1
সীতারাম ও রুক্মিণীর সংঘাত
ইতিমধ্যে এক ঘটনা ঘটিয়াছে। যখন সীতারাম দেখিল, উদয়াদিত্যকে কারারুদ্ধ করা হইয়াছে, তখন সে আর হাত পা আছড়াইয়া বাঁচে না। প্রথমেই ত সে রুক্মিণীর বাড়ি গেল। তাহাকে যাহা মুখে আসিল তাহাই বলিল। তাহাকে মারিতে যায় আর কি! কহিল, “সর্ব্বনাশী, তোর ঘরে আগুন জ্বালাইয়া দিব, তোর ভিটায় ঘুঘু চরাইব, আর যুবরাজকে খালাস করিব, তবে আমার নাম সীতারাম! আজই আমি রায়গড়ে চলিলাম, রায়গড় হইতে আসি, তারপরে তোর ঐ কালামুখ লইয়া এই শানের উপরে ঘষিব, তোর মুখে চূণ কালি মাখাইয়া সহর হইতে বাহির করিয়া দিব, তবে জলগ্রহণ করিব!”
রুক্মিণী কিয়ৎক্ষণ অনিমেষ নেত্রে সীতারামের মুখের দিকে চাহিয়া শুনিল, ক্রমে তাহার দাঁতে দাঁতে লাগিল, ঠোঁটে ঠোঁট চাপিল, তাহার হাতের মুষ্টি দৃঢ়বদ্ধ হইল, তাহার ঘন কৃষ্ণ ভ্রূযুগলের উপর মেঘ ঘনাইয়া আসিল,তাহার ঘন-কৃষ্ণ চক্ষু-তারকায় বিদ্যুৎ সঞ্চিত হইতে লাগিল, তাহার সমস্ত শরীর নিস্পন্দ হইয়া গেল; ক্রমে তাহার স্থূল অধরোষ্ঠ কাঁপিতে লাগিল, ঘন ভ্রূ তরঙ্গিত হইল, অন্ধকার চক্ষে বিদ্যুৎ খেলাইতে লাগিল, কেশরাশি ফুলিয়া উঠিল, হাত পা থর থর করিয়া কাঁপিতে আরম্ভ করিল। একটা পৈশাচিক অভিশাপ, একটা সর্ব্বাঙ্গস্ফীত কম্পমান হিংসা সীতারামের মাথার উপরে যেন পড়ে পড়ে। সেই মুহূর্ত্তে সীতারাম কুটীর হইতে বাহির হইয়া গেল। ক্রমে যখন রুক্মিণীর মুষ্টি শিথিল হইয়া আসিল, দাঁত খুলিয়া গেল, অধরোষ্ঠ পৃথক হইল, কুঞ্চিত ভ্রূ প্রসারিত হইল, তখন সে বসিয়া পড়িল, কহিল, “বটে! যুবরাজ তোমারই বটে। যুবরাজের বিপদ হইয়াছে বলিয়া তোমার গায়ে বড় লাগিয়াছে—যেন যুবরাজ আমার কেহ নয়। পোড়ারমুখো, এটা জানিস্ না সে যে আমারই যুবরাজ, আমিই তাহার ভাল করিতে পারি আর আমিই তাহার মন্দ করিতে পারি। আমার যুবরাজকে তুই কারামুক্ত করিতে চাহিস্। দেখিব কেমন তাহা পারিস্।”
সীতারাম সেই দিনই রায়গড়ে চলিয়া গেল।
2
বসন্ত রায়ের একাকীত্বের গান
বিকালবেলা বসন্তরায় রায়গড়ের প্রাসাদের বারান্দায় বসিয়া রহিয়াছেন। সম্মুখে এক প্রশস্ত মাঠ দেখা যাইতেছে। মাঠের প্রান্তে খালের পরপারে একটি আম্রবনের মধ্যে সূর্য্য অস্ত যাইতেছেন। বসন্তরায়ের হাতে তাঁহার চিরসহচর সে সেতারটি আর নাই। বৃদ্ধ সেই অস্তমান সূর্য্যের দিকে চাহিয়া আপনার মনে গুন্ গুন্ করিয়া গান গাহিতেছেন।
আমিই শুধু রৈনু বাকি।
যা ছিল তা গেল চলে, রইল যা’ তা, কেবল ফাঁকি।
আমার ব’লে ছিল যারা,
আর ত তারা দেয় না সাড়া,
কোথায় তারা, কোথায় তারা? কেঁদে কেঁদে কারে ডাকি’।
বল্ দেখি মা, শুধাই তোরে,
“আমার” কিছু রাখলি নেরে?
আমি কেবল আমায় নিয়ে কোন্ প্রাণেতে বেঁচে থাকি।
কে জানে কি ভাবিয়া বৃদ্ধ এই গান গাহিতে ছিলেন। বুঝি তাঁহার মনে হইতেছিল, গান গাহিতেছি, কিন্তু যাহাদের গান শুনাইতাম, তাহারা যে নাই। গান আপনি আসে, কিন্তু গান গাহিয়া যে আর সুখ নাই। এখনো আনন্দ ভুলি নাই, কিন্তু যখনি আনন্দ জন্মিত, তখনি যাহাদের আলিঙ্গন করিতে সাধ যাইত, তাহারা কোথায়? যে দিন প্রভাতে রায়গড়ে ঐ তাল গাছটার উপরে মেঘ করিত, মনটা আনন্দে নাচিয়া উঠিত, সেই দিনই আমি যাহাদের দেখিতে যশোরে যাত্রা করিতাম, তাহাদের কি আর দেখিতে পাইব না? এখনো এক একবার মনটা তেমনি আনন্দে নাচিয়া উঠে কিন্তু হা—এইসব বুঝি ভাবিয়া আজ বিকাল বেলায় অস্তমান সূর্য্যের দিকে চাহিয়া বৃদ্ধ বসন্তরায়ের মুখে আপনা আপনি গান উঠিয়াছে—“আমিই শুধু রৈনু বাকি।
3
বসন্ত রায়ের উদ্বেগ ও সীতারামের আগমন
এমন সময়ে খাঁ সাহেব আসিয়া এক মস্ত সেলাম করিল। খাঁ সাহেবকে দেখিয়া বসন্তরায় উৎফুল্ল হইয়া কহিলেন—“খাঁ সাহেব, এস এস!” অধিকতর নিকটে গিয়া ব্যস্তসমস্ত হইয়া কহিলেন, “সাহেব তোমার মুখ অমন মলিন দেখিতেছি কেন? মেজাজ ভাল আছে ত?”
খাঁ সাহেব—“মেজাজের কথা আর জিজ্ঞাসা করিবেন না, মহারাজ। আপনাকে মলিন দেখিয়া আমাদের মনে আর সুখ নাই! একটি বয়েদ আছে—‘রাত্রি বলে আমি কেহই নই, আমি যাহাকে মাথায় করিয়া রাখিয়াছি সেই চাঁদ, তাহারি সহিত আমি একত্রে হাসি, একত্রে ম্লান হইয়া যাই।’—মহারাজ, আমরাই বা কে, আপনি না হাসিলে আমাদের হাসিবার ক্ষমতা কি? আমাদের আর সুই নাই, জনাব!”
বসন্তরায় ব্যগ্র হইয়া কহিলেন, “সে কি কথা সাহেব? আমার ত অসুখ কিছুই নাই,—আমি নিজেকে দেখিয়া নিজে হাসি—নিজের আনন্দে নিজে থাকি—আমার অসুখ কি খাঁ সাহেব?”
খাঁ সাহেব—“মহারাজ এখন আপনার আর তেমন গান বাদ্য শুনা যায় না।”
বসন্তরায় সহসা ঈষৎ গম্ভীর হইয়া কহিলেন, “আমার গান শুনিবে সাহেব?”
“আমিই শুধু রইনু বাকি।
যা ছিল তা গেল চলে,
রইল যা’ তা কেবল ফাঁকি।”
খাঁ সাহেব—“আপনি আর সে সেতার বাজান কই? আপনার সে সেতার কোথায়?”
বসন্তরায় ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন—“সে সেতার কি নাই, তাহা নয়। সেতার আছে, শুধু তাহার তার ছিঁড়িয়া গেছে, তাহাতে আর সুর মেলে না।” বলিয়া আম্রবনের দিকে চাহিয়া মাথায় হাত বুলাইতে লাগিলেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে বসন্তরায় বলিয়া উঠিলেন, খাঁ সাহেব একটা গান গাও না—একটা গান গাও, গাও—“তাজবে তাজ নওবে নও।”
খাঁ সাহেব গান ধরিলেন:—
“তাজবে তাজ নওবে নও।”
দেখিতে দেখিতে বসন্তরায় মাতিয়া উঠিলেন—আর বসিয়া থাকিতে পারিলেন না! উঠিয়া দাঁড়াইলেন, একত্রে গাহিতে লাগিলেন, “তাজবে তাজ, নওবে নও।” ঘন ঘন তাল দিতে লাগিলেন, এবং বারবার করিয়া গাইতে লাগিলেন। গাহিতে গাহিতে সূর্য্য অস্ত গেল, অন্ধকার হইয়া আসিল, রাখালেরা বাড়িমুখে আসিতে আসিতে গান ধরিল। এমন সময়ে আসিয়া সীতারাম “মহারাজের জয় হৌক” বলিয়া প্রণাম করিল। বসন্তরায় একেবারে চমকিত হইয়া, তৎক্ষণাৎ গান বন্ধ করিয়া তাড়াতাড়ি তাহার কাছে আসিয়া তাহার গায়ে হাত দিয়া কহিলেন, “আরে সীতারাম যে! ভাল আছিস্ ত? দাদা কেমন আছে? দিদি কোথায়? খবর ভাল ত?”
4
উদয়াদিত্যের কারাবাসের খবরে বসন্ত রায়ের শোক
খাঁ সাহেব চলিয়া গেল। সীতারাম কহিল, “একে একে নিবেদন করিতেছি মহারাজ।” বলিয়া একে একে যুবরাজের কারারোধের কথা কহিল। সীতারাম আগাগোড়া সত্য কথা বলে নাই। যে কারণে উদয় আদিত্যের কারারোধ ঘটিয়াছিল, সে কারণটা তেমন স্পষ্ট করিয়া বলে নাই।
বসন্তরায়ের মাথায় আকাশ ভাঙিয়া পড়িল, তিনি সীতারামের হাত দৃঢ় করিয়া ধরিলেন। তাঁহার ভ্রূ ঊর্দ্ধে উঠিল, তাঁহার চক্ষু প্রসারিত হইয়া গেল, তাঁহার অধরোষ্ঠ বিভিন্ন হইয়া গেল—নির্ণিমেষ নেত্রে সীতারামের মুখের দিকে চাহিয়া কহিলেন, “অ্যাঁ?”
সীতারাম কহিল, “আজ্ঞা হাঁ মহারাজ।” কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া বসন্তরায় কহিলেন “সীতারাম!”
সীতারাম—“মহারাজ!”
বসন্তরায়—“তাহা হইলে দাদা এখন কোথায়?”
সীতারাম—“আজ্ঞা তিনি কারাগারে!”
বসন্তরায় মাথায় হাত বুলাইতে লাগিলেন। উদয়াদিত্য কারাগারে, এ কথাটা বুঝি তাঁহার মাথায় ভাল করিয়া বসিতেছে না, কিছুতেই কল্পনা করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। আবার কিছুক্ষণ বাদে সীতারামের হাত ধরিয়া কহিলেন—“সীতারাম!”
সীতারাম—“আজ্ঞা মহারাজ!”
বসন্তরায়—“তাহা হইলে দাদা এখন কি করিতেছে?”
সীতারাম—“কি আর করিবেন! তিনি কারাগারেই আছেন।”
বসন্তরায়—“তাঁহাকে কি সকলে বন্ধ করিয়া রাখিয়াছে?”
সীতারাম—“আজ্ঞা হাঁ মহারাজ।”
বসন্তরায়—“তাহাকে কি কেহ একবার বাহির হইতে দেয় না?”
সীতারাম—“আজ্ঞা না।”
বসন্তরায়—“সে একলা কারাগারে বসিয়া আছে?”
বসন্তরায় একথাগুলি বিশেষ কোন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেন নাই। আপনা-আপনি বলিতেছিলেন। সীতারাম তাহা বুঝিতে পারে নাই—সে উত্তর করিল—“হাঁ মহারাজ।”,
বসন্তরায় বলিয়া উঠিলেন—“দাদা, তুই আমার কাছে আয়রে। তোকে কেহ চিনিল না।”
1
সীতারাম ও রুক্মিণীর সংঘাত
এরই মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে। যখন সীতারাম দেখল যে উদয়াদিত্যকে কারারুদ্ধ করা হয়েছে, তখন সে রাগে-দুঃখে প্রায় দিশেহারা হয়ে গেল। সে প্রথমেই রুক্মিণীর বাড়ি গেল। তাকে যা মুখে এল তাই বলল। তাকে প্রায় মেরেই ফেলে আর কি! বলল, “সর্বনাশী, তোর ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেব, তোর ভিটেয় ঘুঘু চরাব। যুবরাজকে মুক্ত করেই ছাড়ব, তবেই আমার নাম সীতারাম! আজই আমি রায়গড়ে যাচ্ছি। রায়গড় থেকে ফিরে এসে তোর ওই কালো মুখ পাথরে ঘষব, তোর মুখে চুনকালি মাখিয়ে শহর থেকে বের করে দেব, তারপরই জলস্পর্শ করব!”
রুক্মিণী কিছুক্ষণ অপলক চোখে সীতারামের মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনল। ধীরে ধীরে সে দাঁতে দাঁত চাপল, তার ঠোঁট দুটো শক্ত হয়ে গেল, হাতের মুঠি দৃঢ়ভাবে বন্ধ হল। তার ঘন কালো ভুরুর উপর যেন মেঘ ঘনিয়ে এল, কালো চোখের মণিতে বিদ্যুৎ জমে উঠল, আর তার সারা শরীর নিস্পন্দ হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তার পুরু ঠোঁট কাঁপতে লাগল, ঘন ভুরুতে ঢেউ খেলে গেল, অন্ধকার চোখে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল, চুলগুলো ফুলে উঠল এবং হাত-পা থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। একটা পৈশাচিক অভিশাপ, সর্বাঙ্গ জুড়ে ফুলে ওঠা এক থরথরে হিংসা যেন সীতারামের মাথার উপর ভেঙে পড়তে চাইল। সেই মুহূর্তেই সীতারাম কুটির থেকে বেরিয়ে গেল। ধীরে ধীরে যখন রুক্মিণীর মুঠি আলগা হয়ে এল, দাঁত খুলে গেল, ঠোঁট আলাদা হল এবং কোঁচকানো ভুরু সোজা হল, তখন সে বসে পড়ল। বলল, “বটে! যুবরাজ যেন তোর একার। যুবরাজের বিপদ হয়েছে বলে তোর খুব গায়ে লেগেছে—যেন যুবরাজ আমার কেউ নয়। পোড়ারমুখো, তুই এটা জানিস না যে, সে আমারই যুবরাজ! আমিই তার ভালো করতে পারি, আবার আমিই তার মন্দ করতে পারি। আমার যুবরাজকে তুই জেল থেকে মুক্ত করতে চাস? দেখব কেমন করে পারিস।”
সীতারাম সেদিনই রায়গড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
2
বসন্ত রায়ের একাকীত্বের গান
বিকেলবেলা বসন্ত রায় রায়গড়ের প্রাসাদের বারান্দায় বসে আছেন। সামনে একটি প্রশস্ত মাঠ দেখা যাচ্ছে। মাঠের শেষে খালের ওপারে একটি আমবাগানের মধ্যে সূর্য অস্ত যাচ্ছেন। বসন্ত রায়ের হাতে তাঁর চিরসঙ্গী সেই সেতারটি আর নেই। বৃদ্ধ সেই অস্তগামী সূর্যের দিকে চেয়ে আপন মনে গুনগুন করে গান গাইছেন।
আমিই শুধু রইলাম বাকি।
যা ছিল তা চলে গেল, যা রইল, তা কেবলই ফাঁকি।
আমার বলে ছিল যারা,
তারা আর তো দেয় না সাড়া,
কোথায় তারা, কোথায় তারা? কেঁদে কেঁদে কাকে ডাকি।
বল দেখি মা, তোকে শুধাই,
আমার বলতে কিছুই কি রাখলি না রে?
আমি শুধু নিজেকে নিয়ে কোন প্রাণে বেঁচে থাকি।
কে জানে কী ভেবে বৃদ্ধ এই গান গাইছিলেন। হয়তো তাঁর মনে হচ্ছিল, গান তো গাইছি, কিন্তু যাদের গান শোনাতাম, তারা যে নেই। গান নিজের থেকেই আসে, কিন্তু গান গেয়ে আর সুখ নেই। এখনও আনন্দ ভুলিনি, কিন্তু যখনই মনে আনন্দ জাগত, তখনই যাদের আলিঙ্গন করতে ইচ্ছে করত, তারা কোথায়? যেদিন সকালে রায়গড়ের ওই তালগাছটার উপর মেঘ জমতো, মনটা আনন্দে নেচে উঠত, সেদিনই আমি যাদের দেখতে যশোরে যেতাম, তাদের কি আর দেখতে পাব না? এখনও মাঝে মাঝে মনটা তেমনি আনন্দে নেচে ওঠে, কিন্তু হায়—এইসব ভেবেই বুঝি আজ বিকেলে অস্তগামী সূর্যের দিকে চেয়ে বৃদ্ধ বসন্ত রায়ের মুখে আপনাআপনিই গানটি ফুটে উঠেছে—‘আমিই শুধু রইলাম বাকি।’
3
বসন্ত রায়ের উদ্বেগ ও সীতারামের আগমন
এমন সময় খাঁ সাহেব এসে এক বিরাট সেলাম জানালেন। খাঁ সাহেবকে দেখে বসন্ত রায় উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “খাঁ সাহেব, আসুন, আসুন!” আরও কাছে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে বললেন, “সাহেব, আপনার মুখ এমন মলিন দেখাচ্ছে কেন? মেজাজ ভালো তো?”
খাঁ সাহেব বললেন, “মেজাজের কথা আর জিজ্ঞেস করবেন না, মহারাজ। আপনাকে বিষণ্ণ দেখে আমাদের মনেও আর আনন্দ নেই! একটা কথা আছে—‘রাত বলে আমি নিজে কেউ নই, আমি যাঁকে মাথায় করে রেখেছি সেই চাঁদ, তাঁর সাথেই আমি একসঙ্গে হাসি, একসঙ্গে ম্লান হয়ে যাই।’—মহারাজ, আমরাই বা কে? আপনি না হাসলে আমাদের হাসার ক্ষমতা কোথায়? আমাদের আর সুখ নেই, জনাব!”
বসন্ত রায় উৎসুক হয়ে বললেন, “এ কী কথা সাহেব? আমার তো কোনো অসুখ নেই। আমি নিজেকে দেখে নিজেই হাসি, নিজের আনন্দে নিজেই থাকি। আমার আবার অসুখ কী, খাঁ সাহেব?”
খাঁ সাহেব বললেন, “মহারাজ, এখন আপনার গান-বাজনা আর তেমন শোনা যায় না।”
বসন্ত রায় হঠাৎ কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমার গান শুনবেন, সাহেব?”
“আমিই শুধু রইলাম বাকি।
যা ছিল তা গেল চলে,
রইল যা, তা কেবল ফাঁকি।”
খাঁ সাহেব বললেন, “আপনি তো আর সেই সেতারটা বাজান না? আপনার সেই সেতারটা কোথায়?”
বসন্ত রায় হালকা হেসে বললেন, “সেই সেতারটা যে নেই, তা নয়। সেতার আছে, শুধু তার ছিঁড়ে গেছে, তাই আর সুর মেলে না।” এই বলে তিনি আমবাগানের দিকে চেয়ে মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর বসন্ত রায় বলে উঠলেন, “খাঁ সাহেব, একটা গান করুন না—একটা গান ধরুন, গান—“তাজবে তাজ নওবে নও।””
খাঁ সাহেব গান ধরলেন:—
“তাজবে তাজ নওবে নও।”
দেখতে দেখতে বসন্ত রায় মেতে উঠলেন—আর বসে থাকতে পারলেন না! উঠে দাঁড়ালেন এবং একসঙ্গে গাইতে লাগলেন, “তাজবে তাজ, নওবে নও।” ঘন ঘন তাল দিতে লাগলেন এবং বারবার গাইতে থাকলেন। গাইতে গাইতে সূর্য অস্ত গেল, অন্ধকার হয়ে এল, রাখালেরা বাড়ির পথে ফিরতে ফিরতে গান ধরল। এমন সময় সীতারাম এসে “মহারাজের জয় হোক” বলে প্রণাম করল। বসন্ত রায় একেবারে চমকে উঠে, সঙ্গে সঙ্গে গান থামিয়ে তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে গায়ে হাত দিয়ে বললেন, “আরে, সীতারাম যে! ভালো আছিস তো? দাদা কেমন আছে? দিদি কোথায়? সব খবর ভালো তো?”
4
উদয়াদিত্যের কারাবাসের খবরে বসন্ত রায়ের শোক
খাঁ সাহেব চলে গেলেন। সীতারাম বলল, “মহারাজ, আমি এক এক করে সব জানাচ্ছি।” এই বলে সে যুবরাজের কারাবাসের কথা এক এক করে জানাল। সীতারাম আগাগোড়া সত্যি কথা বলেনি। যে কারণে উদয়াদিত্যের কারাবাস হয়েছিল, সেই কারণটা সে স্পষ্টভাবে বলল না।
বসন্ত রায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি সীতারামের হাত শক্ত করে ধরলেন। তাঁর ভুরু ওপরে উঠে গেল, চোখ বড় বড় হয়ে গেল, ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গেল—অপলক দৃষ্টিতে সীতারামের মুখের দিকে চেয়ে তিনি বললেন, “অ্যাঁ?”
সীতারাম বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ, মহারাজ।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বসন্ত রায় বললেন, “সীতারাম!”
সীতারাম—“মহারাজ!”
বসন্ত রায়—“তাহলে দাদা এখন কোথায়?”
সীতারাম—“আজ্ঞে, তিনি কারাগারে!”
বসন্ত রায় মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। উদয়াদিত্য কারাগারে—এই কথাটা যেন তাঁর মাথায় ঠিকমতো ঢুকছিল না, তিনি কিছুতেই কল্পনা করতে পারছিলেন না। আবার কিছুক্ষণ পর সীতারামের হাত ধরে বললেন—“সীতারাম!”
সীতারাম—“আজ্ঞে মহারাজ!”
বসন্ত রায়—“তাহলে দাদা এখন কী করছে?”
সীতারাম—“আর কী করবেন! তিনি কারাগারেই আছেন।”
বসন্ত রায়—“ওকে কি সবাই আটকে রেখেছে?”
সীতারাম—“আজ্ঞে হ্যাঁ, মহারাজ।”
বসন্ত রায়—“ওকে কি কেউ একবারও বাইরে আসতে দেয় না?”
সীতারাম—“আজ্ঞে না।”
বসন্ত রায়—“ও একা কারাগারে বসে আছে?”
বসন্ত রায় এই কথাগুলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করছিলেন না। তিনি আপনমনেই বলছিলেন। সীতারাম তা বুঝতে না পেরে উত্তর দিল—“হ্যাঁ মহারাজ।”
বসন্ত রায় বলে উঠলেন—“দাদা, তুই আমার কাছে চলে আয়। তোকে কেউ চিনল না।”
1
सीताराम और रुक्मिणी का टकराव
इसी बीच एक घटना घटी। जब सीताराम ने देखा कि उदयादित्य को कैद कर लिया गया है, तो वह मारे गुस्से के हाथ-पैर पटकने लगा। सबसे पहले तो वह रुक्मिणी के घर गया। उसे जो मुँह में आया, वही कह डाला। बस उसे मारने ही वाला था! उसने कहा, "सर्वनाशी, तेरे घर में आग लगा दूँगा, तेरी ज़मीन पर उल्लू बिठा दूँगा, और युवराज को छुड़ाकर ही रहूँगा, तभी मेरा नाम सीताराम है! आज ही मैं रायगढ़ जा रहा हूँ, रायगढ़ से लौटकर आऊँ, उसके बाद तेरा यह काला मुँह इसी पत्थर पर रगड़ूँगा, तेरे मुँह पर चूना-कालिख पोतकर शहर से बाहर निकाल दूँगा, तभी पानी पिऊँगा!"
रुक्मिणी कुछ देर तक टकटकी लगाकर सीताराम का मुँह देखती हुई सुनती रही, धीरे-धीरे उसके दाँत भिंच गए, होंठ कस गए, उसकी मुट्ठी कसकर बँध गई, उसकी घनी काली भौंहों पर बादल घिर आए, उसकी घनी काली पुतलियों में बिजली कौंधने लगी, उसका पूरा शरीर निश्चल हो गया; धीरे-धीरे उसके मोटे होंठ काँपने लगे, घनी भौंहें तन गईं, अँधेरी आँखों में बिजली खेलने लगी, उसके बाल फूल उठे, और हाथ-पैर थर-थर काँपने लगे। एक पैशाचिक अभिशाप, एक सर्वांगव्यापी काँपती हुई हिंसा मानो सीताराम के सिर पर गिरने ही वाली थी। उसी क्षण सीताराम कुटिया से बाहर निकल गया। धीरे-धीरे जब रुक्मिणी की मुट्ठी ढीली पड़ी, दाँत खुल गए, होंठ अलग हो गए, और तनी हुई भौंहें सीधी हो गईं, तब वह बैठ गई और बोली, "अच्छा! तो युवराज तुम्हारे हैं! युवराज पर मुसीबत आई है तो तुम्हें बड़ा बुरा लग रहा है—जैसे युवराज मेरे कोई नहीं लगते। अभागे, यह नहीं जानता कि वह मेरे ही युवराज हैं, मैं ही उनका भला कर सकती हूँ और मैं ही उनका बुरा कर सकती हूँ। मेरे युवराज को तू कैद से छुड़ाना चाहता है। देखती हूँ, तू यह कैसे कर पाता है।"
सीताराम उसी दिन रायगढ़ चला गया।
2
बसंत राय के अकेलेपन का गीत
शाम के समय, बसंत राय रायगढ़ के महल के बरामदे में बैठे हैं। उनके सामने एक विशाल मैदान दिखाई दे रहा है। मैदान के किनारे, नहर के उस पार एक आम के बाग में सूर्य अस्त हो रहा है। बसंत राय के हाथों में उनका चिर-साथी, वह सितार, अब नहीं है। वृद्ध उस ढलते सूरज की ओर देखकर अपने मन में गुनगुनाते हुए गीत गा रहे हैं।
बस मैं ही बाक़ी रह गया।
जो कुछ था, वह चला गया, जो बचा है, वह केवल छलावा है।
जो मेरे अपने थे,
अब वे कोई जवाब नहीं देते,
कहाँ हैं वे, कहाँ हैं वे? रो-रोकर किसे पुकारूँ?
बता तो माँ, तुझसे पूछता हूँ,
क्या तूने "मेरा" कुछ भी नहीं छोड़ा?
मैं बस अपने आप को लेकर किस सहारे जीवित रहूँ?
कौन जाने, वृद्ध क्या सोचकर यह गीत गा रहे थे। शायद उनके मन में आ रहा था, 'मैं गीत तो गा रहा हूँ, लेकिन जिन्हें सुनाता था, वे तो हैं ही नहीं।' गीत अपने आप आता है, पर गीत गाकर अब सुख नहीं मिलता। अभी भी मैं आनंद भूला नहीं हूँ, लेकिन जब भी आनंद का अनुभव होता, तब जिन्हें गले लगाने की इच्छा होती, वे कहाँ हैं? जिस दिन सुबह रायगढ़ में उस ताड़ के पेड़ के ऊपर बादल घिरते थे, मन आनंद से नाच उठता था, उसी दिन मैं जिन्हें देखने यशोर जाता था, क्या उन्हें फिर कभी नहीं देख पाऊँगा? अभी भी कभी-कभी मन उसी तरह आनंद से नाच उठता है, लेकिन हाय—शायद यही सब सोचकर आज शाम ढलते सूरज की ओर देखते हुए वृद्ध बसंत राय के मुख से अनायास ही यह गीत निकल पड़ा—"बस मैं ही बाक़ी रह गया।"
3
बसंत राय की व्यग्रता और सीताराम का आगमन
उसी समय ख़ान साहब ने आकर एक बड़ा सलाम किया। ख़ान साहब को देखकर बसंत राय प्रसन्न होकर बोले—“ख़ान साहब, आइए, आइए!” और पास जाकर, व्यग्र होकर बोले, “साहेब, तुम्हारा चेहरा इतना उदास क्यों दिख रहा है? मिज़ाज तो ठीक है?”
ख़ान साहब—“मिज़ाज की बात अब मत पूछिए, महाराज। आपको उदास देखकर हमारे मन में अब कोई सुख नहीं है! एक कहावत है—‘रात कहती है कि मैं कुछ भी नहीं हूँ, जिसे मैंने सिर पर बिठा रखा है, वही चाँद है, उसी के साथ मैं हँसती हूँ, उसी के साथ उदास हो जाती हूँ।’—महाराज, हम भी क्या हैं, अगर आप न हँसें तो हमारे हँसने की क्या मजाल? हमारे लिए और कोई सुख नहीं है, जनाब!”
बसंत राय ने उत्सुकता से कहा, “यह क्या बात हुई साहब? मुझे तो कोई दुःख नहीं है,—मैं तो खुद को देखकर खुद ही हँसता हूँ—अपनी ही खुशी में रहता हूँ—मुझे क्या दुःख, ख़ान साहब?”
ख़ान साहब—“महाराज, अब आपका वैसा गाना-बजाना सुनाई नहीं देता।”
बसंत राय अचानक थोड़े गंभीर होकर बोले, “मेरा गाना सुनोगे साहब?”
“बस मैं ही बाक़ी रह गया हूँ।
जो था वह चला गया,
जो बचा है वह केवल एक छलावा है।”
ख़ान साहब—“अब आप वह सितार कहाँ बजाते हैं? आपका वह सितार कहाँ है?”
बसंत राय थोड़ा मुस्कुराकर बोले—“ऐसा नहीं है कि वह सितार नहीं है। सितार तो है, बस उसके तार टूट गए हैं, उसमें अब सुर नहीं मिलते।” यह कहकर वे आम के बाग की ओर देखकर अपने सिर पर हाथ फेरने लगे।
कुछ देर बाद बसंत राय बोल उठे, “ख़ान साहब, एक गाना गाओ न—एक गाना गाओ, गाओ—“ताजबेताज नौबे नौ।”
ख़ान साहब ने गाना शुरू किया:—
“ताजबेताज नौबे नौ।”
देखते-ही-देखते बसंत राय मग्न हो गए—और बैठे न रह सके! वे उठकर खड़े हो गए और साथ में गाने लगे, “ताजबेताज, नौबे नौ।” वे जल्दी-जल्दी ताल देने लगे और बार-बार गाने लगे। गाते-गाते सूर्य अस्त हो गया, अँधेरा छा गया, और चरवाहे घर की ओर लौटते हुए गाना गाने लगे। उसी समय सीताराम ने आकर “महाराज की जय हो” कहकर प्रणाम किया। बसंत राय एकदम चौंक गए, और तुरंत गाना बंद करके जल्दी से उसके पास आए और उसके शरीर पर हाथ रखकर बोले, “अरे, यह तो सीताराम है! तू ठीक तो है? दादा (उदयादित्य) कैसे हैं? दीदी (विभा) कहाँ है? सब ख़बर तो ठीक है?”
4
उदयादित्य के कारावास की खबर पर बसंत राय का शोक
ख़ान साहब चले गए। सीताराम ने कहा, “महाराज, मैं एक-एक करके निवेदन कर रहा हूँ।” यह कहकर उसने एक-एक करके युवराज के कारावास की बात कही। सीताराम ने शुरू से अंत तक सच नहीं बताया। जिस कारण से उदयादित्य को कैद किया गया था, उस कारण को उसने स्पष्ट रूप से नहीं बताया।
बसंत राय के सिर पर मानो आसमान टूट पड़ा, उन्होंने सीताराम का हाथ कसकर पकड़ लिया। उनकी भौंहें तन गईं, उनकी आँखें फैल गईं, उनके होंठ खुल गए—उन्होंने अपलक नेत्रों से सीताराम के चेहरे की ओर देखकर कहा, “हैं?”
सीताराम ने कहा, “जी हाँ, महाराज।” कुछ क्षण चुप रहकर बसंत राय ने कहा, “सीताराम!”
सीताराम—“महाराज!”
बसंत राय—“तो फिर दादा अब कहाँ हैं?”
सीताराम—“जी, वह कारागार में हैं!”
बसंत राय सिर पर हाथ फेरने लगे। उदयादित्य कारागार में हैं, यह बात शायद उनके दिमाग में ठीक से बैठ नहीं रही थी, वे किसी भी तरह इसकी कल्पना नहीं कर पा रहे थे। फिर कुछ देर बाद सीताराम का हाथ पकड़कर उन्होंने कहा—“सीताराम!”
सीताराम—“जी महाराज!”
बसंत राय—“तो फिर दादा अब क्या कर रहे हैं?”
सीताराम—“और क्या करेंगे! वह कारागार में ही हैं।”
बसंत राय—“क्या उन्हें सबने बंद करके रखा है?”
सीताराम—“जी हाँ, महाराज।”
बसंत राय—“क्या उन्हें कोई एक बार भी बाहर नहीं निकलने देता?”
सीताराम—“जी नहीं।”
बसंत राय—“वह अकेले कारागार में बैठा है?”
बसंत राय ये बातें किसी खास व्यक्ति से नहीं पूछ रहे थे। वे अपने-आप से कह रहे थे। सीताराम यह समझ नहीं पाया—उसने उत्तर दिया—“हाँ महाराज।”
बसंत राय बोल उठे—“दादा, तू मेरे पास आ जा रे। तुझे किसी ने नहीं पहचाना।”
1
The Confrontation Between Sitaram and Rukmini
In the meantime, an incident had occurred. When Sitaram saw that Udayaditya had been imprisoned, he was beside himself. First, he went to Rukmini's house. He cursed her with whatever came to mind. He all but struck her! He said, “You ruinous woman, I will set your house on fire, I will turn your home to ruins, and I will free the Yubaraj! If I don't, my name isn't Sitaram! I am leaving for Raigarh today. After I return from Raigarh, I will grind that wretched face of yours on this stone floor, and I will not drink even water until I have smeared your face with lime and soot and driven you from this city!”
For a moment, Rukmini listened, staring at Sitaram's face with unblinking eyes. Gradually, her teeth clenched and her lips pressed together. Her fists tightened. A cloud gathered over her thick, dark brows, and lightning began to collect in her deep black pupils. Her entire body grew still. Then, her full lower lip began to tremble, her thick brows furrowed, lightning played in her dark eyes, her hair seemed to bristle, and her hands and feet began to tremble violently. A demonic curse, a trembling hatred that swelled through her entire body, seemed about to fall upon Sitaram's head. At that very moment, Sitaram left the hut. As Rukmini's fists gradually loosened, her teeth unclenched, her lips parted, and her furrowed brows smoothed, she sat down. She said, “Is that so! So the Yubaraj is yours, is he? You are so hurt because the Yubaraj is in danger—as if he is nothing to me. You wretched fool, don't you know that he is my Yubaraj? Only I can do him good, and only I can do him harm. You want to free my Yubaraj from prison? We shall see how you manage that.”
That very day, Sitaram left for Raigarh.
2
Basanta Ray's Song of Loneliness
In the afternoon, Basanta Ray was sitting on the veranda of his palace in Raigarh. Before him lay a wide field. At the edge of the field, beyond a canal, the sun was setting amidst a mango grove. His eternal companion, the sitar, was no longer with him. The old man gazed at the setting sun, humming a song to himself.
I alone am left behind.
What was there has gone away; what remains is only emptiness.
Those who were once mine,
No longer do they answer my call.
Where are they, where are they? Weeping, whom shall I call?
Tell me, Mother, I ask you,
“Did you leave nothing of ‘mine’ for me?”
With only myself, with what spirit can I go on living?
Who knows what the old man was thinking as he sang this song. Perhaps he felt: I am singing, but those I used to sing for are no longer here. The song comes on its own, but there is no longer any joy in singing it. He had not yet forgotten joy, but whenever joy arose, where were those whom he longed to embrace? On days when clouds gathered over that palm tree in Raigarh, his heart would dance with joy, and on that very day, he would set out for Jessore to see his loved ones. Would he never get to see them again? Even now, his heart would sometimes leap with that same joy, but alas—perhaps it was these thoughts that made the song spontaneously rise to old Basanta Ray’s lips as he gazed at the setting sun that afternoon—“I alone am left behind.”
3
Basanta Ray's Anxiety and Sitaram's Arrival
At that moment, Khan Saheb arrived and made a grand salute. Seeing Khan Saheb, Basanta Ray's face lit up and he said, “Khan Saheb, come, come!” Going closer, he asked with concern, “Saheb, why does your face look so sad? Are you in good spirits?”
Khan Saheb said, “Do not ask about my spirits, Maharaj. Seeing you so downcast, there is no more joy in our hearts! There is a couplet—‘The night says I am nothing; the moon whom I carry on my head, with it I laugh, with it I fade.’—Maharaj, who are we? If you do not smile, what power have we to smile? We have no more joy, Janab!”
Basanta Ray said eagerly, “What are you saying, Saheb? I have no ailment at all—I laugh at myself, I live in my own joy—what ailment do I have, Khan Saheb?”
Khan Saheb said, “Maharaj, we no longer hear your singing and music.”
Basanta Ray suddenly grew a little somber and said, “You wish to hear my song, Saheb?”
“I alone am left behind.
What was there has gone away,
What remains is merely an illusion.”
Khan Saheb asked, “You no longer play that sitar? Where is your sitar?”
Basanta Ray smiled slightly and said, “It’s not that I don’t have the sitar. The sitar is there, only its strings have broken, and it can no longer be tuned.” Saying this, he looked towards the mango grove and began to stroke his head.
After a few moments, Basanta Ray cried out, “Khan Saheb, sing a song—sing a song, sing—‘Tajbe Taj Naube Nau.’”
Khan Saheb began the song:—
“Tajbe Taj Naube Nau.”
In no time, Basanta Ray was swept up in it—he could no longer remain seated! He stood up and began to sing along, “Tajbe Taj, Naube Nau.” He clapped the rhythm vigorously and sang it again and again. As he sang, the sun set, darkness fell, and the cowherds, on their way home, began to sing. At that moment, Sitaram arrived and, bowing, said, “Victory to the Maharaj!” Basanta Ray was completely startled, immediately stopped singing, and hurried over to him. Placing a hand on his shoulder, he said, “Oh, it’s Sitaram! Are you well? How is brother? Where is sister? Is the news good?”
4
Basanta Ray's Grief at the News of Udayaditya's Imprisonment
Khan Saheb left. Sitaram said, “I will explain it all one by one, Maharaj.” And so, one by one, he told of the Yubaraj's imprisonment. Sitaram did not tell the truth from beginning to end. He was not very clear about the reason that had led to Udayaditya’s imprisonment.
The world came crashing down on Basanta Ray; he gripped Sitaram’s hand firmly. His eyebrows shot up, his eyes widened, and his lips parted—staring at Sitaram’s face with an unblinking gaze, he said, “Eh?”
Sitaram replied, “Yes, indeed, Maharaj.” After a moment of silence, Basanta Ray said, “Sitaram!”
Sitaram replied, “Maharaj!”
Basanta Ray asked, “Then where is Dada now?”
Sitaram said, “In prison, sir!”
Basanta Ray began to run a hand over his head. It seemed the news of Udayaditya being in prison was not quite sinking in; he could not conjure the image of it at all. After another short while, he grabbed Sitaram’s hand again and said, “Sitaram!”
Sitaram replied, “Yes, Maharaj!”
Basanta Ray asked, “Then what is Dada doing now?”
“What else can he do! He is in prison.”
“Have they all locked him up?”
“Yes, indeed, Maharaj.”
“Does no one let him out, not even once?”
“No, sir.”
“Is he sitting alone in the prison?”
Basanta Ray did not ask these questions of any particular person. He was speaking to himself. Sitaram did not understand this—he answered, “Yes, Maharaj.”
Basanta Ray cried out, “Dada, come to me! No one understood you.”
1
シタラムとルクミニーの対立
その間に、ある事件が起こった。シタラムはウダヤディティヤが投獄されたのを知ると、居ても立ってもいられなくなった。彼はまずルクミニーの家へ行き、口から出まかせに罵倒した。今にも殴りかからんばかりの勢いであった。そして言った。「この悪女め! 貴様の家に火をつけ、その家を廃墟にしてやる。そして王太子様を解放して見せる。それができなければ、このシタラムの名がすたるというものだ! 今日中にライガルへ行く。ライガルから戻ってきたら、その汚い顔をこの石の上でこすりつけてやる。貴様の顔に石灰と煤を塗りたくって、町から追い出してやる。それまでは水の一滴も口にせんぞ!」
ルクミニーはしばらくの間、瞬きもせずにシタラムの顔を見つめて聞いていたが、やがて歯を食いしばり、唇を固く結び、拳を強く握りしめた。その濃い黒い眉には暗雲が立ち込め、漆黒の瞳には稲妻が宿り始めた。全身が微動だにしなくなった。やがて、その分厚い唇は震え始め、濃い眉は波打ち、闇をたたえた瞳に稲妻が走った。髪は逆立ち、手足はわなわなと震えだした。悪魔的な呪い、全身に膨れ上がって震える憎悪が、今にもシタラムの頭上に降りかからんばかりであった。その瞬間、シタラムは小屋から出て行った。やがてルクミニーの拳が緩み、食いしばった歯が離れ、唇が開き、寄せられていた眉が元に戻ると、彼女はその場に座り込んだ。そして言った。「そうかい! 王太子様がお前のものだとでもいうのか。王太子様が危機に陥ったからとて、随分と心を痛めているようだね。まるで王太子様が私にとって何者でもないかのような口ぶりじゃないか。この間抜けめ、分かっていないのか。あの方は私の王太子様なのだ。あの方のためになることをするのも、あの方に害をなすのも、この私にしかできないのだ。私の王太子様を、お前が解放したいだと? どうやってそれができるか、見せてもらおうじゃないか。」
シタラムはその日のうちにライガルへと旅立った。
2
バサンタ・ライの孤独の歌
午後のこと、バサンタ・ライはライガルの宮殿のベランダに座っていた。目の前には広々とした野原が見える。野原の先、運河の向こうにあるマンゴーの林に、太陽が沈んでいく。バサンタ・ライの手には、彼の永遠の伴侶であったあのシタールが、もはやない。老人はその沈みゆく太陽を見つめながら、独り口ずさんでいる。
私だけが、ただ一人残された。
あったものは去り、残されたものは、ただ虚しいだけ。
私のものだった者たちは、
もう応えてはくれない。
彼らはどこに、彼らはどこに? 泣きながら誰を呼べばよいのか。
教えておくれ、母よ。あなたに尋ねよう。
「私のもの」を、何も残してはくれなかったのか?
私だけを抱いて、どうやって生きていけというのか。
老人が何を思ってこの歌を口ずさんでいたのか、誰にも分からない。おそらく彼の心には、こんな思いがよぎっていたのだろう。歌ってはいるが、歌って聞かせる相手が、もういない。歌はひとりでに湧いてくるが、歌っても、もはや喜びはない。今でも喜びを忘れたわけではない。しかし、喜びが生まれるたびに抱きしめたいと願った者たちは、どこにいるというのか。朝、ライガルのあのヤシの木の上に雲がかかり、心が喜びに躍ったその日に、私が会いにジョソールへと旅立った者たちに、もう会うことはできないのだろうか。今でも時折、心は同じように喜びに躍る。だが、はぁ――。おそらく、そんなことを考えていたのだろう。今日の午後、沈みゆく太陽を見つめる老バサンタ・ライの口から、ひとりでに歌がこぼれ出たのだ。――「私だけが、ただ一人残された」と。
3
バサンタ・ライの不安とシタラムの到着
その時、カーン・サーヘブがやって来て、丁重に一礼した。カーン・サーヘブを見て、バサンタ・ライは顔を輝かせて言った。「カーン・サーヘブ、来たか、来たか!」さらに近寄り、慌てた様子で言った。「サーヘブ、なぜそんなに浮かない顔をしているのだ?気分は悪くないのだろうな?」
カーン・サーヘブは言った。「ご機嫌のことなどお尋ねになりますな、マハラジャ。あなた様の憂い顔を拝見して、我らの心に喜びなどございません!こういう詩句がございます。『夜は申します、我は何者にもあらず。我が頭上に戴くは月なり。月と共に笑い、月と共に翳るのみ』と。――マハラジャ、我らなど何者でございましょうか。あなた様がお笑いにならねば、我らが笑うことなどできましょうか。我らにはもう喜びなどございません、ジャナーブ!」
バサンタ・ライは身を乗り出して言った。「何を言うのだ、サーヘブ?わしはどこも悪くはないぞ。わしは自分を見ては笑い、己の楽しみのうちに生きている。わしに何の憂いがあるというのだ、カーン・サーヘブ?」
カーン・サーヘブは言った。「マハラジャ、近頃はあなた様の歌や音楽が以前のように聴こえてまいりません。」
バサンタ・ライはふと少し真顔になって言った。「わしの歌が聴きたいか、サーヘブ?」
「わし独りが、ただ残された。
ありしものは皆去り行き、
残りしは、ただ虚しさのみ。」
カーン・サーヘブは言った。「あのシタールもお弾きになりません。あなた様のあのシタールはどこへ?」
バサンタ・ライはかすかに微笑んで言った。「あのシタールがないわけではない。シタールはある。ただ、その弦が切れてしまって、もう音を合わせることができぬのだ。」そう言うと、マンゴーの木立の方を見つめ、頭を撫でた。
しばらくして、バサンタ・ライは声を上げた。「カーン・サーヘブ、一曲歌ってくれんか。歌ってくれ、『タージベ・タージ・ナウベ・ナウ』を!」
カーン・サーヘブは歌い始めた。
「タージベ・タージ・ナウベ・ナウ。」
見る間にバサンタ・ライは興が乗り、もう座ってはいられなくなった。立ち上がると、一緒に歌い始めた。「タージベ・タージ、ナウベ・ナウ」。しきりに手拍子を打ち、何度も何度も歌い続けた。歌い続けるうちに日は沈み、闇が訪れ、家路につく牛飼いたちも歌い始めた。その時、シタラムがやって来て、「マハラジャに勝利あれ」と挨拶をしてお辞儀をした。バサンタ・ライははっと驚き、即座に歌うのをやめると、急いで彼のそばへ駆け寄り、その体に手を触れて言った。「おお、シタラムではないか!息災か?ウダヤディティヤは元気にしておるか?ビバはどこだ?良い知らせか?」
4
ウダヤディティヤ投獄の知らせに嘆くバサンタ・ライ
カーン・サーヘブが去ると、シタラムは「マハラジャ、順を追ってご報告いたします」と述べ、王太子の投獄について語り始めた。しかしシタラムは、すべてを正直に話したわけではなかった。ウダヤディティヤが投獄されるに至った理由については、明確には述べなかったのである。
バサンタ・ライの頭上に天が崩れ落ちてきたかのようだった。彼はシタラムの手を固く握りしめた。眉はつり上がり、目は見開かれ、唇はわなないていた。瞬きもせずシタラムの顔を見つめ、彼は言った。「何だと?」
シタラムは答えた。「はっ、マハラジャ」。しばし沈黙した後、バサンタ・ライは言った。「シタラム!」
シタラム「マハラジャ!」
バサンタ・ライ「では、ウダイは今どこにいるのだ?」
シタラム「はっ、牢にございます!」
バサンタ・ライは頭に手をやった。ウダヤディティヤが牢に。その言葉が彼の頭にはうまく入ってこないようだった。どうしても想像することができないのだ。またしばらくして、彼はシタラムの手を取り、言った。「シタラム!」
シタラム「はっ、マハラジャ!」
バサンタ・ライ「では、ウダイは今何をしておるのだ?」
シタラム「何をしておられると申しましても……牢におられます。」
バサンタ・ライ「皆であの子を閉じ込めておるのか?」
シタラム「はっ、マハラジャ。」
バサンタ・ライ「誰も一瞬たりとも外に出してはくれぬのか?」
シタラム「はっ、左様でございます。」
バサンタ・ライ「あの子は、たった一人で牢に座っておるのか?」
バサンタ・ライは、この言葉を誰かに尋ねたわけではなかった。独り言のようにつぶやいていたのだ。シタラムはそれが分からず、答えた。「はい、マハラジャ。」
バサンタ・ライは叫んだ。「ウダイよ、わしのところへおいで。誰もお前のことを分かってはくれなんだ。」