1 রামচন্দ্র রায় ও পুরনারীদের পরিহাস

রামমোহন মাল যখন অন্তঃপুরে আসিয়া বিভাকে প্রণাম করিয়া কহিল, “মা তোমায় একবার দেখিতে এলাম” তখন বিভার মনে বড় আহ্লাদ হইল। রামমোহনকে সে বড় ভালবাসিত। কুটুম্বিতার নানাবিধ কার্য্যভার বহন করিয়া রামমোহন প্রায় মাঝে মাঝে চন্দ্রদ্বীপ হইতে যশোহরে আসিত। কোন আবশ্যক না থাকিলেও অবসর পাইলে সে এক একবার বিভাকে দেখিতে আসিত। রামমোহনকে বিভা কিছুমাত্র লজ্জা করিত না। বৃদ্ধ, বলিষ্ঠ, দীর্ঘ, রামমোহন যখন “মা” বলিয়া আসিয়া দাঁড়াইত তখন তাহার মধ্যে এমন একটা বিশুদ্ধ, সরল, অলঙ্কারশূন্য স্নেহের ভাব থাকিত, যে বিভা তাহার কাছে আপনাকে নিতান্ত বালিকা মনে করিত। বিভা তাহাকে কহিল “মোহন, তুই এতদিন আসিস্ নাই কেন?”

রামমোহন কহিল, “তা মা, ‘কুপুত্র যদি বা হয়, কুমাতা কখন নয়,’ তুমি কোন্ আমাকে মনে করিলে? আমি মনে মনে কহিলাম, মা না ডাকিলে আমি যাব না; দেখি, কত দিনে তাঁর মনে পড়ে! তা’ কৈ, একবারো ত মনে পড়িল না!”

বিভা ভারি মুষ্কিলে পড়িল। সে কেন ডাকে নাই, তাহা ভাল করিয়া বলিতে পারিল না। তাহা ছাড়া, ডাকে নাই বলিয়া যে মনে করে নাই, এই কথাটার মধ্যে এক জায়গায় কোথায় যুক্তির দোষ আছে বলিয়া মনে হইতেছে, অথচ ভাল করিয়া বুঝাইয়া বলিতে পারিতেছে না।

বিভার মুষ্কিল দেখিয়া রামমোহন হাসিয়া কহিল, “না মা অবসর পাই নাই বলিয়া আসিতে পারি নাই।”

বিভা কহিল, “মোহন তুই বোস; তোদের দেশের গল্প আমায় বল্।”

রামমোহন বসিল। চন্দ্রদ্বীপের বর্ণনা করিতে লাগিল। বিভা গালে হাত দিয়া এক মনে শুনিতে লাগিল। চন্দ্রদ্বীপের বর্ণনা শুনিতে শুনিতে তাহার হৃদয়টুকুর মধ্যে কত কি কল্পনা জাগিয়া উঠিয়াছিল, সে দিন সে আসমানের উপর কত ঘর বাড়িই বাঁধিয়াছিল, তাহার আর ঠিকানা নাই। যখন রামমোহন গল্প করিল, গত বর্ষার বন্যায় তাহার ঘড় বাড়ি সমস্ত ভাসিয়া গিয়াছিল; সন্ধ্যার প্রাক্কালে সে একাকী তাহার বৃদ্ধা মাতাকে পিঠে করিয়া সাঁতার দিয়া মন্দিরের চূড়ায় উঠিয়াছিল, ও দুই জনে মিলিয়া সমস্ত রাত্রি সেইখানে যাপন করিয়াছিল;—তখন বিভার ক্ষুদ্র বুকটির মধ্যে কি হৃৎকম্পই উপস্থিত হইয়াছিল।

গল্প ফুরাইলে পর রামমোহন কহিল “মা, তোমার জন্য চারগাছি শাঁখা আনিয়াছি, তোমাকে ঐ হাতে পরিতে হইবে, আমি দেখিব।”

বিভা তাহার চারগাছি সোনার চুড়ি খুলিয়া শাঁখা পরিল, ও হাসিতে হাসিতে মায়ের কাছে গিয়া কহিল,—“মা, মোহন তোমার চুড়ি খুলিয়া আমাকে চারগাছি শাঁখা পরাইয়া দিয়াছে।”

মহিষী কিছুমাত্র অসন্তুষ্ট না হইয়া হাসিয়া কহিলেন, “তা,’ বেশ ত সাজিয়াছে, বেশ ত মানাইয়াছে।”

রামমোহন অত্যন্ত উৎসাহিত ও গর্ব্বিত হইয়া উঠিল। মহিষী তাহাকে ডাকাইয়া লইয়া গেলেন, নিজে উপস্থিত থাকিয়া তাহাকে আহার করাইলেন। সে তৃপ্তিপূর্ব্বক ভোজন করিলে পর তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন,—“মোহন, এই বারে তোর সেই আগমনীর গানটি গা।” রামমোহন বিভার দিকে চাহিয়া গাহিল;—

“সারা বরষ দেখিনে মা, মা তুই আমার কেমন ধারা,

নয়ন-তারা হারিয়ে আমার অন্ধ হ’ল নয়ন-তারা!

এলি কি পাষাণী ওরে,

দেখ্‌ব তোরে আঁখি ভোরে,

কিছুতেই থামেনা যে মা, পোড়া এ নয়নের ধারা!”

রামমোহনের চোখে জল আসিল, মহিষীও বিভার মুখের দিকে চাহিয়া, চোখের জল মুছিলেন। আগমনীর গানে তাঁহার বিজয়ার কথা মনে পড়িল।

ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিল। পুরমহিলাদের জনতা বাড়িতে লাগিল। প্রতিবেশিনীরা জামাই দেখিবার জন্য ও সম্পর্ক অনুসারে জামাইকে উপহাস করিবার জন্য অন্তঃপুরে সমাগত হইল। আনন্দ, লজ্জা, আশঙ্কা, একটা অনিশ্চিত, অনির্দ্দেশ্য না জানি-কি-হইবে ভাবে বিভার হৃদয় তোলপাড় করিতেছে, তাহার মুখ কান লাল হইয়া উঠিয়াছে, তাহার হাত পা শীতল হইয়া গিয়াছে। ইহা কষ্ট কি সুখ কে জানে!

জামাই অন্তঃপুরে আসিয়াছেন। হুল-বিশিষ্ট সৌন্দর্য্যের ঝাঁকের ন্যায় রমণীগণ চারিদিক্ হইতে তাঁহাকে আক্রমণ করিয়াছে। চারিদিকে হাসির কোলাহল উঠিল। চারিদিক্‌ হইতে কোকিল-কণ্ঠের তীব্র উপহাস মৃণাল-বাহুর কঠোর তাড়ন, চম্পক-অঙ্গুলির চন্দ্র-নখরের তীক্ষ্ণ পীড়ন চলিতে লাগিল। রামচন্দ্র রায় যখন নিতান্ত কাতর হইয়া পড়িয়াছেন, তখন একজন প্রৌঢ়া রমণী আসিয়া তাঁহার পক্ষ অবলম্বন করিয়া বসিল। সে কঠোর কণ্ঠে এমনি কাটা কাটা কথা কহিতে লাগিল ও ক্রমেই তাহার মুখ দিয়া এমনি সকল রুচির বিকার বাহির হইতে লাগিল যে পুর-রমণীদের মুখ এক প্রকার বন্ধ হইয়া আসিল। তাহার মুখের কাছে থাকদিদিও চুপ করিয়া গেলেন। বিমলাদিদি ঘর হইতে উঠিয়া চলিয়া গেলেন। কেবল ভূতোর মা তাহাকে খুব এক কথা শুনাইয়াছিল। যখন উল্লিখিত ভূতোর মার মুখ খুব চলিতেছিল, তখন সেই প্রৌঢ়া তাহাকে বলিয়াছিল, “মাগো মা, তোমার মুখ নয়ত, এক গাছা ঝাঁটা!” ভূতোর মা তৎক্ষণাৎ কহিল, “আর মাগি, তোর মুখটা আঁস্তাকুড়, এত ঝাঁটাইলাম তবুও সাফ হইল না!” বলিয়া গস্ গস্ করিয়া চলিয়া গেল। একে একে ঘর খালি হইল, রামচন্দ্র রায় বিরাম পাইলেন!

2 রামচন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

তখন সেই প্রৌঢ়া গৃহ হইতে বাহির হইয়া মহিষীর কক্ষে উপস্থিত হইল। সেখানে মহিষী দাসদাসীদিগকে খাওয়াইতেছিলেন। রামমোহনও এক পার্শ্বে বসিয়া খাইতেছিল। সেই প্রৌঢ়া, মহিষীর কাছে আসিয়া তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া কহিল,—“এই যে নিকষা জননী!” শুনিবামাত্র রামমোহন চমকিয়া উঠিল, প্রৌঢ়ার মুখের দিকে চাহিল। তৎক্ষণাৎ আহার পরিত্যাগ করিয়া শার্দ্দুলের ন্যায় লম্ফ দিয়া তাহার দুই হস্ত বজ্রমুষ্টিতে ধরিয়া বজ্রস্বরে বলিয়া উঠিল, “আমি যে ঠাকুর তোমায় চিনি!” বলিয়া তাহার মস্তকের বস্ত্র উন্মোচন করিয়া ফেলিল। আর কেহ নহে, রমাই ঠাকুর! রামমোহন ক্রোধে কাঁপিতে লাগিল, গাত্র হইতে চাদর খুলিয়া ফেলিল; দুই হস্তে অবলীলাক্রমে রমাইকে আকাশে তুলিল, কহিল “আজ আমার হাতে তোর মরণ আছে!” বলিয়া তাহাকে দুই এক পাক আকাশে ঘুরাইল। মহিষী ছুটিয়া আসিয়া কহিলেন, “রামমোহন তুই করিস্ কি?” রমাই কাতর স্বরে কহিল, “দোহাই বাবা, ব্রহ্মহত্যা করিস্ না!” চারিদিক হইতে বিষম একটা গোলযোগ উঠিল। তখন রামমোহন রমাইকে ভূমিতে নামাইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে কহিল, “হতভাগা, তোর কি আর মরিবার জায়গা ছিল না?”

রমাই কহিল, “মহারাজ আমাকে আদেশ করিয়াছেন।” রামমোহন বলিয়া উঠিল, “কি বলিলি, নিমকহারাম? ফের অমন কথা বলিবি ত, এই সানের পাথরে তোর মুখ ঘষিয়া দিব!” বলিয়া তাহার গলা টিপিয়া ধরিল।

রমাই আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল। তখন রামমোহন খর্ব্বকায় রমাইকে চাদর দিয়া বাঁধিয় বস্তার মতন করিয়া ঝুলাইয়া অন্তঃপুর হইতে বাহির, হইয়া গেল।

দেখিতে দেখিতে কথাটা অনেকটা রাষ্ট্র হইয়া গিয়াছে। রাত্রি তখন দুই প্রহর অতীত হইয়া গিয়াছে। রাজার শ্যালক আসিয়া সেই রাত্রে প্রতাপাদিত্যকে সংবাদ দিলেন যে, জামাতা রমাই ভাঁড়কে রমণীবেশে অন্তঃপুরে লইয়া গেছেন! সেখানে সে পুর-রমণীদের সহিত, এমন কি, মহিষীর সহিত বিদ্রূপ করিয়াছে।

তখন প্রতাপাদিত্যের মুর্ত্তি অতিশয় ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল। রোষে তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ আলোড়িত হইয়া উঠিল। স্ফীতজটা সিংহের ন্যায় শয্যা হইতে উঠিয়া বসিলেন। কহিলেন, “লছমন্ সর্দ্দারকে ডাক।” লছমন্ সর্দারকে কহিলেন—“আজ রাত্রে আমি রামচন্দ্র রায়ের ছিন্ন মুণ্ড দেখিতে চাই!” সে তৎক্ষণাৎ সেলাম করিয়া কহিল, “যো হুকুম মহারাজ!” তৎক্ষণাৎ তাঁহার শ্যালক তাঁহার পদতলে পড়িল, কহিল— “মহারাজ, মার্জ্জনা করুন, বিভার কথা একবার মনে করুন। অমন কাজ করিবেন না!” প্রতাপাদিত্য পুনরায় দৃঢ়স্বরে কহিলেন, “আজ রাত্রের মধ্যেই আমি রামচন্দ্র রায়ের মুণ্ড চাই!” তাঁহার শ্যালক তাঁহার পা জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “মহারাজ, আজ তাঁহারা অন্তঃপুরে শয়ন করিয়াছেন, মার্জ্জনা করুন, মহারাজ মার্জ্জনা করুন!” তখন প্রতাপাদিত্য কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধভাবে থাকিয়া কহিলেন—“লছমন্ শুন, কাল প্রভাতে যখন রামচন্দ্র রায় অন্তঃপুর হইতে বাহির হইবে, তখন তাহাকে বধ করিবে, তোমার উপর আদেশ রহিল।” শ্যালক দেখিলেন তিনি যত দূর মনে করিয়াছিলেন, তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক হইয়া গিয়াছে। তিনি সেই রাত্রে চুপি চুপি আসিয়া বিভার শয়নকক্ষের দ্বারে আঘাত করিলেন।

তখন দূর হইতে দুই প্রহরের নহবৎ বাজিতেছে। নিঃস্তব্ধ রাত্রে সেই নহবতের শব্দ, জ্যোৎস্নার সহিত, দক্ষিণা-বাতাসের সহিত মিশিয়া ঘুমন্ত প্রাণের মধ্যে স্বপ্নসৃষ্টি করিতেছে। বিভার শয়নকক্ষের মুক্ত বাতায়ন ভেদ করিয়া জ্যোৎস্নার আলো বিছানায় আসিয়া পড়িয়াছে, রামচন্দ্র রায় নিদ্রায় মগ্ন। বিভা উঠিয়া বসিয়া চুপ করিয়া গালে হাত দিয়া ভাবিতেছে। জ্যোৎস্নার দিকে চাহিয়া তাহার চোখ দিয়া দুই এক বিন্দু অশ্রু ঝরিয়া পড়িতেছিল। বুঝি যেমনটি কল্পনা করিয়াছিল ঠিক তেমনটি হয় নাই। তাহার প্রাণের মধ্যে কাঁদিতেছিল। এতদিন যাহার জন্য অপেক্ষা করিয়াছিল, সে দিন ত আজ আসিয়াছে।

রামচন্দ্র রায় শয্যায় শয়ন করিয়া অবধি বিভার সহিত একটি কথা কন নাই। প্রতাপাদিত্য, তাঁহাকে অপমান করিয়াছে—তিনি প্রতাপ-আদিত্যকে অপমান করিবেন কি করিয়া? না, বিভাকে অগ্রাহ্য করিয়া। তিনি জানাইতে চান, “তুমি ত যশোহরের প্রতাপাদিত্যের মেয়ে, চন্দ্রদ্বীপাধিপতি রাজা রামচন্দ্র রায়ের পাশে কি তোমাকে সাজে?” এই স্থির করিয়া সেই যে পাশ ফিরিয়া শুইয়াছেন আর পাশ্বপরিবর্ত্তন করেন নাই। যত মান অভিমান সমস্তই বিভার প্রতি। বিভা জাগিয়া বসিয়া ভাবিতেছে। একবার জ্যোৎস্নার দিকে চাহিতেছে, একবার স্বামীর মুখের দিকে চাহিতেছে। তাহার বুক কাঁপিয়া কাঁপিয়া এক একবার দীর্ঘনিশ্বাস উঠিতেছে—প্রাণের মধ্যে বড় ব্যথা বাজিয়াছে। সহসা একবার রামচন্দ্রের ঘুম ভাঙিয়া গেল। সহসা দেখিলেন বিভা চুপ করিয়া বসিয়া কাঁদিতেছে। সেই নিদ্রোত্থিত অবস্থার প্রথম মুহূর্ত্তে যখন অপমানের স্মৃতি জাগিয়া উঠে নাই, গভীর নিদ্রার পরে মনের সুস্থ ভাব ফিরিয়া আসিয়াছে, রোষের ভাব চলিয়া গিয়াছে, তখন সহসা বিভার সেই অশ্রুপ্লাবিত করুণ কচি মুখখানি দেখিয়া সহসা তাঁহার মনে করুণা জাগিয়া উঠিল। বিভার হাত ধরিয়া কহিলেন, “বিভা, কাঁদিতেছ!” বিভা আকুল হইয়া উঠিল। বিভা কথা কহিতে পারিল না, বিভা চোখে দেখিতে পাইল না, বিভা শুইয়া পড়িল। তখন রামচন্দ্র রায় উঠিয়া বসিয়া ধীরে ধীরে বিভার মাথাটি লইয়া কোলের উপরে রাখিলেন, তাহার অশ্রুজল মুছাইয়া দিলেন। এমন সময়ে দ্বারে কে আঘাত করিল। রামচন্দ্র বলিয়া উঠিলেন “কেও?” বাহির হইতে উত্তর আসিল, “অবিলম্বে দ্বার খোল!”

1 রামচন্দ্র রায় ও পুরনারীদের পরিহাস

রামমোহন মাল যখন অন্তঃপুরে এসে বিভাকে প্রণাম করে বলল, “মা, তোমায় একবার দেখতে এলাম,” তখন বিভার মনে খুব আনন্দ হলো। রামমোহনকে সে খুব ভালোবাসত। আত্মীয়তার সূত্রে নানা কাজের দায়িত্ব নিয়ে রামমোহন প্রায়ই চন্দ্রদ্বীপ থেকে যশোরে আসত। কোনো প্রয়োজন না থাকলেও অবসর পেলে সে একবার বিভাকে দেখতে আসত। রামমোহনকে বিভা একটুও লজ্জা করত না। বৃদ্ধ, বলশালী, লম্বা রামমোহন যখন “মা” বলে এসে দাঁড়াত, তখন তার মধ্যে এমন একটা বিশুদ্ধ, সরল, অলংকারহীন স্নেহের ভাব থাকত যে, বিভা তার কাছে নিজেকে নিতান্ত বালিকা মনে করত। বিভা তাকে বলল, “মোহন, তুই এতদিন আসিসনি কেন?”

রামমোহন বলল, “তা মা, ‘কুপুত্র যদি বা হয়, কুমাতা কখন নয়’, তুমি আর কবে আমাকে মনে করলে? আমি মনে মনে বললাম, মা না ডাকলে আমি যাব না; দেখি, কত দিনে তাঁর মনে পড়ে! তা কই, একবারও তো মনে পড়ল না!”

বিভা ভারি মুশকিলে পড়ল। সে কেন ডাকেনি, তা ভালো করে বলতে পারল না। তাছাড়া, ডাকেনি বলেই যে মনে করেনি, এই কথাটার মধ্যে কোথায় যেন একটা যুক্তির ভুল আছে বলে মনে হচ্ছে, অথচ ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারছে না।

বিভার মুশকিল দেখে রামমোহন হেসে বলল, “না মা, অবসর পাইনি বলেই আসতে পারিনি।”

বিভা বলল, “মোহন, তুই বোস; তোদের দেশের গল্প আমায় বল।”

রামমোহন বসল। চন্দ্রদ্বীপের বর্ণনা করতে লাগল। বিভা গালে হাত দিয়ে একমনে শুনতে লাগল। চন্দ্রদ্বীপের বর্ণনা শুনতে শুনতে তার ছোট্ট হৃদয়টার মধ্যে কত যে কল্পনা জেগে উঠেছিল, সেদিন সে কল্পনার জগতে কত ঘরবাড়িই না তৈরি করেছিল, তার আর ঠিকানা নেই। যখন রামমোহন গল্প করল, গত বর্ষার বন্যায় তার ঘরবাড়ি সব ভেসে গিয়েছিল; সন্ধ্যার ঠিক আগে সে একাকী তার বৃদ্ধা মাকে পিঠে করে সাঁতার দিয়ে মন্দিরের চূড়ায় উঠেছিল এবং দুজনে মিলে সারারাত সেখানেই কাটিয়েছিল—তখন বিভার ছোট্ট বুকটার মধ্যে কী যে কাঁপুনি শুরু হয়েছিল!

গল্প শেষ হলে রামমোহন বলল, “মা, তোমার জন্য চারগাছি শাঁখা এনেছি, তোমাকে ওই হাতে পরতে হবে, আমি দেখব।”

বিভা তার চারগাছি সোনার চুড়ি খুলে শাঁখা পরল, আর হাসতে হাসতে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, “মা, মোহন তোমার চুড়ি খুলিয়ে আমাকে চারগাছি শাঁখা পরিয়ে দিয়েছে।”

মহিষী একটুও অসন্তুষ্ট না হয়ে হেসে বললেন, “তা বেশ তো সেজেছে, বেশ তো মানিয়েছে।”

রামমোহন অত্যন্ত উৎসাহিত ও গর্বিত হয়ে উঠল। মহিষী তাকে ডেকে নিয়ে গেলেন, নিজে উপস্থিত থেকে তাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করলেন। সে তৃপ্তি করে খাওয়ার পর তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “মোহন, এইবারে তোর সেই আগমনীর গানটি গা।” রামমোহন বিভার দিকে চেয়ে গাইল—

“সারা বরষ দেখিনে মা, মা তুই আমার কেমন ধারা,

নয়ন-তারা হারিয়ে আমার অন্ধ হল নয়ন-তারা!

এলি কি পাষাণী ওরে,

দেখব তোরে আঁখি ভোরে,

কিছুতেই থামে না যে মা, পোড়া এ নয়নের ধারা!”

রামমোহনের চোখে জল এল, মহিষীও বিভার মুখের দিকে চেয়ে চোখের জল মুছলেন। আগমনীর গানে তাঁর বিজয়ার কথা মনে পড়ল।

ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে এল। পুরনারীদের ভিড় বাড়তে লাগল। প্রতিবেশিনীরা জামাই দেখার জন্য এবং সম্পর্ক অনুসারে জামাইকে উপহাস করার জন্য অন্তঃপুরে সমবেত হলো। আনন্দ, লজ্জা, আশঙ্কা, একটা অনিশ্চিত, অনির্দিষ্ট ‘না-জানি-কী-হবে’ ভাবে বিভার হৃদয় তোলপাড় করছে, তার মুখ-কান লাল হয়ে উঠেছে, তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। এটা কষ্ট না সুখ, কে জানে!

জামাই অন্তঃপুরে এসেছেন। কাঁটাওয়ালা সুন্দরীদের ঝাঁকের মতো রমণীরা চারদিক থেকে তাঁকে আক্রমণ করেছে। চারিদিকে হাসির কোলাহল উঠল। চারিদিক থেকে কোকিলের মতো মিষ্টি গলায় তীব্র ঠাট্টা, পদ্মমৃণালের মতো নরম হাতে কঠোর আঘাত, আর চাঁপার কলির মতো আঙুলের ধারালো নখের আঁচড় চলতে লাগল। রামচন্দ্র রায় যখন নিতান্ত কাতর হয়ে পড়েছেন, তখন একজন প্রৌঢ়া রমণী এসে তাঁর পক্ষ নিয়ে বসল। সে কঠোর গলায় এমন কাটা কাটা কথা বলতে লাগল এবং ক্রমশ তার মুখ দিয়ে এমন সব রুচির বিকার বেরোতে লাগল যে পুরনারীদের মুখ একরকম বন্ধ হয়ে এল। তার মুখের কাছে থাকদিদিও চুপ করে গেলেন। বিমলাদিদি ঘর থেকে উঠে চলে গেলেন। কেবল ভূতের মা তাকে খুব এক কথা শুনিয়েছিল। যখন সেই ভূতের মায়ের মুখ খুব চলছিল, তখন সেই প্রৌঢ়া তাকে বলেছিল, “মাগো মা, তোমার মুখ নয়তো, একগাছা ঝাঁটা!” ভূতের মা তৎক্ষণাৎ বলল, “আর মাগি, তোর মুখটা আঁস্তাকুড়, এত ঝাঁটালাম তবুও সাফ হলো না!” বলে গসগস করে চলে গেল। একে একে ঘর খালি হলো, রামচন্দ্র রায় স্বস্তি পেলেন!

2 রামচন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

তখন সেই প্রৌঢ়া মহিলাটি ঘর থেকে বেরিয়ে মহিষীর কক্ষে উপস্থিত হল। সেখানে মহিষী দাসদাসীদের খাওয়াচ্ছিলেন। রামমোহনও একপাশে বসে খাচ্ছিল। সেই প্রৌঢ়া মহিষীর কাছে এসে তাঁকে ভালো করে দেখে বলল, “এই যে নিকষা জননী!” শোনামাত্রই রামমোহন চমকে উঠে প্রৌঢ়ার মুখের দিকে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া ছেড়ে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তার দুই হাত বজ্রমুষ্টিতে ধরে বজ্রস্বরে বলে উঠল, “ঠাকুর, আমি যে তোমাকে চিনি!” বলে তার মাথার কাপড় খুলে ফেলল। আর কেউ নয়, রমাই ভাঁড়! রামমোহন ক্রোধে কাঁপতে লাগল, গা থেকে চাদর খুলে ফেলল। দুই হাতে অনায়াসে রমাইকে আকাশে তুলে বলল, “আজ আমার হাতে তোর মরণ আছে!” বলে তাকে দু-এক পাক আকাশে ঘোরালো। মহিষী ছুটে এসে বললেন, “রামমোহন, কী করছিস তুই?” রমাই কাতর স্বরে বলল, “দোহাই বাবা, ব্রহ্মহত্যা করিস না!” চারদিক থেকে প্রচণ্ড শোরগোল উঠল। তখন রামমোহন রমাইকে মাটিতে নামিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “হতভাগা, তোর কি আর মরার জায়গা ছিল না?”

রমাই বলল, “মহারাজ আমাকে আদেশ করেছেন।” রামমোহন বলে উঠল, “কী বললি, নিমকহারাম? আবার এমন কথা বললে এই শানের পাথরে তোর মুখ ঘষে দেব!” বলে তার গলা টিপে ধরল।

রমাই আর্তনাদ করে উঠল। তখন রামমোহন বেঁটেখাটো রমাইকে চাদর দিয়ে বেঁধে বস্তার মতো করে ঝুলিয়ে অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে গেল।

দেখতে দেখতে কথাটা বেশ রটে গেল। রাত তখন দুই প্রহর পেরিয়েছে। রাজার শ্যালক সেই রাতেই প্রতাপাদিত্যকে খবর দিলেন যে, জামাই রমাই ভাঁড়কে নারীর বেশে অন্তঃপুরে নিয়ে গেছেন! সেখানে সে পুরনারীদের সাথে, এমনকি মহিষীর সাথেও বিদ্রূপ করেছে।

তখন প্রতাপাদিত্যের চেহারা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। ক্রোধে তাঁর সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। ফুলে ওঠা কেশরওয়ালা সিংহের মতো বিছানা থেকে উঠে বসলেন। বললেন, “লছমন সর্দারকে ডাকো।” লছমন সর্দারকে বললেন, “আজ রাতে আমি রামচন্দ্র রায়ের ছিন্ন মস্তক দেখতে চাই!” সে তৎক্ষণাৎ সেলাম করে বলল, “যো হুকুম মহারাজ!” সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শ্যালক তাঁর পায়ে পড়ে বললেন, “মহারাজ, ক্ষমা করুন, বিভার কথা একবার মনে করুন। এমন কাজ করবেন না!” প্রতাপাদিত্য পুনরায় দৃঢ়স্বরে বললেন, “আজ রাতের মধ্যেই আমি রামচন্দ্র রায়ের মুণ্ড চাই!” তাঁর শ্যালক তাঁর পা জড়িয়ে ধরে বললেন, “মহারাজ, আজ তাঁরা অন্তঃপুরে শুয়েছেন, ক্ষমা করুন, মহারাজ ক্ষমা করুন!” তখন প্রতাপাদিত্য কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললেন, “লছমন শোনো, কাল সকালে যখন রামচন্দ্র রায় অন্তঃপুর থেকে বেরোবে, তখন তাকে বধ করবে, তোমার উপর এই আদেশ রইল।” শ্যালক দেখলেন, তিনি যতটা ভেবেছিলেন, পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক গুরুতর হয়ে গেছে। তিনি সেই রাতেই চুপিসারে এসে বিভার শোবার ঘরের দরজায় আঘাত করলেন।

তখন দূর থেকে দুই প্রহরের নহবত বাজছে। নিস্তব্ধ রাতে সেই নহবতের শব্দ, জ্যোৎস্নার সাথে, দখিনা বাতাসের সাথে মিশে ঘুমন্ত প্রাণের মধ্যে স্বপ্নের সৃষ্টি করছে। বিভার শোবার ঘরের খোলা জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো বিছানায় এসে পড়েছে, রামচন্দ্র রায় ঘুমে মগ্ন। বিভা উঠে বসে চুপ করে গালে হাত দিয়ে ভাবছে। জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে তার চোখ দিয়ে দু-এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ছিল। হয়তো যেমনটা কল্পনা করেছিল, ঠিক তেমনটা হয়নি। তার বুকের ভেতরটা কাঁদছিল। এতদিন যার জন্য অপেক্ষা করেছিল, সেই দিন তো আজ এসেছে।

রামচন্দ্র রায় বিছানায় শোওয়ার পর থেকে বিভার সাথে একটিও কথা বলেননি। প্রতাপাদিত্য তাঁকে অপমান করেছেন—তিনি প্রতাপাদিত্যকে অপমান করবেন কী করে? তাই তিনি বিভাকে উপেক্ষা করছেন। তিনি বোঝাতে চান, “তুমি তো যশোরের প্রতাপাদিত্যের মেয়ে, চন্দ্রদ্বীপের রাজা রামচন্দ্র রায়ের পাশে কি তোমাকে মানায়?” এই স্থির করে তিনি যে পাশ ফিরে শুয়েছেন, আর পাশ ফেরেননি। সমস্ত মান-অভিমান যেন বিভার উপরেই। বিভা জেগে বসে ভাবছে। একবার জ্যোৎস্নার দিকে তাকাচ্ছে, একবার স্বামীর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। তার বুক কেঁপে কেঁপে উঠছে আর থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস পড়ছে—বুকে বড় ব্যথা বেজেছে। হঠাৎ একবার রামচন্দ্রের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি দেখলেন, বিভা চুপ করে বসে কাঁদছে। ঘুম থেকে ওঠার সেই প্রথম মুহূর্তে, যখন অপমানের স্মৃতি জেগে ওঠেনি, গভীর ঘুমের পর মন যখন সুস্থ, রাগের ভাব চলে গেছে, তখন বিভার সেই অশ্রুসিক্ত করুণ কচি মুখখানি দেখে হঠাৎ তাঁর মনে করুণা জেগে উঠল। বিভার হাত ধরে বললেন, “বিভা, কাঁদছ!” বিভা আকুল হয়ে উঠল। বিভা কথা বলতে পারল না, চোখে দেখতে পেল না, সে শুয়ে পড়ল। তখন রামচন্দ্র রায় উঠে বসে ধীরে ধীরে বিভার মাথাটি তুলে নিজের কোলের উপর রাখলেন, তার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন। এমন সময় দরজায় কে আঘাত করল। রামচন্দ্র বলে উঠলেন, “কে?” বাইরে থেকে উত্তর এল, “এক্ষুনি দরজা খোলো!”

1 रामचंद्र राय और पुरनारियों का परिहास

जब राममोहन माल ने अंतःपुर में आकर विभा को प्रणाम किया और कहा, “माँ, मैं तुम्हें एक बार देखने आया हूँ,” तो विभा के मन में बड़ी प्रसन्नता हुई। वह राममोहन से बहुत स्नेह करती थी। रिश्तेदारी के तरह-तरह के काम के बोझ के कारण राममोहन अक्सर चंद्रद्वीप से यशोर आता-जाता रहता था। कोई आवश्यकता न होने पर भी, अवसर मिलने पर वह एक बार विभा से मिलने आ जाता था। विभा को राममोहन से ज़रा भी शर्म नहीं आती थी। वृद्ध, बलवान, लंबे राममोहन जब “माँ” कहकर सामने आकर खड़े होते, तो उनमें एक ऐसा शुद्ध, सरल, और आडंबरहीन स्नेह का भाव होता था कि विभा उनके सामने खुद को एकदम बालिका समझने लगती थी। विभा ने उनसे कहा, “मोहन, तुम इतने दिनों से क्यों नहीं आए?”

राममोहन ने कहा, “तो माँ, ‘पूत कपूत भले ही हो जाए, पर माता कुमाता कभी नहीं होती,’ पर तुमने मुझे कब याद किया? मैंने मन ही मन कहा, जब तक माँ नहीं बुलाएँगी, मैं नहीं जाऊँगा; देखता हूँ, उन्हें कितने दिनों में याद आता है! पर कहाँ, एक बार भी तो याद नहीं आया!”

विभा बड़ी मुश्किल में पड़ गई। वह ठीक से बता नहीं पाई कि उसने क्यों नहीं बुलाया। इसके अलावा, उसे लग रहा था कि 'नहीं बुलाया इसलिए याद नहीं किया', इस बात में कहीं कोई तार्किक दोष है, पर वह उसे ठीक से समझा नहीं पा रही थी।

विभा की मुश्किल देखकर राममोहन ने हँसकर कहा, “नहीं माँ, अवसर नहीं मिला, इसीलिए नहीं आ सका।”

विभा ने कहा, “मोहन, तुम बैठो; मुझे अपने देश की कहानियाँ सुनाओ।”

राममोहन बैठ गया। वह चंद्रद्वीप का वर्णन करने लगा। विभा गाल पर हाथ रखकर एक मन से सुनने लगी। चंद्रद्वीप का वर्णन सुनते-सुनते उसके नन्हे से हृदय में न जाने कितनी कल्पनाएँ जाग उठी थीं, उस दिन उसने आसमान में कितने ही घर बना डाले थे, इसका कोई ठिकाना नहीं। जब राममोहन ने कहानी सुनाई कि पिछली बरसात की बाढ़ में उसका घर-बार सब बह गया था; संध्या से ठीक पहले वह अकेला अपनी बूढ़ी माँ को पीठ पर लादकर तैरते हुए मंदिर के शिखर पर चढ़ गया था, और दोनों ने मिलकर पूरी रात वहीं बिताई थी;—तब विभा के छोटे से सीने में कैसी धड़कन बढ़ गई थी।

कहानी समाप्त होने पर राममोहन ने कहा, “माँ, मैं तुम्हारे लिए चार शाखा लाया हूँ, तुम्हें इन्हें इसी हाथ में पहनना होगा, मैं देखूँगा।”

विभा ने अपनी सोने की चार चूड़ियाँ उतारकर शाखा पहन ली, और हँसते-हँसते माँ के पास जाकर कहा,—“माँ, मोहन ने तुम्हारी चूड़ियाँ उतरवाकर मुझे चार शाखा पहना दी हैं।”

महिषी ज़रा भी अप्रसन्न न होकर हँसकर बोलीं, “तो क्या, खूब सजी है, खूब जँच रही है।”

राममोहन अत्यंत उत्साहित और गर्वित हो उठा। महिषी ने उसे बुलवाया और स्वयं उपस्थित रहकर उसे भोजन कराया। जब उसने तृप्तिपूर्वक भोजन कर लिया, तो वह अत्यंत प्रसन्न होकर बोलीं,—“मोहन, अब तुम अपना वही आगमनी गीत गाओ।” राममोहन ने विभा की ओर देखकर गाया;—

“पूरे बरस नहीं देखा माँ, माँ तू मेरी कैसी है,

नयन-तारा खोकर मेरी अंधी हुई नयन-तारा!

आई क्या तू पाषाणी री,

देखूँगा तुझे आँखें भर के,

किसी तरह नहीं रुकती माँ, यह कमबख्त नयनों की धारा!”

राममोहन की आँखों में आँसू आ गए, महिषी ने भी विभा के मुख की ओर देखकर अपने आँसू पोंछे। आगमनी के गीत से उन्हें विजया की बात याद आ गई।

धीरे-धीरे शाम हो आई। राजमहल की महिलाओं की भीड़ बढ़ने लगी। पड़ोसिनें दामाद को देखने और रिश्ते के अनुसार दामाद का उपहास करने के लिए अंतःपुर में एकत्रित हुईं। आनंद, लज्जा, आशंका, और एक अनिश्चित, अनिर्देश्य 'न-जाने-क्या-होगा' के भाव से विभा का हृदय उथल-पुथल हो रहा था, उसका मुँह और कान लाल हो गए थे, और उसके हाथ-पैर ठंडे पड़ गए थे। यह कष्ट है या सुख, कौन जाने!

दामाद अंतःपुर में आए हैं। डंक मारने वाली सुंदरियों के झुंड की तरह स्त्रियों ने चारों ओर से उन पर आक्रमण कर दिया। चारों ओर हँसी का कोलाहल मच गया। चारों ओर से कोकिल-कंठों से तीव्र उपहास, मृणाल-जैसी भुजाओं से कठोर प्रताड़ना, और चंपक-जैसी उँगलियों के चाँद-जैसे नाखूनों से तीखी चुभन चलने लगी। जब रामचंद्र राय अत्यंत व्याकुल हो गए, तब एक प्रौढ़ा स्त्री आकर उनका पक्ष लेकर बैठ गई। वह कठोर स्वर में ऐसी कटी-कटी बातें करने लगी और धीरे-धीरे उसके मुँह से ऐसी अशिष्ट बातें निकलने लगीं कि राजमहल की स्त्रियों के मुँह एक तरह से बंद हो गए। उसके सामने ठाकदीदी भी चुप हो गईं। विमलादीदी कमरे से उठकर चली गईं। केवल भूतो की माँ ने उसे खूब खरी-खोटी सुनाई। जब उक्त भूतो की माँ का मुँह खूब चल रहा था, तब उस प्रौढ़ा ने उससे कहा था, “अरी माँ, तुम्हारा मुँह नहीं है, एक झाड़ू है!” भूतो की माँ ने तुरंत कहा, “और री, तेरा मुँह तो कूड़ाघर है, इतना झाड़ा फिर भी साफ़ नहीं हुआ!” यह कहकर वह गुस्से में गस्-गस् करती हुई चली गई। एक-एक करके कमरा खाली हो गया, रामचंद्र राय को राहत मिली!

2 रामचंद्र राय के मृत्युदंड का आदेश

तब वह प्रौढ़ा घर से निकलकर महिषी के कक्ष में उपस्थित हुई। वहाँ महिषी दास-दासियों को खिला रही थीं। राममोहन भी एक तरफ बैठकर खा रहा था। उस प्रौढ़ा ने महिषी के पास आकर, उन्हें ध्यान से देखकर कहा, “यह रहीं निकषा जननी!” सुनते ही राममोहन चौंक उठा और उसने प्रौढ़ा के चेहरे की ओर देखा। तुरंत भोजन छोड़कर, वह बाघ की तरह उछला और उसके दोनों हाथ अपनी वज्र मुट्ठी में पकड़कर वज्र स्वर में बोला, “मैं तो तुम्हें पहचानता हूँ, ठाकुर!” यह कहकर उसने उसके सिर से वस्त्र खींचकर हटा दिया। और कोई नहीं, रमाई ठाकुर! राममोहन क्रोध से काँपने लगा, उसने अपने शरीर से चादर उतार फेंकी; दोनों हाथों से बड़ी सहजता से रमाई को हवा में उठा लिया और कहा, “आज मेरे हाथों तेरी मौत लिखी है!” यह कहकर उसने उसे हवा में एक-दो चक्कर घुमाया। महिषी दौड़कर आईं और बोलीं, “राममोहन, यह क्या कर रहा है?” रमाई ने कातर स्वर में कहा, “दुहाई है बाबा, ब्रह्महत्या मत करो!” चारों ओर से भारी कोलाहल मच गया। तब राममोहन ने रमाई को ज़मीन पर उतारकर काँपते-काँपते कहा, “अभागे, तुझे मरने के लिए और कोई जगह नहीं मिली?”

रमाई ने कहा, “महाराज ने मुझे आदेश दिया है।” राममोहन चिल्लाया, “क्या कहा, नमकहराम? फिर ऐसी बात कही तो इसी पत्थर के फर्श पर तेरा मुँह रगड़ दूँगा!” यह कहकर उसने उसका गला दबा दिया।

रमाई चीख उठा। तब राममोहन ने छोटे कद के रमाई को चादर से बाँधकर, एक बोरे की तरह लटकाया और अंतःपुर से बाहर निकल गया।

देखते-ही-देखते यह बात काफी फैल गई। तब तक रात के दो पहर बीत चुके थे। राजा के साले ने आकर उसी रात प्रतापादित्य को समाचार दिया कि दामाद, रमाई भांड को स्त्री वेश में अंतःपुर में ले गए हैं! वहाँ उसने महल की स्त्रियों और यहाँ तक कि महिषी का भी उपहास किया है।

तब प्रतापादित्य का रूप अत्यंत भयंकर हो गया। क्रोध से उनका सारा शरीर काँप उठा। वह फूले हुए अयाल वाले सिंह की तरह बिस्तर से उठ बैठे। उन्होंने कहा, “लछमन सरदार को बुलाओ।” लछमन सरदार से कहा, “आज रात मैं रामचंद्र राय का कटा हुआ सिर देखना चाहता हूँ!” उसने तुरंत सलाम करके कहा, “जो हुक्म, महाराज!” तुरंत उनका साला उनके पैरों पर गिर पड़ा और बोला, “महाराज, क्षमा करें, एक बार विभा के बारे में सोचें। ऐसा काम न करें!” प्रतापादित्य ने फिर से दृढ़ स्वर में कहा, “आज रात के अंदर ही मुझे रामचंद्र राय का सिर चाहिए!” उनके साले ने उनके पैर पकड़कर कहा, “महाराज, आज वे अंतःपुर में सोए हैं, क्षमा करें, महाराज क्षमा करें!” तब प्रतापादित्य कुछ क्षण चुप रहकर बोले, “लछमन, सुनो, कल सुबह जब रामचंद्र राय अंतःपुर से बाहर निकलेंगे, तब उन्हें मार डालना, यह तुम्हारा आदेश है।” साले ने देखा कि उसने जितना सोचा था, बात उससे कहीं ज़्यादा बढ़ गई है। वह उसी रात चुपके से आकर विभा के शयनकक्ष के द्वार पर दस्तक देने लगा।

तब दूर से दूसरे पहर की शहनाई बज रही थी। निस्तब्ध रात में वह शहनाई की ध्वनि, चाँदनी और दक्षिणी हवा के साथ मिलकर सोए हुए प्राणों में सपनों का सृजन कर रही थी। विभा के शयनकक्ष की खुली खिड़की से चाँदनी की रोशनी बिस्तर पर पड़ रही थी, रामचंद्र राय नींद में डूबे हुए थे। विभा उठकर बैठी थी और चुपचाप गाल पर हाथ रखकर सोच रही थी। चाँदनी की ओर देखते हुए उसकी आँखों से आँसू की दो-एक बूँदें टपक पड़ी थीं। शायद जैसा उसने सोचा था, वैसा नहीं हुआ था। उसका मन रो रहा था। इतने दिनों से जिस दिन की प्रतीक्षा थी, वह दिन तो आज आ गया था।

रामचंद्र राय बिस्तर पर लेटने के बाद से विभा से एक भी शब्द नहीं बोले थे। प्रतापादित्य ने उनका अपमान किया था—वह प्रतापादित्य का अपमान कैसे करें? हाँ, विभा की उपेक्षा करके। वह यह जताना चाहते थे, “तुम तो यशोर के प्रतापादित्य की बेटी हो, चंद्रद्वीप के राजा रामचंद्र राय के बगल में क्या तुम शोभा देती हो?” यही तय करके वह करवट लेकर सो गए थे और फिर उन्होंने करवट नहीं बदली थी। सारा मान-अभिमान विभा के प्रति ही था। विभा जागकर बैठी सोच रही थी। कभी चाँदनी की ओर देख रही थी, कभी अपने पति के चेहरे की ओर। उसका हृदय काँप-काँप उठता था और बीच-बीच में लंबी साँसें निकल रही थीं—मन में बड़ी पीड़ा हो रही थी। अचानक रामचंद्र की नींद टूट गई। उन्होंने अचानक देखा कि विभा चुपचाप बैठी रो रही है। नींद से जागने के उस पहले क्षण में, जब अपमान की स्मृति अभी जागी नहीं थी, गहरी नींद के बाद मन की स्वस्थ अवस्था लौट आई थी, क्रोध का भाव जा चुका था, तब अचानक विभा का वह आँसुओं से भरा करुण, मासूम चेहरा देखकर उनके मन में करुणा जाग उठी। उन्होंने विभा का हाथ पकड़कर कहा, “विभा, रो रही हो!” विभा व्याकुल हो उठी। विभा कुछ कह न सकी, उसे कुछ दिखाई न दिया, वह लेट गई। तब रामचंद्र राय उठकर बैठ गए और धीरे-धीरे विभा का सिर अपनी गोद में रख लिया और उसके आँसू पोंछ दिए। तभी किसी ने दरवाज़े पर दस्तक दी। रामचंद्र बोल उठे, “कौन?” बाहर से उत्तर आया, “तुरंत दरवाज़ा खोलो!”

1 Ramchandra Ray and the Teasing of the Women

When Rammohan Mal entered the inner quarters, bowed to Vibha, and said, “Ma, I came to see you for a moment,” Vibha’s heart filled with great delight. She was very fond of Rammohan. Carrying the various burdens of his duties as a relative, Rammohan would often come from Chandradwip to Jessore. Even when there was no need, he would come to see Vibha whenever he had a chance. Vibha felt no shyness with Rammohan. When the old, strong, tall Rammohan would stand before her calling her “Ma,” there was such a pure, simple, unadorned affection in him that Vibha felt like a mere child in his presence. Vibha asked him, “Mohan, why haven’t you come in so long?”

Rammohan replied, “Well, Ma, ‘a son may be a bad son, but a mother is never a bad mother.’ When did you ever think of me? I told myself, I will not go unless Ma calls for me; let’s see how long it takes for her to remember! But alas, you didn’t remember me even once!”

Vibha found herself in a great fix. She couldn’t properly explain why she hadn’t called. Besides, she felt there was a flaw somewhere in the logic of his statement that not calling him meant she hadn’t thought of him, yet she couldn’t quite articulate it.

Seeing Vibha’s predicament, Rammohan laughed and said, “No, Ma, I couldn’t come because I didn’t have the time.”

Vibha said, “Mohan, sit down; tell me stories of your land.”

Rammohan sat. He began to describe Chandradwip. With her hand on her cheek, Vibha listened with rapt attention. As she heard the description of Chandradwip, so many fantasies awakened in her little heart; the number of castles she built in the sky that day was beyond count. When Rammohan told the story of how, during last year's monsoon flood, his entire house was washed away; how just before dusk, he alone, carrying his elderly mother on his back, had swum to the spire of a temple, and how the two of them had spent the entire night there—what a tremor went through Vibha’s small chest.

When the story was over, Rammohan said, “Ma, I have brought four conch shell bangles for you. You must wear them on those hands, and I will watch.”

Vibha took off her four gold bangles and put on the shell ones. She then went to her mother, smiling, and said, “Ma, Mohan has taken off your bangles and made me wear these four shell bangles.”

Far from being displeased, the Mahishi laughed and said, “Well, it’s a fine adornment, it suits you very well.”

Rammohan became extremely encouraged and proud. The Mahishi had him summoned and personally supervised his meal. After he had eaten to his heart’s content, she was very pleased and said, “Mohan, now sing that Agamani song of yours.” Looking at Vibha, Rammohan sang;

“I haven’t seen you all year, Ma, what kind of mother are you?

Losing the star of my eye, my pupils have gone blind!

Have you come, O stone-hearted one?

I want to fill my eyes with the sight of you,

For nothing can stop, Ma, this wretched stream from my eyes!”

Tears came to Rammohan’s eyes, and the Mahishi, looking at Vibha’s face, also wiped away her tears. The Agamani song reminded her of Vijaya.

Gradually, evening descended. The crowd of palace ladies began to grow. Neighboring women gathered in the inner quarters to see the son-in-law and, as per their relationship, to tease him. Joy, shyness, apprehension, a vague, uncertain feeling of ‘what-is-going-to-happen’ churned in Vibha’s heart. Her face and ears turned red, and her hands and feet grew cold. Who knows if this was pain or pleasure!

The son-in-law had entered the inner quarters. The women, like a swarm of stinging beauties, attacked him from all sides. A clamor of laughter arose all around. From every direction, a sharp mockery from cuckoo-throats, harsh blows from lotus-stalk arms, and the sharp pinching of champak-fingers' moon-like nails commenced. Just as Ramchandra Ray had become utterly overwhelmed, a middle-aged woman came and took his side. She began to speak such cutting words in a harsh voice, and gradually such vulgarities began to emerge from her mouth that the palace ladies were more or less silenced. Even Thakdidi fell silent before her. Vimaladidi got up and left the room. Only Bhuto’s mother gave her a piece of her mind. While the aforementioned Bhuto’s mother’s mouth was running at full tilt, the middle-aged woman said to her, “My goodness, that’s not a mouth you have, it’s a whole broom!” Bhuto’s mother retorted at once, “And wench, your mouth is a garbage heap; I’ve swept it so much and it’s still not clean!” Saying this, she stomped away. One by one, the room emptied. Ramchandra Ray found some peace!

2 The Order for Ramchandra Ray's Execution

The middle-aged woman then left the chamber and went to the Mahishi's room. The Mahishi was there, feeding the servants. Rammohan was also sitting to one side, eating. The middle-aged woman approached the Mahishi, observed her, and said, “So, it is Mother Nikasha!” The moment he heard this, Rammohan started and stared at the woman's face. Instantly abandoning his meal, he leapt like a tiger, seized her two hands in an iron grip, and roared in a thunderous voice, “I know you, Thakur!” With that, he pulled the cloth from her head. It was none other than Ramai Thakur! Rammohan began to tremble with rage and threw off his shawl. With both hands, he effortlessly lifted Ramai into the air, declaring, “Today you will die by my hands!” and swung him around in the air once or twice. The Mahishi ran over, crying, “Rammohan, what are you doing?” Ramai pleaded in a pitiful voice, “I beg you, father, do not commit the sin of killing a Brahmin!” A great commotion arose from all sides. Rammohan then lowered Ramai to the ground and, still trembling, said, “You wretch, could you find no other place to die?”

Ramai said, “The Maharaj has ordered me.” Rammohan exclaimed, “What did you say, you traitor? If you say such a thing again, I will grind your face on this stone floor!” and he seized him by the throat.

Ramai cried out in pain. Then Rammohan tied the short-statured Ramai up with a shawl, slung him over his shoulder like a sack, and left the inner quarters.

In no time, the news had spread quite far. It was past the second prahar of the night. The king’s brother-in-law came that night and informed Pratapaditya that his son-in-law had brought Ramai Bhand into the inner quarters disguised as a woman! There, he had mocked the women of the court, even the Mahishi.

At this, Pratapaditya’s expression became utterly terrifying. His whole body was agitated with rage. He sat up from his bed like a lion with a bristling mane. He commanded, “Call Lachhman Sardar.” To Lachhman Sardar he said, “Tonight, I want to see Ramchandra Ray's severed head!” The man immediately saluted and said, “As you command, Maharaj!” Instantly, his brother-in-law fell at his feet, pleading, “Maharaj, grant him pardon, think of Vibha for a moment. Do not do such a thing!” Pratapaditya repeated in a firm voice, “I want Ramchandra Ray’s head by the end of the night!” His brother-in-law clung to his feet and said, “Maharaj, they are sleeping in the inner quarters tonight, grant him pardon, Maharaj, grant him pardon!” Pratapaditya remained silent for a moment and then said, “Lachhman, listen. Tomorrow morning, when Ramchandra Ray leaves the inner quarters, you will kill him. That is your order.” The brother-in-law saw that things had gone much further than he had imagined. That night, he crept quietly to the door of Vibha’s bedchamber and knocked.

From a distance, the nahabat for the second prahar was playing. In the silent night, the sound of the nahabat, mingling with the moonlight and the southern breeze, was creating dreams within sleeping souls. Through the open window of Vibha’s bedchamber, the moonlight fell upon the bed. Ramchandra Ray was deep in sleep. Vibha had sat up and was thinking quietly, her hand on her cheek. As she gazed at the moonlight, a few teardrops fell from her eyes. Perhaps things had not turned out exactly as she had imagined. Her heart was weeping. The day she had awaited for so long had finally arrived.

Ever since lying down on the bed, Ramchandra Ray had not spoken a single word to Vibha. Pratapaditya had insulted him—so how would he insult Pratapaditya? Why, by ignoring Vibha. He wanted to convey, “You are the daughter of Pratapaditya of Jessore; do you really belong beside Ramchandra Ray, the King of Chandradwip?” Having decided this, he had turned to his side and had not moved since. All his wounded pride and resentment were directed towards Vibha. Vibha sat awake, thinking. She glanced once at the moonlight, then at her husband’s face. Her chest heaved with intermittent deep sighs—a great pain had struck her heart. Suddenly, Ramchandra’s sleep broke. He suddenly saw Vibha sitting silently, crying. In that first moment upon waking, when the memory of the humiliation had not yet resurfaced, when a sense of well-being had returned after a deep sleep and his anger had faded, the sudden sight of Vibha's tear-stained, sorrowful, innocent face awakened a sudden pity in his heart. Taking her hand, he said, “Vibha, are you crying?” Vibha was overcome with emotion. Vibha could not speak, Vibha could not see through her tears, Vibha lay down. Then Ramchandra Ray sat up, gently took Vibha's head, and placed it on his lap, wiping away her tears. Just then, someone knocked on the door. Ramchandra called out, “Who is it?” A voice replied from outside, “Open the door at once!”

1 ラーマチャンドラ・ライと女性たちのからかい

ラムモハン・マールが奥御殿に来てビバに一礼し、「奥方様、一度お目にかかりに参りました」と言ったとき、ビバは大変喜んだ。彼女はラムモハンが大好きだった。親戚付き合いの様々な用事を担って、ラムモハンはしばしばチャンドラドウィープからジョソールへ来ていた。用がなくとも、暇を見つけては一度ビバに会いに来た。ビバはラムモハンに少しも恥ずかしがらなかった。年老い、屈強で、長身のラムモハンが「奥方様」と呼んで現れると、そこには純粋で、素朴で、飾りのない愛情が満ちており、ビバは彼の前では自分が全くの幼子のように感じた。ビバは彼に言った。「モーハン、お前はどうしてこんなに長い間来なかったの?」

ラムモハンは言った。「それは奥方様、『悪い息子はいても、悪い母はおりませぬ』と申します。あなたが私のことをいつ思い出してくださるのかと。私は心の中で、奥方様がお呼びにならなければ行くまい、いつになったら思い出されるか見てやろう、と思っておりました。しかし、どうでしょう、一度もお思い出しにならなかったではありませんか!」

ビバは非常に困ってしまった。なぜ呼ばなかったのか、うまく説明できなかった。その上、呼ばなかったからといって思い出さなかったわけではない、という言葉のどこかに論理の誤りがあるように思えるのだが、うまく説明して言い返すことができない。

ビバの困った様子を見て、ラムモハンは笑って言った。「いえいえ奥方様、暇がなかったものですから、来ることができなかったのです。」

ビバは言った。「モーハン、お前、座りなさい。お前の国の話を聞かせて。」

ラムモハンは座った。チャンドラドウィープの描写を始めた。ビバは頬杖をついて一心に聴いていた。チャンドラドウィープの話を聞いているうちに、彼女の心の中にはどれほどの想像が湧き上がったことか。その日、彼女は空の上にどれほどの家を建てたことか、数え切れないほどだった。ラムモハンが、去年の雨季の洪水で家も何もかも流されてしまった話をしたとき、夕暮れ時、彼が一人で老いた母を背負って泳ぎ、寺院の尖塔に登り、二人で一晩中そこで過ごしたという話をしたとき――ビバの小さな胸はどれほど激しく高鳴ったことだろう。

話が終わると、ラムモハンは言った。「奥方様、あなたのためにシャンカ(法螺貝の腕輪)を四本持ってきました。その手にはめていただきたいのです。私が見たいのです。」

ビバは金の腕輪を四本外し、シャンカをはめた。そして笑いながら母のところへ行き、言った。「お母様、モーハンがあなたの腕輪を外させて、私にこのシャンカを四本はめさせてくれたのです。」

王妃は少しも不快な顔をせず、笑って言った。「まあ、とてもよく似合っているわ。素敵よ。」

ラムモハンは非常に意気揚々とし、誇らしげになった。王妃は彼を呼び寄せ、自らそばにいて食事をさせた。彼が満足して食事を終えると、彼女はたいそう喜んで言った。「モーハン、今度はお前のあのアガマニーの歌を歌っておくれ。」ラムモハンはビバの方を見て歌った。――

「一年中会えぬ母よ、あなたはどんな方か、

瞳の星を失い、私の瞳は盲目になった!

来たのか、石の心を持つ者よ、

心ゆくまであなたを見つめよう、

どうしても止まらないのだ、母よ、この呪われた涙の流れが!」

ラムモハンの目に涙が浮かんだ。王妃もビバの顔を見て、涙を拭った。アガマニーの歌は、彼女にビジョヤのことを思い出させた。

次第に夕暮れが近づいてきた。奥御殿の女性たちの数は増え始めた。近隣の女性たちが、婿君を一目見ようと、また関係に応じて婿君をからかうために奥御殿に集まってきた。喜び、恥じらい、不安、そして不確かで、言葉にできない「いったいどうなるのだろう」という思いでビバの心はかき乱され、顔や耳は真っ赤になり、手足は冷たくなっていた。これが苦しみなのか喜びなのか、誰が知ろう!

婿君が奥御殿にやって来た。針を持つ美しい蜂の群れのような女たちが、四方から彼を攻撃した。四方で笑い声が沸き起こった。四方から、鶯のような声での辛辣なからかい、蓮の茎のような腕での厳しい突き、チャンパカの花のような指の月の爪での鋭い攻撃が続いた。ラーマチャンドラ・ライがすっかり参ってしまったとき、一人の年配の女性がやって来て、彼の味方になって座った。彼女は厳しい声で、実に辛辣な言葉を吐き、次第にその口からはあまりにも下品な言葉が飛び出し始めたので、奥御殿の女性たちの口はほとんど閉ざされてしまった。彼女の前ではタークディディも黙り込んでしまった。ビマラの姉は部屋から出て行ってしまった。ただブートの母だけが、彼女にきつい一言を浴びせた。例のブートの母の口が絶好調のとき、その年配の女性は彼女に言った。「あらまあ、あんたの口は口じゃないね、箒だよ!」ブートの母は即座に言い返した。「だったらお前さんの口はゴミ溜めさ!いくら掃いても綺麗にならないじゃないか!」そう言って、ずかずかと出て行ってしまった。一人、また一人と部屋は空になり、ラーマチャンドラ・ライは休息を得た!

2 ラーマチャンドラ・ライの死刑命令

その時、その老婦人は部屋を出て王妃の部屋へやって来た。そこでは王妃が召使いたちに食事を与えており、ラムモハンも片隅に座って食事をしていた。その老婦人は、王妃に近づき、じっと見つめて言った。「これはこれは、ニカシャ様!」それを聞くやいなや、ラムモハンははっとし、老婦人の顔を見つめた。たちまち食事を放り出し、虎のように飛びかかると、その両手を鉄の拳で握りしめ、雷鳴のような声で叫んだ。「貴様が誰だか、分かっているぞ!」そう言うと、彼女の頭の布を剥ぎ取った。それは他の誰でもない、ラマイ・タクールであった! ラムモハンは怒りに震え、肩からショールを脱ぎ捨てた。両手で軽々とラマイを宙に持ち上げると、言った。「今日こそ、この俺の手でお前を殺してやる!」そう言って、彼を空中で一、二度振り回した。王妃が駆け寄ってきて言った。「ラムモハン、何をしているのです!」ラマイは哀れな声で言った。「どうかお許しを。バラモン殺しの大罪を犯さないでください!」四方から大変な騒ぎが持ち上がった。そこでラムモハンはラマイを地面に降ろし、震えながら言った。「この人でなしめ、他に死に場所がなかったのか?」

ラマイは言った。「マハラジャが私にお命じになったのです。」ラムモハンは叫んだ。「何だと、この裏切り者め!もう一度そんなことを言ってみろ、この石畳で顔をすり潰してくれるぞ!」そう言って、彼の喉を締め上げた。

ラマイは苦痛の叫びを上げた。するとラムモハンは小柄なラマイをショールで縛り上げ、袋のように担いで奥御殿から出て行った。

あっという間に、その話はかなり広まっていた。時はすでに夜半を過ぎていた。王の義弟がその夜のうちにプラタパディティヤに知らせに来た。婿君が道化のラマイ・バンドを女装させて奥御殿に連れ込み、そこで彼が女官たち、さらには王妃までもからかった、と。

その時、プラタパディティヤの形相は凄まじく恐ろしいものとなった。怒りでその全身がわなないた。逆立ったたてがみを持つ獅子のように寝台から起き上がると、言った。「ラクマン・サルダールを呼べ。」ラクマン・サルダールに言った。「今宵、ラーマチャンドラ・ライの切り落とされた首が見たい!」彼はすぐに敬礼し、「御意のままに、マハラジャ!」と答えた。すぐに義弟が王の足元にひれ伏し、言った。「マハラジャ、お許しください。どうかビバ様のことをお考えください。そのようなことはなさらないでください!」プラタパディティヤは再び強い口調で言った。「今夜中にラーマチャンドラ・ライの首が欲しいのだ!」義弟は王の足にすがりついて言った。「マハラジャ、今夜お二人は奥御殿でお休みになっております。お許しください、マハラジャ、お許しください!」するとプラタパディティヤはしばし黙然としていたが、言った。「ラクマン、聞け。明朝、ラーマチャンドラ・ライが奥御殿から出るところを殺せ。お前に命じる。」義弟は、事態が自分が思っていたよりもはるかに深刻になってしまったことを悟った。彼はその夜、ひそかにビバの寝室へ行き、扉を叩いた。

その時、遠くから夜半を告げるナーバットの音が響いていた。静まり返った夜、そのナーバットの音色は、月光と南風に溶け合い、眠れる者たちの魂に夢を紡いでいた。ビバの寝室の開かれた窓からは、月光が寝台の上に差し込んでいた。ラーマチャンドラ・ライは深く眠っている。ビバは起き上がり、静かに頬杖をついて物思いにふけっていた。月光を見つめる彼女の目からは、一、二筋の涙がこぼれ落ちていた。思い描いていたようには、ならなかったのだ。彼女の心は泣いていた。長い間待ちわびていたその日は、今日ついに来たというのに。

ラーマチャンドラ・ライは寝台に入ってから、ビバと一言も口をきいていない。プラタパディティヤが自分を侮辱した――その彼をどうやって侮辱し返すか? そうだ、ビバを無視することで。彼は知らしめたいのだ。「お前はジョソールのプラタパディティヤの娘にすぎん。チャンドラドウィープの王ラーマチャンドラ・ライの隣に、お前がふさわしいと思うか?」と。こう決めてから、彼は背を向けて横になったきり、一度も寝返りを打たなかった。その意地もプライドも、すべてがビバに向けられていた。ビバは眠れずに座って物思いにふけっている。一度は月光に目をやり、また一度は夫の顔に目をやる。胸は震え、時折深いため息が漏れる――心の奥がひどく痛んだ。ふと、ラーマチャンドラの眠りが覚めた。彼は、ビバが黙って座り、泣いているのを見た。寝起きのその最初の瞬間、まだ侮辱の記憶が目覚めておらず、深い眠りの後で心が落ち着き、怒りが消え去っていたその時、ふとビバの涙に濡れた痛々しい幼い顔を見て、彼の心に憐れみが湧き上がった。ビバの手を取って、彼は言った。「ビバ、泣いているのか!」ビバは感情がこみ上げてきた。ビバは言葉を発することもできず、目もよく見えず、そのまま横になった。するとラーマチャンドラ・ライは起き上がり、ゆっくりとビバの頭を膝の上に抱き寄せ、その涙を拭ってやった。その時、扉を叩く者がいた。ラーマチャンドラは言った。「誰だ?」外から返事があった。「すぐに扉を開けろ!」