সে কথা আমি মানি, কিন্তু যশোরের রাজপ্রাসাদে একশোর চেয়ে অনেক বেশি লোক আছে! তুমি জোর করে কিছু করতে পারবে না। অন্য কোনো উপায় দেখতে হবে।”

রামমোহন বলল, “আচ্ছা, মহারাজকে একবার আমার কাছে আনুন। তিনি আমার পাশে দাঁড়ালে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে উপায় ভাবতে পারব।” তখন উদয়াদিত্য অন্তঃপুরে গিয়ে রামচন্দ্রকে ডাকলেন। তিনি এবং তাঁর সঙ্গে সবাই এলেন।

রামচন্দ্র রায় রামমোহনকে দেখেই রাগে ফেটে পড়ে বললেন, “তোকে আমি এখনই বরখাস্ত করলাম—তুই দূর হয়ে যা! তুই পুরোনো লোক, তোকে আর বেশি কী শাস্তি দেব—যদি এই যাত্রায় বেঁচে যাই, তবে তোর মুখ আমি আর দেখব না।” বলতে বলতে রামচন্দ্র রায়ের গলা ধরে এলো। তিনি সত্যিই রামমোহনকে ভালোবাসতেন, কারণ ছোটবেলা থেকে রামমোহনই তাঁকে পালন করে এসেছে।

রামমোহন হাতজোড় করে বলল, “মহারাজ, আপনি আমাকে বরখাস্ত করার কে? আমার এই চাকরি ভগবান দিয়েছেন। যেদিন যমের তলব আসবে, সেদিনই ভগবান আমার এই চাকরি ছাড়াবেন। আপনি আমাকে রাখুন বা না রাখুন, আমি আপনারই চাকর।” বলে সে রামচন্দ্র রায়কে আড়াল করে দাঁড়াল।

3 ছাদ থেকে রামচন্দ্রকে নিয়ে রামমোহনের অবতরণ

উদয়াদিত্য বললেন, “রামমোহন, কী উপায় করলে?” রামমোহন বলল, “আপনার আশীর্বাদে এই লাঠিই উপায়। আর মা কালীর চরণই ভরসা।”

উদয়াদিত্য মাথা নেড়ে বললেন, “ও উপায় কোনো কাজের নয়। আচ্ছা, রামমোহন, তোমাদের নৌকা কোন দিকে আছে?”

রামমোহন বলল, “রাজবাড়ির দক্ষিণ দিকের খালে।”

উদয়াদিত্য বললেন, “চলো একবার ছাদে যাই।”

রামমোহনের মাথায় হঠাৎ একটা উপায় এল—সে বলল, “হ্যাঁ, ঠিক কথা, সেখানেই চলুন।”

সবাই প্রাসাদের ছাদে উঠলেন। ছাদ থেকে প্রায় সত্তর হাত নিচে খাল। সেই খালে রামচন্দ্রের চৌষট্টি দাঁড়ের নৌকা ভাসছে। রামমোহন বলল, রামচন্দ্র রায়কে পিঠে বেঁধে নিয়ে সে সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

বসন্ত রায় তাড়াহুড়ো করে ব্যস্ত হয়ে রামমোহনকে ধরে বলে উঠলেন, “না, না, না, সে কি হয়? রামমোহন, তুমি অমন অসম্ভব কাজ করতে যেও না।”

বিভা চমকে উঠে ভয়ে বলে উঠল, “না, মোহন, তুই এ কী বলছিস!” রামচন্দ্র বললেন, “না রামমোহন, তা হবে না।”

তখন উদয়াদিত্য অন্তঃপুরে গিয়ে কয়েকটা খুব মোটা ও বড়ো চাদর সংগ্রহ করে আনলেন। রামমোহন সেগুলো পেঁচিয়ে আর বেঁধে একটা বিরাট দড়ির মতো তৈরি করল। যেদিকে নৌকা ছিল, সেদিকের ছাদের উপরের একটা ছোট স্তম্ভের সঙ্গে দড়িটা বাঁধল। দড়িটা নৌকার কিছুটা উপরে গিয়ে শেষ হল। রামমোহন রামচন্দ্র রায়কে বলল, “মহারাজ, আপনি আমার পিঠ জড়িয়ে ধরবেন, আমি দড়ি বেয়ে নেমে যাব।” রামচন্দ্র বাধ্য হয়ে রাজি হলেন। তখন রামমোহন সবাইকে একে একে প্রণাম করল ও সকলের পায়ের ধুলো নিল, বলল “জয় মা কালী।” সে রামচন্দ্রকে পিঠে তুলে নিল, রামচন্দ্র চোখ বুজে প্রাণপণে তার পিঠ আঁকড়ে ধরলেন। বিভার দিকে চেয়ে রামমোহন বলল, “মা, তবে আমি চললাম। তোমার সন্তান থাকতে কোনো ভয় কোরো না!”

4 রামমোহনের সাহায্যে রামচন্দ্রের পলায়ন

রামমোহন দড়িটা শক্ত করে ধরল। বিভা একটা থামে ভর দিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে রইল। বৃদ্ধ বসন্ত রায় কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ‘দুর্গা, দুর্গা’ জপ করতে লাগলেন। রামমোহন দড়ি বেয়ে নেমে দড়ির শেষ প্রান্তে পৌঁছল। তারপর সে হাত ছেড়ে দিয়ে দাঁত দিয়ে দড়িটা কামড়ে ধরল এবং রামচন্দ্রকে পিঠ থেকে নামিয়ে দুই হাতে ঝুলিয়ে খুব সাবধানে নৌকায় নামিয়ে দিল, আর নিজেও লাফিয়ে পড়ল। রামচন্দ্র নৌকায় নামতেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন। রামচন্দ্র নৌকায় নামার সাথে সাথেই বিভা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। বসন্ত রায় চোখ খুলে জিজ্ঞাসা করলেন, “দাদা, কী হল?” উদয়াদিত্য অজ্ঞান বিভাকে স্নেহের সাথে কোলে তুলে নিয়ে অন্তঃপুরের দিকে চলে গেলেন। সুরমা উদয়াদিত্যের হাত ধরে বলল, “এখন তোমার কী হবে?” উদয়াদিত্য বললেন, “আমি নিজের জন্য ভাবি না।”

এদিকে নৌকা কিছুটা দূর গিয়ে আটকে গেল। বড় বড় শাল কাঠের গুঁড়ি দিয়ে খাল বন্ধ করা! এমন সময় প্রহরীরা দূর থেকে হঠাৎ দেখতে পেল যে, নৌকা পালিয়ে যাচ্ছে। তারা পাথর ছুঁড়তে শুরু করল, কিন্তু একটাও গিয়ে পৌঁছল না। প্রহরীদের হাতে তলোয়ার ছিল, বন্দুক ছিল না। একজন বন্দুক আনতে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বন্দুক মিললেও চকমকি পাওয়া গেল না। তারা যখন ‘বারুদ কোথায়? গুলি কোথায়?’ বলে চেঁচামেচি করছে, তার মধ্যেই রামমোহন ও তাঁর সঙ্গীরা কাঠের গুঁড়ির ওপর দিয়ে নৌকা টেনে তুলে নিয়ে গেল। প্রহরীরা তাদের ধরার জন্য একটা নৌকা ডাকতে গেল। যার উপর নৌকা ডাকার দায়িত্ব পড়েছিল, সে পথে হরিমুদীর দোকানে বসে এক ছিলিম তামাক খেয়ে নিল এবং রামশঙ্করকে তার বিছানা থেকে তুলে নিজের পাওনা টাকা তাড়াতাড়ি দেওয়ার জন্য তাগাদা দিয়ে গেল। যখন নৌকার প্রয়োজন পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল, তখন হাঁকডাক করতে করতে নৌকা এসে হাজির হল। দেরি দেখে সবাই মিলে নৌকা আনতে যাওয়া লোকটিকে দীর্ঘক্ষণ ধরে বকাবকি করতে লাগল। সে বলল, “আমি তো আর ঘোড়া নই!” একে একে সবার বকাবকি যখন শেষ হল, তখন তাদের জ্ঞান ফিরল যে, পালিয়ে যাওয়া নৌকাটিকে ধরার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। নৌকা আনতে যতটা দেরি হয়েছিল, বকাবকি করতে তার তিনগুণ সময় লাগল। যখন রামচন্দ্রের নৌকা ভৈরব নদে গিয়ে পৌঁছল, তখন ফর্ণাণ্ডিজ একটি কামানের গোলা ছুঁড়ল। ভোরের দিকে প্রতাপাদিত্যের সবে ঘুম এসেছিল। সেই কামানের শব্দে হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি চিৎকার করে ডাকলেন, “প্রহরী!” কেউ এল না। দরজার প্রহরীরা সেই রাতেই পালিয়ে গেছে। প্রতাপাদিত্য আরও জোরে চিৎকার করে ডাকলেন, “প্রহরী!”

1 बंद महल में रामचंद्र को लेकर भागने का प्रयास

जब बसंत राय अंतःपुर में लौटकर आए, तो उन्हें देखकर विभा एकदम रो पड़ी। बसंत राय भी आँसू नहीं रोक पाए, उन्होंने उदयादित्य का हाथ पकड़कर कहा, "दादा, तुम इसका कोई उपाय करो।" रामचंद्र राय एकदम अधीर हो उठे। तब उदयादित्य ने अपनी तलवार हाथ में ली। कहा, "आओ, मेरे साथ आओ।" सब साथ-साथ चले। उदयादित्य ने कहा—"विभा, तुम यहीं रहो, तुम मत आना।" विभा ने नहीं सुना। रामचंद्र राय ने भी कहा—"नहीं, विभा को साथ ही आने दो।" उस निस्तब्ध रात्रि में सब दबे पाँव चलने लगे। ऐसा लगने लगा मानो कोई विभीषिका चारों ओर से अपने अदृश्य हाथ फैला रही हो। रामचंद्र राय आगे, पीछे और बगल में देखने लगे। मामा (रमापति) के प्रति बीच-बीच में संदेह उत्पन्न होने लगा। अंतःपुर पार करके बाहर जाने वाले द्वार पर आकर उदयादित्य ने देखा कि दरवाज़ा बंद है। विभा ने भय से कांपते हुए रुंधे गले से कहा, "दादा, नीचे जाने का दरवाज़ा शायद बंद नहीं किया होगा। वहीं चलिए!" सब उस ओर चले। लंबी, अंधेरी सीढ़ियों से नीचे उतरने लगे। रामचंद्र राय को लगा कि इन सीढ़ियों से उतरने पर शायद कोई वापस नहीं चढ़ता—शायद वासुकी-नाग का बिल यहीं है, पाताल में उतरने की सीढ़ी यही है। सीढ़ियाँ खत्म होने पर दरवाज़े के पास जाकर देखा कि दरवाज़ा बंद है। फिर सब धीरे-धीरे ऊपर चढ़ गए। अंतःपुर से बाहर निकलने के जितने भी रास्ते थे, सभी बंद थे। सब मिलकर दरवाज़े-दरवाज़े घूमते रहे, हर दरवाज़े पर लौट-लौटकर दो-तीन बार गए। सभी बंद थे।

जब विभा ने देखा कि बाहर निकलने का कोई रास्ता नहीं है, तब उसने आँसू पोंछ डाले। पति का हाथ पकड़कर वह उसे अपने शयनकक्ष में ले गई। दृढ़ कदमों से दरवाज़े के पास खड़ी होकर उसने अडिग स्वर में कहा—"देखूँगी, इस कमरे से तुम्हें कौन निकालकर ले जा सकता है! तुम जहाँ जाओगे, मैं तुम्हारे आगे-आगे जाऊँगी, देखूँगी मुझे कौन रोकता है!" उदयादित्य दरवाज़े के पास खड़े होकर बोले, "मुझे मारे बिना कोई कमरे के अंदर प्रवेश नहीं कर पाएगा।" सुरमा कुछ न कहकर पति के बगल में जाकर खड़ी हो गई। वृद्ध बसंत राय सबसे आगे आकर खड़े हो गए। मामा धीरे-धीरे चले गए। लेकिन रामचंद्र राय को यह व्यवस्था बिल्कुल अच्छी नहीं लगी। वह सोच रहे थे, "प्रतापादित्य जैसे व्यक्ति हैं, वह क्या नहीं कर सकते। विभा और उदयादित्य बीच में पड़कर कुछ कर पाएँगे, ऐसा तो भरोसा नहीं होता। इस घर से किसी तरह बाहर निकल पाऊँ तो ही जान बचेगी।"

कुछ देर बाद सुरमा ने उदयादित्य से धीमे स्वर में कहा, "हमारे यहाँ खड़े रहने से कोई लाभ होगा, ऐसा तो नहीं लगता; बल्कि उल्टा होगा। पिताजी को जितनी बाधा मिलेगी, उनका संकल्प उतना ही दृढ़ होता जाएगा। आज रात ही किसी तरह महल से भागने का उपाय बताइए!"

उदयादित्य ने चिंतित भाव से कुछ देर सुरमा के चेहरे की ओर देखकर कहा, "तो फिर मैं जाता हूँ, बल प्रयोग करके देखता हूँ!"

सुरमा ने दृढ़ता से सहमति में सिर हिलाकर कहा—"जाइए।"

उदयादित्य ने अपना उत्तरीय वस्त्र फेंक दिया—और चल पड़े। सुरमा कुछ दूर तक उनके साथ गई। एकांत स्थान पर जाकर उसने उदयादित्य का वक्ष आलिंगन कर लिया। उदयादित्य ने सिर झुकाकर उसे एक लंबा चुंबन दिया; और पल भर में चले गए। तब सुरमा अपने शयनकक्ष में आकर उपस्थित हुई। उसकी दोनों आँखों से आँसू बहने लगे। हाथ जोड़कर उसने कहा—"माँ—यदि मैं पतिव्रता सती हूँ, तो इस बार मेरे पति को उनके पिता के हाथों से बचाओ। मैंने जो उन्हें आज इस विपत्ति में विदा किया है, वह केवल तुम्हारे ही भरोसे पर माँ! यदि तूने मुझे नष्ट कर दिया, तो पृथ्वी पर तुझ पर और कोई विश्वास नहीं करेगा।" कहते-कहते वह रो पड़ी। सुरमा उस अंधकार में बैठी न जाने कितनी बार मन-ही-मन "माँ", "माँ" कहकर पुकारती रही, लेकिन ऐसा लगा मानो माँ उसकी बात सुन नहीं रही हों! उसने मन-ही-मन उनके चरणों में जो पुष्पांजलि अर्पित की, ऐसा लगा मानो उन्होंने उसे स्वीकार नहीं किया, वह उनके पैरों से गिर गई। सुरमा ने रोकर कहा, "क्यों माँ, मैंने क्या किया है?" उसे कोई उत्तर नहीं मिला। उसे उस चारों ओर के अंधकार में प्रलय की मूर्ति नाचती हुई दिखाई दी! सुरमा को चारों ओर सब कुछ शून्य लगने लगा। वह उस कमरे में अकेली और नहीं बैठ सकी। वह बाहर निकलकर विभा के कमरे में आ गई।

बसंत राय ने व्याकुल स्वर में कहा—"दादा अभी तक नहीं लौटे, क्या होगा?"

सुरमा दीवार से टिककर खड़ी हो गई और बोली, "विधाता जो करें!"

रामचंद्र राय तब मन-ही-मन अपने पुराने सेवक राममोहन का सर्वनाश कर रहे थे! क्योंकि उसी के कारण यह सारी विपत्ति आई थी। वह उसके लिए हर संभव सज़ा तय कर रहे थे। बीच-बीच में उन्हें यह भी चेतना हो रही थी कि सज़ा देने का शायद और अवसर ही न मिले।

2 राममोहन माल की अटूट निष्ठा

उदयादित्य तलवार हाथ में लिए अन्तःपुर पार करके बंद द्वार पर पहुँचे और ज़ोर से लात मारी—कहा, “कौन है?”

बाहर से उत्तर आया, “आज्ञा, मैं सीताराम हूँ!”

युवराज ने दृढ़ स्वर में कहा—“शीघ्र द्वार खोलो।”

उसने तुरंत द्वार खोल दिया। उदयादित्य ने जैसे ही जाने का उपक्रम किया, उसने हाथ जोड़कर कहा,—“युवराज, क्षमा करें—आज रात अन्तःपुर से किसी के भी बाहर जाने का हुक्म नहीं है।”

युवराज ने कहा—“सीताराम, तो क्या तुम भी मेरे विरुद्ध शस्त्र उठाओगे? अच्छा, तो आओ।” यह कहकर उन्होंने तलवार खींच ली।

सीताराम ने हाथ जोड़कर कहा, “नहीं युवराज, मैं आपके विरुद्ध शस्त्र नहीं उठा सकता—आपने दो बार मेरे प्राणों की रक्षा की है।” यह कहकर उसने उनके पैरों की धूल अपने माथे से लगा ली।

युवराज ने कहा, “तो क्या करना चाहते हो, शीघ्र करो—अब और समय नहीं है।”

सीताराम बोला—“जिन प्राणों की आपने दो बार रक्षा की है, इस बार उनका विनाश न करें। मुझे निःशस्त्र कर दीजिए। यह लीजिए मेरा अस्त्र। मुझे सिर से पाँव तक बाँध दीजिए। नहीं तो कल महाराज के सामने मेरे प्राण नहीं बचेंगे।”

युवराज ने उसका अस्त्र ले लिया और उसी के कपड़ों से उसे बाँध दिया। वह वहीं पड़ा रहा और वे चले गए। कुछ दूर जाकर एक बहुत ऊँची दीवार थी। उस दीवार का एक ही द्वार था, और वह भी बंद था। उस द्वार को पार करते ही अन्तःपुर से पूरी तरह बाहर निकला जा सकता था। युवराज ने द्वार पर आघात न करके सीधे दीवार के ऊपर छलाँग लगा दी। देखा, एक पहरेदार दीवार से टेक लगाकर बड़े आराम से सो रहा है। अत्यंत सावधानी से वह नीचे उतरे। बिजली की गति से उस सोते हुए पहरेदार पर जा कूदे। उसका अस्त्र छीनकर दूर फेंक दिया और उस हतबुद्धि, अभिभूत पहरेदार को सिर से पाँव तक बाँध दिया। उसके पास चाबी थी, वह चाबी छीनकर उन्होंने द्वार खोला। तब पहरेदार को चेतना आई, उसने विस्मित स्वर में कहा—“युवराज, यह क्या कर रहे हैं?”

युवराज ने कहा, “अन्तःपुर का द्वार खोल रहा हूँ।”

पहरेदार बोला,—“कल महाराज को क्या जवाब दूँगा?”

उदयादित्य ने कहा, “कह देना, युवराज ने बलपूर्वक हमें परास्त करके अन्तःपुर का द्वार खोला है। ऐसा कहने पर तुम बच जाओगे।”

उदयादित्य अन्तःपुर से बाहर निकलकर उस कमरे में पहुँचे जहाँ दामाद के लोग ठहरे हुए थे। उस कमरे में केवल राममोहन और रमाई भांड सो रहे थे, बाकी सब भोजन करके नाव पर जा चुके थे। युवराज ने धीरे-धीरे राममोहन को छुआ। वह चौंककर उछल पड़ा। चकित होकर बोला—“यह क्या, युवराज?” युवराज ने कहा, “बाहर आओ।” राममोहन बाहर आया। युवराज ने राममोहन को सब कुछ बता दिया।

तब राममोहन ने सिर पर चादर बाँधी और लाठी सँभाल ली, क्रोध से भरकर बोला, “देखूँगा लछमन सरदार कितना बड़ा आदमी है। युवराज, आप हमारे महाराज को बस एक बार मेरे पास ले आइए। मैं अकेला इस लाठी से सौ आदमियों को भगा सकता हूँ!”

युवराज ने कहा, “मैं तुम्हारी बात मानता हूँ, लेकिन यशोर के राजमहल में सौ से कहीं अधिक लोग हैं! तुम बलपूर्वक कुछ नहीं कर पाओगे। कोई और उपाय सोचना होगा।”

राममोहन ने कहा, “अच्छा, महाराज को एक बार मेरे पास ले आइए, जब वे मेरे पास खड़े होंगे तो मैं निश्चिंत होकर कोई उपाय सोच सकता हूँ।” तब उदयादित्य अन्तःपुर में जाकर रामचंद्र को बुला लाए। वे और उनके साथ सभी लोग आ गए।

रामचंद्र, राममोहन को देखते ही क्रोध से भर गए और बोले— “मैं तुझे अभी नौकरी से निकालता हूँ—दूर हो जा! तू पुराना आदमी है, तुझे और क्या सज़ा दूँ—अगर इस बार मैं बच गया, तो फिर कभी तेरा मुँह नहीं देखूँगा।” कहते-कहते रामचंद्र का गला भर आया। वह सचमुच राममोहन से बहुत स्नेह करते थे, बचपन से ही राममोहन ने उनका पालन-पोषण किया था।

राममोहन ने हाथ जोड़कर कहा, “महाराज, आप मुझे निकालने वाले कौन होते हैं? यह नौकरी मुझे भगवान ने दी है। जिस दिन यम का बुलावा आएगा, उसी दिन भगवान मुझसे यह नौकरी छुड़वाएँगे। आप मुझे रखें या न रखें, मैं तो आपका ही सेवक हूँ।” यह कहकर वह रामचंद्र के आगे ढाल बनकर खड़ा हो गया।

3 छत से रामचंद्र को लेकर राममोहन का उतरना

उदयादित्य ने कहा—"राममोहन, क्या उपाय किया जाए?" राममोहन ने कहा, "आपके श्रीचरणों के आशीर्वाद से यह लाठी ही उपाय है। और माँ काली के चरणों का भरोसा है।"

उदयादित्य ने सिर हिलाकर कहा—"यह उपाय किसी काम का नहीं है। अच्छा, राममोहन तुम्हारी नाव किस तरफ़ है?"

राममोहन ने कहा, "राजमहल के दक्षिण की ओर नहर में।"

उदयादित्य ने कहा, "चलो एक बार छत पर चलें।"

राममोहन के मन में अचानक एक उपाय सूझा—उसने कहा, "हाँ, ठीक कहा, वहीं चलिए।"

सभी महल की छत पर चढ़ गए। छत से लगभग सत्तर हाथ नीचे नहर थी। उस नहर में रामचंद्र की चौंसठ चप्पुओं वाली नाव तैर रही थी। राममोहन ने कहा कि वह रामचंद्र राय को अपनी पीठ पर बाँधकर वहीं कूद पड़ेगा।

बसंत राय ने हड़बड़ाकर जल्दी से राममोहन को पकड़कर कहा—"नहीं, नहीं, नहीं, ऐसा कैसे हो सकता है? राममोहन, तुम ऐसा असंभव काम करने मत जाओ।"

विभा चौंककर डर से बोल उठी—"नहीं, मोहन, तू यह क्या कह रहा है।" रामचंद्र ने कहा—"नहीं राममोहन, ऐसा नहीं होगा।"

तब उदयादित्य ने अंतःपुर में जाकर कई मोटी-बड़ी चादरें इकट्ठी करके ले आए। राममोहन ने उन्हें ऐंठकर और बाँध-बाँधकर एक विशाल रस्सी जैसी बना ली। जिस ओर नाव थी, उस ओर की छत के ऊपर एक छोटे खंभे से रस्सी बाँध दी। रस्सी नाव के थोड़ा ऊपर जाकर समाप्त हुई। राममोहन ने रामचंद्र राय से कहा, "महाराज, आप मेरी पीठ से लिपट जाइएगा, मैं रस्सी के सहारे नीचे उतर जाऊँगा।" रामचंद्र विवश होकर इसके लिए सहमत हो गए। तब राममोहन ने एक-एक करके सबको प्रणाम किया, और सबके चरणों की धूलि ली, और कहा "जय माँ काली।" उसने रामचंद्र को पीठ पर उठा लिया, रामचंद्र ने आँखें बंद करके पूरी शक्ति से उसकी पीठ पकड़ ली। विभा की ओर देखकर राममोहन ने कहा, "माँ, तो अब मैं चलता हूँ। आपके बेटे के रहते कोई डर नहीं!"

4 राममोहन की सहायता से रामचंद्र का पलायन

राममोहन ने रस्सी पकड़ ली। विभा खंभे के सहारे बड़ी मुश्किल से खड़ी रही। वृद्ध बसंत राय कांपते हुए पैरों पर खड़े होकर, आँखें बंद किए "दुर्गा", "दुर्गा" जपने लगे। राममोहन रस्सी के सहारे उतरकर उसके अंतिम छोर तक गया। तब उसने हाथों को छोड़कर दाँतों से रस्सी को पकड़ लिया, और रामचंद्र को अपनी पीठ से उतारकर दोनों हाथों से लटकाकर बड़ी सावधानी से नाव में उतारा, और खुद भी कूद पड़ा। रामचंद्र जैसे ही नाव में उतरे, वे मूर्च्छित हो गए। रामचंद्र के नाव में उतरते ही, विभा ने एक गहरी और लंबी साँस ली और मूर्च्छित होकर गिर पड़ी। बसंत राय ने आँखें खोलकर पूछा—"दादा, क्या हुआ?" उदयादित्य ने मूर्च्छित विभा को स्नेह से गोद में उठाकर अंतःपुर में चले गए। सुरमा ने उदयादित्य का हाथ पकड़कर कहा, "अब तुम्हारा क्या होगा?" उदयादित्य ने कहा, "मैं अपनी चिंता नहीं करता।"

उधर, नाव कुछ दूर जाकर अटक गई। बड़े-बड़े साल की लकड़ियों से नहर बंद थी! तभी अचानक पहरेदारों ने दूर से देखा कि नाव भाग रही है। उन्होंने पत्थर फेंकना शुरू किया, लेकिन एक भी नहीं पहुँचा। पहरेदारों के हाथों में तलवारें थीं, बंदूकें नहीं। एक बंदूक लाने गया। बहुत ढूँढ़-ढाँढ़कर बंदूक तो मिल गई, पर चकमक नहीं मिली —"अरे, बारूद कहाँ है—गोली कहाँ है" चिल्लाते-चिल्लाते ही राममोहन और उसके अनुचर नाव को लकड़ियों के ऊपर से खींचकर ले गए। पहरेदार पीछा करने के लिए एक नाव बुलाने गए। जिस पर नाव बुलाने का भार था, उसने रास्ते में हरिमुदी की दुकान पर एक चिलम तंबाकू पी ली और रामशंकर को उसके बिस्तर से उठाकर अपने बकाया पैसे जल्दी देने के लिए तगादा कर गया। जब नाव की ज़रूरत बिल्कुल खत्म हो गई, तब शोर-शराबा करते हुए नाव आई। देरी देखकर सबने नाव बुलाने वाले को लंबी-चौड़ी डाँट-फटकार लगानी शुरू कर दी। उसने कहा, "मैं कोई घोड़ा तो हूँ नहीं!" जब एक-एक करके सबने उसे डाँट लिया, तब उन्हें होश आया कि अब नाव पकड़ने की कोई संभावना नहीं है। नाव लाने में जितनी देर हुई थी, डाँटने में उससे तीन गुना देर हो गई। जब रामचंद्र की नाव भैरव नदी में पहुँची, तब फर्नांडीज़ ने एक तोप दागी। भोर में प्रतापादित्य को नींद आई ही थी। उस तोप की आवाज़ से अचानक उनकी नींद टूट गई। वह चिल्लाए, "प्रहरी!" कोई नहीं आया। दरवाज़े के पहरेदार उसी रात भाग गए थे। प्रतापादित्य ने और ऊँची आवाज़ में पुकारा—"प्रहरी!"

1 The Attempt to Escape with Ramchandra Ray from the Locked Palace

When Basanta Ray returned to the inner quarters, Vibha burst into tears upon seeing him. Basanta Ray could no longer hold back his own tears. He grasped Udayaditya’s hand and said, “Dada, you must find a way to fix this.” Ramchandra Ray became completely frantic. At that, Udayaditya took his sword in hand. “Come,” he said, “follow me.” Everyone followed along. Udayaditya said, “Vibha, you stay here. Don’t come.” Vibha did not listen. Ramchandra Ray also said, “No, let Vibha come with us.” In that silent night, they all began to walk on tiptoe. It felt as if a great horror was stretching out its invisible hands from all sides. Ramchandra Ray kept glancing in front, behind, and to his sides. Now and then, suspicion towards his uncle began to arise. Reaching the door that led from the inner quarters to the outside, Udayaditya saw that it was locked. In a voice trembling with fear, Vibha said, “Dada, perhaps they haven’t locked the door leading downstairs. Let’s go there!” They all headed in that direction. They began to descend a long, dark staircase. It seemed to Ramchandra Ray that no one who went down these stairs ever came back up—that this must be the pit of the serpent Vasuki, the very stairs leading down to the underworld. When the stairs ended, they went to the door and found it locked. Again, they all slowly climbed back up. Every single path leading out of the inner quarters was locked. They wandered together from door to door, returning to check each one two or three times. All were locked.

When Vibha saw there was no way out, she wiped away her tears. Taking her husband's hand, she led him to their bedchamber. She stood firmly by the door and said in an unwavering voice, “Let’s see who can take you out of this room! Wherever you go, I will go before you. Let’s see who dares to stop me!” Udayaditya stood near the door and declared, “No one will enter this room without killing me first.” Surma said nothing, but went and stood by her husband’s side. Old Basanta Ray came and stood before them all. The uncle slowly walked away. But Ramchandra Ray did not like this arrangement at all. He was thinking, “From what I’ve seen, what is Pratapaditya not capable of? I have no hope that Vibha and Udayaditya, by standing in the middle, can achieve anything. If only I could get out of this house somehow, I would be saved.”

After a while, Surma said to Udayaditya in a low voice, “I don’t think any good will come of us standing here; rather, the opposite. The more resistance Father meets, the more resolute his purpose will become. Tell me a way to escape from the palace by any means tonight!”

Udayaditya looked thoughtfully at Surma’s face for a moment and said, “Then I will go and see if I can use force!”

Surma nodded her head firmly in assent. “Go,” she said.

Udayaditya threw off his shawl and left. Surma followed him for a short distance. Reaching a secluded spot, she threw her arms around Udayaditya’s chest in an embrace. Udayaditya bent his head and gave her a long kiss; and in an instant, he was gone. Then Surma returned to her bedchamber. Tears streamed from her eyes. With folded hands, she pleaded, “Oh, Mother—if I am a virtuous and devoted wife, then save my husband from his father’s hands this time. I sent him into this danger today relying only on you, Ma! If you destroy me, then no one on earth will ever believe in you again.” As she spoke, she broke down crying. In that darkness, Surma called out “Ma,” “Ma” in her mind so many times, but it felt as if the Mother did not hear her words. The flower offering she made to Her feet in her mind seemed to be rejected, to fall away. Surma cried, “Why, Ma? What have I done?” She heard no answer. In the darkness all around, she saw the form of the apocalypse dancing! Surma saw nothing but emptiness in every direction. She could no longer sit alone in that room. She went out and came to Vibha's room.

Basanta Ray said in a distressed voice, “Dada still has not returned. What will happen?”

Surma leaned against the wall and replied, “Whatever Vidhata wills!”

Ramchandra Ray, meanwhile, was mentally plotting the utter ruin of his old retainer, Rammohan! For it was because of him that this whole disaster had occurred. He was devising every possible punishment for him. Every so often, the thought would dawn on him that he might not get the chance to inflict any punishment at all.

2 The Unshakable Loyalty of Rammohan Mal

Udayaditya, sword in hand, crossed the inner quarters, went to the locked door, and kicked it forcefully—he said, “Who’s there?”

From outside, the reply came, “Your command, it is I, Sitaram!”

The Yubaraj said in a firm voice—“Open the door quickly.”

He opened the door immediately. As Udayaditya was about to leave, he said with folded hands,—“Yubaraj, forgive me—there are orders for no one to leave the inner quarters tonight.”

The Yubaraj said—“Sitaram, will you then also take up arms against me? Very well, then come.” Saying this, he drew his sword.

Sitaram said with folded hands, “No, Yubaraj, I cannot take up arms against you—you have saved my life twice.” Saying this, he took the dust from Udayaditya's feet and touched it to his head.

The Yubaraj said, “Then what do you want to do? Do it quickly—there is no more time.”

Sitaram said—“Do not destroy the life you have saved twice. Disarm me. Here, take my weapon. Bind me from head to foot. Otherwise, there will be no saving me from the Maharaj tomorrow.”

The Yubaraj took his weapon and tied him up with his own cloth. He remained lying there, and the prince left. A little further on, there was a very high wall. That wall had only one door, and that door was also locked. Crossing that door meant getting completely outside the inner quarters. Without striking the door, the Yubaraj leaped straight onto the wall. He saw a guard leaning against the wall, sleeping in perfect comfort. Very carefully, he climbed down. He fell upon the sleeping guard with the speed of lightning. He snatched his weapon and threw it far away, and then tied up the bewildered and overwhelmed guard from head to foot. The guard had a key on him; snatching the key, he opened the door. The guard then regained his senses and said in an astonished voice—“Yubaraj, what are you doing?”

The Yubaraj said, “Opening the door to the inner quarters.”

The guard said,—“What answer will I give to the Maharaj tomorrow?”

Udayaditya said, “Tell him the Yubaraj overpowered us by force and opened the door to the inner quarters. Then you will be spared.”

Udayaditya, having left the inner quarters, arrived at the room where the son-in-law's men were staying. In that room, only Rammohan and Ramai Bhand were sleeping; all the others had eaten and gone to the boat. The Yubaraj gently touched Rammohan. He jumped up with a start. Astonished, he said—“What is this, Yubaraj?” The Yubaraj said, “Come outside.” Rammohan came outside. The Yubaraj told Rammohan everything.

Then Rammohan tied his shawl around his head, brandished his staff, and, swelling with anger, said, “We'll see how great a man this Lachhman Sardar is. Yubaraj, just bring our Maharaj to me once. I alone can drive off a hundred men with this staff!”

The Yubaraj said, “I believe that, but in the royal palace of Jessore, there are many more than a hundred men! You will not be able to do anything by force. We must find another way.”

Rammohan said, “Very well, bring the Maharaj to me once. If he stands by my side, I can think of a plan with a peaceful mind.” Then Udayaditya went into the inner quarters and called for Ramchandra. He and everyone with him came.

Upon seeing Rammohan, Ramchandra was overcome with anger and said— “I dismiss you this instant—get out of my sight! You are an old retainer, what more punishment can I give you—if I survive this ordeal, I will never see your face again.” As he spoke, Ramchandra's voice choked. He truly loved Rammohan; Rammohan had raised him since childhood.

Rammohan said with folded hands, “Who are you to dismiss me, Maharaj? Bhagavan has given me this service. The day Yama summons me, that is the day Bhagavan will release me from this service. Whether you keep me or not, I am your servant.” Saying this, he stood protectively in front of Ramchandra.

3 Rammohan's Descent From the Roof With Ramchandra

Udayaditya said, “Rammohan, what is the plan?” Rammohan replied, “With the blessing of your honored feet, this staff is the plan. And my trust is in the feet of Ma-Kali.”

Udayaditya shook his head and said, “That plan is of no use. Alright, Rammohan, on which side is your boat?”

Rammohan said, “In the canal on the south side of the palace.”

Udayaditya said, “Let’s go up to the roof.”

An idea suddenly occurred to Rammohan—he said, “Yes, that’s right, let’s go there.”

Everyone went up to the palace roof. The canal was about seventy cubits below the roof. In that canal, Ramchandra's sixty-four-oared boat was floating. Rammohan said that he would tie Ramchandra Ray to his back and jump down from there.

Basanta Ray, in a flurry, quickly grabbed Rammohan and exclaimed, “No, no, no, how can that be? Rammohan, don’t you go trying such an impossible thing.”

Vibha, startled, cried out in terror, “No, Mohan, what are you saying!” Ramchandra said, “No, Rammohan, that will not do.”

Then Udayaditya went to the inner quarters and brought back several very thick, large sheets he had collected. Rammohan twisted and tied them together to prepare something like a huge rope. He tied the rope to a small pillar on the roof on the side where the boat was. The rope ended a little above the boat. Rammohan said to Ramchandra Ray, “Maharaj, you will hold onto my back, and I will climb down the rope.” Ramchandra reluctantly agreed. Then Rammohan bowed to everyone one by one and took the dust from everyone's feet, saying, “Victory to Ma-Kali!” He lifted Ramchandra onto his back, and Ramchandra, closing his eyes, clung to his back with all his might. Looking at Vibha, Rammohan said, “Ma, then I am leaving. While your son is here, do not have any fear!”

4 Ramchandra's Escape With the Help of Rammohan

Rammohan gripped the rope. Vibha leaned against a pillar and stood with all her might. The elderly Basanta Ray, standing on trembling feet, closed his eyes and began to chant, “Durga! Durga!” Rammohan climbed down the rope until he reached its very end. Then, letting go with his hands, he gripped the rope with his teeth, released Ramchandra from his back, and lowered him with both hands very carefully into the boat, before jumping down himself. As soon as Ramchandra was in the boat, he fainted. And as Ramchandra was lowered into the boat, Vibha let out a deep, long sigh and fell into a faint. Basanta Ray opened his eyes and asked, “My boy, what happened?” Udayaditya affectionately took the fainted Vibha in his arms and went into the inner quarters. Surma held Udayaditya’s hand and said, “What will happen to you now?” Udayaditya replied, “I do not worry for myself.”

Meanwhile, the boat went a short distance before it was stopped. The canal was blocked with large sal wood logs! At that moment, the guards suddenly saw from afar that the boat was escaping. They started throwing stones, but not a single one reached. The guards had swords, but no guns. One went to fetch a gun. After a frantic search, a gun was found, but a flintlock could not be—while they were shouting, “Hey, where’s the gunpowder—where are the bullets?” Rammohan and his followers pulled the boat up and over the logs. The guards went to call for a boat to give chase. The man entrusted with fetching the boat stopped on the way at Harimudi’s shop to smoke a pipeful of tobacco and went to wake Ramashankar from his bed to press him for the prompt payment of a debt. The boat finally arrived with much shouting and clamor, long after it was needed. Seeing the delay, everyone began to berate the boat-caller at length. He said, “I am not a horse, after all!” By the time each of them had finished scolding him, it dawned on them that there was no longer any chance of catching the boat. The scolding took three times longer than the delay in bringing the boat. When Ramchandra’s boat reached the Bhairav river, Fernandez fired a cannon. At dawn, sleep had finally overcome Pratapaditya. He was startled awake by the sound of that cannon. He called out, “Guard!” No one came. The guards at his door had fled that very night. Pratapaditya called out in a louder voice, “Guard!”

1 閉ざされた宮殿からのラーマチャンドラ・ライ脱出の試み

バサンタ・ライが奥御殿に戻ると、彼を見てビバはわっと泣き出した。バサンタ・ライももはや涙をこらえきれず、ウダヤディティヤの手を取って言った。「ウダヤディティヤよ、お前が何とかしておくれ」。ラーマチャンドラ・ライはすっかり取り乱してしまった。その時、ウダヤディティヤは剣を手に取った。そして言った。「来い、私についてくるのだ」。皆が後につづいた。ウダヤディティヤは言った。「ビバ、お前はここにいろ、来るな」。ビバは聞かなかった。ラーマチャンドラ・ライも言った。「いや、ビバも一緒に来させよう」。その静まり返った夜、一同は忍び足で進んだ。まるで魔物が四方から見えざる手を伸ばしてくるかのようだった。ラーマチャンドラ・ライは前後左右に視線をやった。時折、義理の大叔父にさえ疑念が湧いた。奥御殿から外へ出る扉に着くと、ウダヤディティヤはそれが閉ざされているのを見た。ビバが恐怖に震える詰まった声で言った。「兄さん、階下へ行く扉は閉めていないかもしれません。そっちへ行きましょう!」。皆はその方へ向かった。長く暗い階段を下りていく。ラーマチャンドラ・ライの胸に、この階段を下りたら二度と誰も上がれはしないのではないか、ここに蛇王ヴァースキの巣穴があるのではないか、これは冥府へ下る階段なのではないか、という思いがよぎった。階段が尽き、扉のところまで行くと、それも閉まっていた。一同は再び静かに階上へ上がった。奥御殿から外へ出る道は、すべて閉ざされていた。一同は扉から扉へとさまよい、それぞれの扉を二度、三度と繰り返し確かめた。すべて閉まっていた。

逃げ道がまったくないとわかると、ビバは涙を拭い、夫の手を取って寝室へ連れて行った。毅然として戸口に立ち、震えのない声で言った。「見ていましょう、この部屋からあなたを連れ出せる者がいるものですか! あなたがどこへ行こうと、私があなたの先を行きます。誰が私を阻むか、見ていましょう!」。ウダヤディティヤは戸口に立って言った。「私を殺さずして、誰もこの部屋には入れぬ」。スルマは何も言わずに夫の隣に立った。老いたバサンタ・ライが皆の前に立った。義理の叔父は静かに立ち去って行った。しかし、ラーマチャンドラ・ライはこのやり方が少しも気に入らなかった。彼は考えていた。「プラタパディティヤという男の様子では、何をしでかすか分かったものではない。ビバとウダヤディティヤが間に入って何かができるとは、とても期待できない。どうにかしてこの家から出られさえすれば助かるものを」。

しばらくして、スルマがウダヤディティヤに小声で言った。「私たちがここに立っていても、何の効果もないように思われます。むしろ逆効果です。父上は妨げられるほど、その決意を固くされるでしょう。今夜のうちに、どうにかして宮殿から脱出する方法を考えてください!」。

ウダヤディティヤは物思いに沈んだ様子でしばらくスルマの顔を見つめてから言った。「では私が行って、力ずくで試してこよう!」。

スルマは固く同意の意を示して頷き、「行ってください」と言った。

ウダヤディティヤは上着を脱ぎ捨て、去った。スルマは少しの間、後を追った。人気のない場所で、彼女はウダヤディティヤの胸に抱きついた。ウダヤディティヤは頭を垂れて彼女に長い口づけをすると、一瞬のうちに去って行った。その時、スルマは自分の寝室に戻っていた。両目から涙が溢れ落ちていた。手を合わせ、言った。「母なる女神様、もし私が貞淑な妻であるならば、今度こそ私の夫をその父の手からお救いください。私が今日、彼をこの危険の中に送り出したのは、ただあなた様を頼りにしてのことです、母上! もしあなたが私を滅ぼすなら、この地上であなた様を信じる者は二度と現れないでしょう」。そう言ううちに、泣き崩れた。スルマはその暗闇の中で、心に何度も「母上」「母上」と呼びかけたが、母は彼女の言葉を聞いてくれないように感じられた。心の中で捧げた花も、女神は受け取らずに足元からこぼれ落ちていくように思えた。スルマは泣きながら言った。「なぜです、母上。私が何をしたというのですか」。答えは聞こえなかった。彼女はその周りの暗闇の中に、破壊の化身が舞うのを見た。スルマには四方が虚無に見えた。彼女は一人でその部屋にいることができなくなった。外へ出て、ビバの部屋へ入った。

バサンタ・ライが悲痛な声で言った。「ウダヤディティヤがまだ戻らぬが、どうなることか」。

スルマは壁に寄りかかって立ち、「ビダータの御心のままに」と言った。

その時、ラーマチャンドラ・ライは心の中で、彼の年老いた従者ラムモハンの破滅を願っていた。なぜなら、この全ての災厄は彼から始まったからだ。彼はラムモハンに考えうる限りの罰を下していた。時折、罰を与える機会などもうないのかもしれない、という意識がよぎった。

2 ラムモハン・マルの揺るぎない忠誠心

ウダヤディティヤは剣を手に奥御殿を横切り、閉ざされた扉に行くと力任せに蹴りつけた。「誰かいるか?」と声をかけた。

外から「はい、私、シタラムでございます!」と返事があった。

王太子は厳しい声で言った。「すぐに扉を開けろ」

男はすぐに扉を開けた。ウダヤディティヤが立ち去ろうとすると、男は両手を合わせて言った。「王太子様、お許しください。今宵は奥御殿から誰一人として外へ出ることはお許しになっておりません」

王太子は言った。「シタラム、ではお前も私に刃向かうというのか?よかろう、かかってこい」。そう言って剣を抜いた。

シタラムは両手を合わせたまま言った。「いえ、王太子様、あなた様に刃向かうことなどできませぬ。あなたは二度も私の命を救ってくださったのですから」。そう言って、王太子の足元の塵を額にいただき、深い敬意を示した。

王太子は言った。「ではどうしたいのだ。早くしろ、時間がない」

シタラムは言った。「あなたが二度もお救いくださったこの命を、今度はどうかお奪いになりませぬよう。私を武装解除してください。さあ、これが私の武器です。私を頭のてっぺんから足の先まで縛り上げてください。さもなくば明日、マハラジャの前で私の命はございません」

王太子は彼の武器を取り、彼の衣服で彼を縛り上げた。シタラムはその場に倒れ、王太子は立ち去った。少し進むと、非常に高い城壁のようなものがあった。その城壁には扉が一つしかないが、それも閉ざされている。その扉を越えれば、完全に奥御殿の外に出られる。王太子は扉を叩かず、一気に城壁の上に飛び上がった。見ると、一人の衛兵が城壁にもたれて気持ちよさそうに眠っている。彼は細心の注意を払って下に降りた。そして電光石火の速さでその眠っている衛兵に飛びかかった。彼の武器を奪って遠くに投げ捨て、呆然自失となっている衛兵を頭のてっぺんから足の先まで縛り上げた。衛兵は鍵を持っていた。その鍵を奪い取って扉を開けた。その時、衛兵は意識を取り戻し、驚いた声で言った。「王太子様、何をなさっているのですか?」

王太子は言った。「奥御殿の扉を開けているのだ」

衛兵は言った。「明日、マハラジャに何と申し上げればよいのですか?」

ウダヤディティヤは言った。「王太子が力ずくで我らを打ち負かし、奥御殿の扉を開けた、と申せ。そうすればお前は助かるだろう」

ウダヤディティヤは奥御殿から出て、婿君の従者たちがいる部屋へと向かった。その部屋ではラムモハンと道化のラマイ・バンドだけが眠っており、他の者たちは食事を済ませて舟へ向かっていた。王太子はそっとラムモハンに触れた。彼は驚いて飛び起きた。そして当惑して言った。「これは王太子様?」王太子は言った。「外へ出ろ」。ラムモハンは外へ出た。王太子はラムモハンにすべてを話した。

するとラムモハンは頭に布を巻きつけ、棍棒を構えた。そして怒りに体を震わせながら言った。「ラクマン・サルダールとやらがどれほどの者か見てやろう。王太子様、どうか我らのマハラジャを一度だけ私の元へお連れください。この棍棒一本で、私一人で百人の男を追い払うことができますぞ!」

王太子は言った。「その言葉は信じよう。しかし、ジョソールの王宮には百人よりはるかに多くの者がいる。力ずくでは何もできまい。別の方法を考えねばならぬ」

ラムモハンは言った。「分かりました。マハラジャを一度私の元へお連れください。あの方が私のそばに立っておられれば、私は落ち着いて策を考えることができます」。そこでウダヤディティヤは奥御殿へ行き、ラーマチャンドラを呼んだ。彼と、彼に付き添っていた者たち全員がやって来た。

ラーマチャンドラはラムモハンを見るや否や、怒りに我を忘れて言った。「今すぐお前を罷免する!失せろ!お前は古くからの家来だ、これ以上どんな罰を与えられようか。もしこの旅を生き延びることができたなら、二度とその顔を見たくはないぞ」。そう言ううちに、ラーマチャンドラの声は詰まった。彼は心からラムモハンを愛していたのだ。幼い頃から、ラムモハンは彼を育ててきたのである。

ラムモハンは両手を合わせ、言った。「私を罷免するとは、あなた様は何様でございますか、マハラジャ?このお役目は神(バガヴァーン)から授かったもの。死神ヤマからお召しが来るその日に、神がこのお役目を解いてくださるでしょう。あなた様が私をお使いになろうとなかろうと、私はあなた様の家来でございます」。そう言って、彼はラーマチャンドラをかばうようにして立った。

3 屋上からラーマチャンドラを背負うラムモハンの降下

ウダヤディティヤは言った。「ラムモハン、何か策はあるか?」ラムモハンは言った。「殿のご加護とこの棒が頼りです。あとはカーリー女神のおみ足にすがるのみ」

ウダヤディティヤは首を横に振って言った。「その策ではどうにもならん。ところでラムモハン、お前たちの船はどの方角にある?」

ラムモハンは言った。「王宮の南側にある運河に」

ウダヤディティヤは言った。「一度、屋上へ行こう」

ラムモハンの頭に突如としてある策が浮かんだ。彼は言った。「はい、その通りです。そちらへ参りましょう」

一行は宮殿の屋上に上がった。屋上からおよそ七十ハット下の運河。その運河に、ラーマチャンドラの六十四本櫂の船が浮かんでいた。ラムモハンは、ラーマチャンドラ・ライを背中に縛りつけ、そこから飛び降りると言った。

バサンタ・ライは慌てふためいてラムモハンを掴み、叫んだ。「ならん、ならん、ならん、そんなことがあってたまるか。ラムモハン、そなた、そのような無謀なことをしてはならぬぞ」

ビバははっと驚き、恐怖に駆られて叫んだ。「だめよ、モーハン!あなた、何を言っているの!」ラーマチャンドラは言った。「ならん、ラムモハン、それは許さん」

するとウダヤディティヤは奥御殿へ行き、たいそう分厚く大きな布を何枚か集めてきた。ラムモハンはそれらをねじり、結び合わせ、一本の巨大な綱のようなものを作り上げた。船のある方角の屋上にある小さな柱に、その綱を結びつけた。綱は船の少し上で終わっていた。ラムモハンはラーマチャンドラ・ライに言った。「マハラジャ、私の背中にしがみついてください。私が綱を伝って降りていきます」ラーマチャンドラは、やむなくそれに同意した。そこでラムモハンは一人一人に礼をし、皆の足元の塵を取って、言った。「カーリー女神万歳」ラーマチャンドラを背負うと、ラーマチャンドラは目を閉じ、必死にその背中にしがみついた。ビバの方を見て、ラムモハンは言った。「お母様、それでは行って参ります。この子がいる限り、何も恐れることはありませんぞ!」

4 ラムモハンの助けによるラーマチャンドラの脱出

ラムモハンは綱をしっかりと掴んだ。ビバは柱に寄りかかり、必死に立っていた。老いたバサンタ・ライは震える足で立ち、目を閉じて「ドゥルガよ、ドゥルガよ」と唱え始めた。ラムモハンは綱を伝って下り、その端までたどり着いた。そこで彼は手放し、歯で綱を食いしばると、ラーマチャンドラを背中から降ろし、両手で抱えて細心の注意を払いながら舟へと下ろし、自らも飛び降りた。ラーマチャンドラは舟に降りるやいなや気を失った。ラーマチャンドラが舟に降りるのを見ると、ビバは深く長い息をひとつ吐き、気を失って倒れた。バサンタ・ライは目を開けて尋ねた。「どうしたのだ?」ウダヤディティヤは気絶したビバを優しく抱きかかえ、奥御殿へと去っていった。スルマはウダヤディティヤの手にすがり、「これから、あなたはどうなるのですか?」と尋ねた。ウダヤディティヤは答えた。「私のことは案じていない。」

一方、舟はしばらく進んだところで動けなくなった。大きな沙羅の木の丸太で水路が塞がれていたのだ!その時、見張り役たちが遠くから舟が逃げていくのを見つけた。石を投げ始めたが、一つも届かなかった。見張り役たちは剣は持っていたが、鉄砲はなかった。一人が鉄砲を取りに行った。大慌てで探し回り、鉄砲は見つかったものの火口が見つからない。「おい、火薬はどこだ、弾はどこだ」と騒いでいる間に、ラムモハンと従者たちは丸太の上を舟を引きずって越えていった。見張り役たちは追跡するために舟を呼びに行った。舟を呼ぶ役目を負わされた者は、途中でハリムディーの店に寄り道して一服タバコを吸い、さらにラムシャンカルを寝床から起こしては、貸した金の返済を催促していった。舟が全く不要になった頃になって、ようやく大声で呼びながら舟がやって来た。遅れを見て、皆はその舟を呼んできた者を長々と叱りつけ始めた。彼は言った。「わしは馬じゃあるまいし!」一人また一人と叱り終えたところで、彼らは舟を捕まえる見込みがもはやないことに気づいた。舟を持ってくるのにかかった遅れよりも、その叱責に三倍の時間がかかった。ラーマチャンドラの舟がバイラヴァ川に達した時、フェルナンデスが号砲を一発放った。夜が明ける頃、プラタパディティヤは眠りについていた。その砲声に、彼ははっと目を覚ました。彼は叫んだ。「見張りはいないか!」誰も来なかった。扉の見張り役たちは、その夜のうちに逃げ出していた。プラタパディティヤはさらに大きな声で叫んだ。「見張りは!」