1 উদয়াদিত্যের খেদ এবং সুরমার সান্ত্বনা

রাত্রি অনেক হইয়াছে। গ্রীষ্মকাল। বাতাস বন্ধ হইয়া গিয়াছে। গাছের পাতাটিও নড়িতেছে না। যশোহরের যুবরাজ, প্রতাপাদিত্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র, উদয়াদিত্য তাঁহার শয়ন-গৃহের বাতায়নে বসিয়া আছেন। তাঁহার পার্শ্বে তাঁহার স্ত্রী সুরমা।

সুরমা কহিলেন, “প্রিয়তম, সহ্য করিয়া থাক, ধৈর্য্য ধরিয়া থাক। এক দিন সুখের দিন আসিবে।”

উদয়াদিত্য কহিলেন, “আমি ত আর কোন সুখ চাই না, আমি চাই, আমি রাজপ্রাসাদে না যদি জন্মাইতাম, যুবরাজ না যদি হইতাম, যশোহর-অধিপতির ক্ষুদ্রতম তুচ্ছতম প্রজার প্রজা হইতাম, তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র, তাঁহার সিংহাসনের তাঁহার সমস্ত ধন মান যশ প্রভাব গৌরবের একমাত্র উত্তরাধিকারী না হইতাম! কি তপস্যা করিলে এ সমস্ত অতীত উল্টাইয়া যাইতে পারে।”

সুরমা অতি কাতর হইয়া যুবরাজের দক্ষিণ হস্ত দুই হাতে লইয়া চাপিয়া ধরিলেন, ও তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিলেন। যুবরাজের ইচ্ছা পূরাইতে প্রাণ দিতে পারেন, কিন্তু প্রাণ দিলেও এ ইচ্ছা পূরাইতে পারিবেন না, এই দুঃখ।

যুবরাজ কহিলেন, “সুরমা, রাজার ঘরে জন্মিয়াছি বলিয়াই সুখী হইতে পারিলাম না। রাজার ঘরে সকলে বুঝি কেবল উত্তরাধিকারী হইয়া জন্মায়, সন্তান হইয়া জন্মায় না। পিতা ছেলেবেলা হইতেই আমাকে প্রতি মুহূর্ত্তে পরখ করিয়া দেখিতেছেন, আমি তাঁহার উপার্জ্জিত যশোমান বজায় রাখিতে পারিব কি না, বংশের মুখ উজ্জ্বল করিতে পারিব কি না, রাজ্যের গুরুভার বহন করিতে পারিব কি না। আমার প্রতি কার্য্য, প্রতি অঙ্গভঙ্গী তিনি পরীক্ষার চক্ষে দেখিয়া আসিতেছেন, স্নেহের চক্ষে নহে। আত্মীয়বর্গ, মন্ত্রী, রাজসভাসদ্‌গণ, প্রজারা আমার প্রতি কথা প্রতি কাজ খুঁটিয়া খুঁটিয়া লইয়া আমার ভবিষ্যৎ গণনা করিয়া আসিতেছে। সকলেই ঘাড় নাড়িয়া কহিল—না, আমার দ্বারা এ বিপদের রাজ্য রক্ষা হইবে না। আমি নির্ব্বোধ, আমি কিছুই বুঝিতে পারি না। সকলেই আমাকে অবহেলা করিতে লাগিল, পিতা আমাকে ঘৃণা করিতে লাগিলেন। আমার আশা একেবারে পরিত্যাগ করিলেন। একবার খোঁজও লইতেন না!”

সুরমার চখে জল আসিল। সে কহিল “আ—হা! কেমন করিয়া পারিত!” তাহার দুঃখ হইল, তাহার রাগ হইল, সে কহিল “তোমাকে যাহারা নির্ব্বোধ মনে করিত তাহারাই নির্ব্বোধ!”

উদয়াদিত্য ঈষৎ হাসিলেন, সুরমার চিবুক ধরিয়া তাহার রোষে আরক্তিম মুখ খানি নাড়িয়া দিলেন। মুহূর্ত্তের মধ্যে গম্ভীর হইয়া কহিলেন—

“না সুরমা, সত্য সত্যই আমার রাজ্যশাসনের বুদ্ধি নাই। তাহার, যথেষ্ট পরীক্ষা হইয়া গেছে। আমার যখন ষোল বৎসর বয়স, তখন মহারাজ কাজ শিখাইবার জন্য হোসেনখালী পরগণার ভার আমার হাতে সমর্পণ করেন। ছয় মাসের মধ্যেই বিষম বিশৃঙ্খলা ঘটিতে লাগিল। খাজনা কমিয়া গেল, প্রজারা আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিল; কর্ম্মচারীরা আমার বিরুদ্ধে রাজার নিকটে অভিযোগ করিতে লাগিল। রাজসভার সকলেরই মত হইল, যুবরাজ প্রজাদের যখন অত প্রিয়পাত্র হইয়া পড়িয়াছেন, তখনি বুঝা যাইতেছে উহার দ্বারা রাজ্যশাসন কখনো ঘটিতে পারিবে না। সেই অবধি মহারাজ আমার পানে আর বড় একটা তাকাইতেন না। বলিতেন—ও কুলাঙ্গার ঠিক রায়গড়ের খুড়া বসন্তরায়ের মত হইবে, সেতার বাজাইয়া নাচিয়া বেড়াইবে ও রাজ্য অধঃপাতে দিবে।”

সুরমা আবার কহিলেন, “প্রিয়তম, সহ্য করিয়া থাক, ধৈর্য্য ধরিয়া থাক। হাজার হউন, পিতা ত বটেন। আজ কাল রাজ্য-উপার্জ্জন, রাজ্য-বৃদ্ধির একমাত্র দুরাশায় তাঁহার সমস্ত হৃদয় পূর্ণ রহিয়াছে, সেখানে, স্নেহের ঠাঁই নাই। যতই তাঁহার আশা পূর্ণ হইতে থাকিবে, ততই তাঁহার স্নেহের রাজ্য বাড়িতে থাকিবে।”

যুবরাজ কহিলেন “সুরমা, তোমার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, দুরদর্শী, কিন্তু এইবারে তুমি ভুল বুঝিয়াছ। একত, আশার শেষ নাই; দ্বিতীয়তঃ, পিতার রাজ্যের সীমা যতই বাড়িতে থাকিবে, রাজ্য যতই লাভ করিতে থাকিবেন, ততই তাহা হারাইবার ভয় তাঁহার মনে বাড়িতে থাকিবে; রাজ-কার্য্য যতই গুরুতর হইয়া উঠিবে, ততই আমাকে তাহার অনুপযুক্ত মনে করিবেন।”

সুরমা ভুল বুঝে নাই, ভুল বিশ্বাস করিল মাত্র; বিশ্বাস বুদ্ধিকেও লঙ্ঘন করে। সে একমনে আশা করিত, এই রূপই যেন হয়।

2 সুরমার কাছে উদয়াদিত্যের স্বীকারোক্তি

“চারিদিকে কোথাও বা কৃপাদৃষ্টি কোথাও বা অবহেলা সহ্য করিতে না পারিয়া আমি মাঝে মাঝে পালাইয়া রায়গড়ে দাদা মহাশয়ের কাছে যাইতাম! পিতা বড় একটা খোঁজ লইতেন না। আঃ, সে কি পরিবর্ত্তন। সেখানে গাছ পালা দেখিতে পাইতাম, গ্রামবাসীদের কুটিরে যাইতে পাইতাম, দিবানিশি রাজবেশ পরিয়া থাকিতে হইত না। তাহা ছাড়া জান ত, যেখানে দাদামহাশয় থাকেন, তাহার ত্রিসীমায় বিষাদ ভাবনা বা কঠোর, গাম্ভীর্য্য তিষ্ঠিতে পারে না। গাহিয়া বাজাইয়া, আমোদ করিয়া চারিদিক পূর্ণ করিয়া রাখেন। চারিদিকে উল্লাস, সদ্ভাব, সেই খানে গেলেই আমি ভুলিয়া যাইতাম যে, আমি যশোহরের যুবরাজ। সে কি আরামের ভুল! অবশেষে আমার বয়স যখন ১৮ বৎসর, একদিন রায়গড়ে বসন্তের বাতাস বহিতেছিল, চারিদিকে সবুজ কুঞ্জবন ও সেই বসন্তে আমি রুক্মিণীকে দেখিলাম।”

সুরমা বলিয়া উঠিল “ও কথা অনেক বার শুনিয়াছি!”

উদয়াদিত্য, “আর একবার শুন। মাঝে মাঝে এক একটা কথা প্রাণের মধ্যে দংশন করিতে থাকে, সে কথাগুলা যদি বাহির করিয়া না দিই, তবে আর বাঁচিব কি করিয়া। সেই কথাটা তোমার কাছে এখনো বলিতে লজ্জা করে, কষ্ট হয়, তাই বারবার করিয়া বলি, যে দিন আর লজ্জা করিবে না, কষ্ট হইবে না, সে দিন বুঝিব আমার প্রায়শ্চিত্ত শেষ হইল, সে দিন আর বলিব না।”

সুরমা, “কিসের প্রায়শ্চিত্ত প্রিয়তম? তুমি যদি পাপ করিয়া থাক ত সে পাপের দোষ, তোমার দোষ নহে। আমি। তোমাকে জানি না? অন্তর্যামী কি তোমার মন দেখিতে পান না?”

উদয়াদিত্য বলিতে লাগিলেন, “রুক্মিণীর বয়স আমার অপেক্ষা তিন বৎসরের বড়। সে একাকিনী বিধবা। দাদা মহাশয়ের অনুগ্রহে সে রায়গড়ে বাস করিতে পাইত। মনে নাই, সে আমাকে কি কৌশলে প্রথমে আকর্ষণ করিয়া লইয়া গেল। তখন আমার মনের মধ্যে মধ্যাহ্নের কিরণ জ্বলিতেছিল। এত প্রখর আলো যে, কিছুই ভাল করিয়া দেখিতে পাইতেছিলাম না, চারিদিকে জগৎ জ্যোতির্ম্ময় বাষ্পে আবৃত। সমস্ত রক্ত যেন মাথায় উঠিতেছিল; কিছুই আশ্চর্য্য, কিছুই অসম্ভব মনে হইত না; পথ, বিপথ, দিক্ বিদিক্‌ সমস্ত এক আকার ধারণ করিয়াছিল ইহার পুর্ব্বেও আমার এমন কখন হয় নাই, ইহার পরেও আমার এমন কখন হয় নাই। জগদীশ্বর জানেন, তাঁহার কি উদ্দেশ্য সাধন করিতে এই ক্ষুদ্র দুর্ব্বল বুদ্ধিহীন হৃদয়ের বিরুদ্ধে এক দিনের জন্য সমস্ত জগৎকে যেন উত্তেজিত করিয়া দিয়াছিলেন, বিশ্বচরাচর যেন একতন্ত্র হইয়া আমার এই ক্ষুদ্র হৃদয়টিকে মুহূর্ত্তে বিপথে লইয়া গেল। মুহূর্ত্তমাত্র— আর অধিক নয় সমস্ত বহির্জগতের মুহূর্ত্তস্থায়ী এক নিদারুণ আঘাত, আর মুহূর্ত্তের মধ্যে একটি ক্ষীণ হৃদয়ের মূল বিদীর্ণ হইয়া গেল, বিদ্যুদ্বেগে সে ধূলিকে আলিঙ্গন করিয়া পড়িল। তাহার পরে যখন উঠিল তখন ধূলিধূসরিত, ম্লান, সে ধূলি আর মুছিল না, সে মলিনতার চিহ্ন আর উঠিল না। আমি কি করিয়াছিলাম, বিধাতা, যে পাপে এক মুহূর্ত্তের মধ্যে আমার জীবনের সমস্ত শুভ্রকে কালি করিলে? দিনকে রাত্রি করিলে? আমার হৃদয়ের পুষ্প-বনে মালতী ও জুঁই ফুলের মুখ গুলিও যেন লজ্জায় কালো হইয়া গেল!”

বলিতে বলিতে উদয়াদিত্যের গৌরবর্ণ মুখ রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল, আয়ত নেত্র অধিকতর বিস্ফারিত হইয়া উঠিল, মাথা হইতে পা পর্য্যন্ত একটি বিদ্যুৎশিখা কাঁপিয়া উঠিল। সুরমা হর্ষে, গর্ব্বে, কষ্টে কহিল “আমার মাথা খাও, ওকথা থাক্।”

উদয়াদিত্য, “ধীরে ধীরে যখন রক্ত শীতল হইয়া গেল সকলি যখন যথাযথ পরিমাণে দেখিতে পাইলাম; যখন জগৎকে উষ্ণ, ঘূর্ণিত মস্তিষ্ক, রক্ত-নয়ন মাতালের কুজ্বাটিকাময় ঘূর্ণমান স্বপ্নদৃশ্য বলিয়া মনে না হইয়া প্রকৃত কার্য্যক্ষেত্র বলিয়া মনে হইল, তখন মনের কি অবস্থা। কোথা হইতে কোথায় পতন! শত সহস্র লক্ষ ক্রোশ পাতালের গহ্বরে, অন্ধ অন্ধতর অন্ধতম রজনীর মধ্যে একেবারে পলক না ফেলিতে পড়িয়া গেলাম। দাদামহাশয় স্নেহভরে ডাকিয়া লইয়া গেলেন; তাঁহার কাছে মুখ দেখাইলাম কি বলিয়া? কিন্তু সেই অবধি আমাকে রায়গড় ছাড়িতে হইল। দাদামহাশয় আমাকে না দেখিলে থাকিতে পারেন না। আমাকে ডাকিয়া পাঠাইতেন। আমার এমনি ভয় করিত যে, আমি কোন মতেই যাইতে পারিতাম না। তিনি স্বয়ং আমাকে ও ভগিনী বিভাকে দেখিতে আসিতেন। অভিমান নাই, কিছুই নাই। জিজ্ঞাসাও করিতেন না, কেন যাই নাই। আমাদের দেখিতেন, আমোদ উল্লাস করিতেন ও চলিয়া যাইতেন।”

উদয়াদিত্য ঈষৎ হাস্য করিয়া অতিশয় মৃদু কোমল প্রেমে তাঁহার বড় বড় চোখ দুটি প্লাবিত করিয়া সুরমার মুখের দিকে চাহিলেন। সুরমা বুঝিল, এইবার কি কথা আসিতেছে। মুখ নত হইয়া আসিল; ঈষৎ চঞ্চল হইয়া পড়িল। যুবরাজ দুই হস্তে তাহার দুই কপোল ধরিয়া নত মুখ খানি তুলিয়া ধরিলেন; অধিকতর নিকটে গিয়া বসিলেন; মুখখানি নিজের স্কন্ধে ধীরে ধীরে রাখিলেন। কটিদেশ বামহস্তে বেষ্টন করিয়া ধরিলেন ও গভীর প্রশান্ত প্রেমে তাহার কপোল চুম্বন করিয়া বলিলেন—

“তারপর কি হইল, সুরমা, বল দেখি? এই বুদ্ধিতে দীপ্যমান, স্নেহ প্রেমে কোমল, হাস্যে উজ্জ্বল ও প্রশান্ত ভাবে বিমল মুখখানি কোথা হইতে উদয় হইল? আমার সে গভীর অন্ধকার ভাঙিবে আশা ছিল কি? তুমি আমার ঊষা, আমার আলো, আমার আশা, কি মায়ামন্ত্রে সে আঁধার দূর করিলে?” যুবরাজ বারবার সুরমার মুখচুম্বন করিলেন। সুরমা কিছুই কথা কহিল না, আনন্দে তাহার চোখ জলে পূরিয়া আসিল; যুবরাজ কহিলেন,—

“এতদিনের পরে আমি যথার্থ আশ্রয় পাইলাম। তোমার কাছে প্রথম শুনিলাম যে আমি নির্ব্বোধ নই, তাহাই বিশ্বাস করিলাম, তাহাই বুঝিতে পারিলাম। তোমারি কাছে শিখিলাম বুদ্ধি অন্ধকারময় ক্ষুদ্র গলির মত বাঁকাচোরা উচুনিচু নহে, রাজপথের ন্যায় সরল সমতল, প্রশস্ত। পূর্ব্বে আমি আপনাকে ঘৃণা করিতাম, আপনাকে অবহেলা করিতাম। কোন কাজ করিতে সাহস করিতাম না। মন যদি বলিত, ইহাই ঠিক, আত্ম-সংশয়ী সংস্কার বলিত, উহা ঠিক না হইতেও পারে। যে যেরূপ ব্যবহার করিত তাহাই সহিয়া থাকিতাম, নিজে কিছু ভাবিতে চেষ্টা করিতাম না। এতদিনের পরে আমার মনে হইল, আমি কিছু, আমি কেহ। এতদিন আমি অগোচর ছিলাম, তুমি আমাকে বাহির করিয়াছ, সুরমা, তুমি আমাকে আবিষ্কার করিয়াছ, এখন আমার মন যাহা ভাল বলে, তৎক্ষণাৎ তাহা আমি সাধন করিতে চাই। তোমার উপর আমার এমন বিশ্বাস আছে যে, তুমি যখন আমাকে বিশ্বাস কর, তখন আমিও আমাকে নির্ভয়ে বিশ্বাস করিতে পারি। ওই সুকুমার শরীরে এত বল কোথায় ছিল যাহাতে আমাকেও তুমি বলীয়ান্ করিয়া তুলিয়াছ?”

কিন্তু অপরিসীম নির্ভরের ভাবে সুরমা স্বামীর বক্ষ বেষ্টন করিয়া ধরিল। কি সম্পূর্ণ আত্ম-বিসর্জ্জী দৃষ্টিতে তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল! তাহার চোখ কহিল “আমার আর কিছুই নাই কেবল তুমি আছ, তাই আমার সব আছে!”

বাল্যকাল হইতে উদয়াদিত্য আত্মীয় স্বজনের উপেক্ষা সহিয়া আসিতেছেন, মাঝে মাঝে এক এক দিন নিস্তব্ধ গভীর রাত্রে সুরমার নিকট সেই শতবার কথিত পুরাণো জীবনকাহিনী খণ্ডে খণ্ডে সোপানে সোপানে আলোচনা করিতে তাঁহার বড় ভাল লাগে।

উদয়াদিত্য কহিলেন, “এমন করিয়া আর কত দিন চলিবে সুরমা? এদিকে রাজসভায় সভাসদ্‌গণ কেমন এক প্রকার কৃপাদৃষ্টিতে আমার প্রতি চায়, ওদিকে অন্তঃপুরে মা তোমাকে লাঞ্ছনা করিতেছেন; দাস দাসীরা পর্য্যন্ত তোমাকে তেমন মানে না। আমি কাহাকেও ভাল করিয়া কিছু বলিতে পারি না, চুপ করিয়া থাকি, সহ্য করিয়া যাই। তোমার তেজস্বী স্বভাব, কিন্তু তুমিও নীরবে সহিয়া যাও। যখন তোমাকে সুখী করিতে পারিলাম না, আমা হইতে তোমাকে কেবল অপমান আর কষ্টই সহ্য করিতে হইল, তখন আমাদের এ বিবাহ না হইলেই ভাল ছিল।”

সুরমা,—“সে কি কথা নাথ? এই সময়েই ত সুরমাকে আবশ্যক। সুখের সময় আমি তোমার কি করিতে পারিতাম? সুখের সময় সুরমা বিলাসের দ্রব্য, খেলিবার জিনিষ। সকল দুঃখ অতিক্রম করিয়া আমার মনে এই সুখ জাগিতেছে যে, আমি তোমার কাজে লাগিতেছি, তোমার জন্য দুঃখ সহিতে যে অতুল আনন্দ আছে, সেই আনন্দ উপভোগ করিতেছি। কেবল দুঃখ এই, তোমার সমুদয় কষ্ট কেন আমি বহন করিতে পারিলাম না?”

যুবরাজ কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিলেন, “আমি নিজের জন্য তেমন ভাবি না। সকলি সহিয়া গিয়াছে। কিন্তু আমার জন্য তুমি কেন অপমান সহ্য করিবে? তুমি যথার্থ স্ত্রীর মত আমার দুঃখের সময় সান্ত্বনা দিয়াছ, শ্রান্তির সময় বিশ্রাম দিয়াছ, কিন্তু আমি স্বামীর মত তোমাকে অপমান হইতে লজ্জা হইতে রক্ষা করিতে পারিলাম না। তোমার পিতা শ্রীপুর-রাজ আমার পিতাকে প্রধান বলিয়া না মানাতে, আপনাকে যশোহরছত্রের অধীন বলিয়া স্বীকার না করাতে, পিতা তোমার প্রতি অবহেলা দেখাইয়া নিজের প্রধানত্ব বজায় রাখিতে চান। তোমাকে কেহ অপমান করিলে তিনি কানেই আনেন না। তিনি মনে করেন, তোমাকে যে পুত্রবধু করিয়াছেন, ইহাই তোমার পক্ষে যথেষ্ট। এক একবার মনে হয়, আর পারিয়া উঠি না, সমস্ত পরিত্যাগ করিয়া তোমাকে লইয়া চলিয়া যাই। এত দিনে হয় ত যাইতাম, তুমি কেবল আমাকে ধরিয়া রাখিয়াছ।”

3 বিভার দুঃসংবাদ ও উদয়াদিত্যের প্রস্থান

রাত্রি গভীর হইল। অনেকগুলি সন্ধ্যার তারা অস্ত গেল, অনেকগুলি গভীর রাত্রের তারা উদিত হইল। প্রাকারতোরণস্থিত প্রহরীদের পদশব্দ দূর হইতে শুনা যাইতেছে। সমুদয় জগৎ সুষুপ্ত। নগরের সমুদয় প্রদীপ নিবিয়া গিয়াছে; গৃহদ্বার রুদ্ধ; দৈবাৎ দুএকটা শৃগাল ছাড়া একটি জনপ্রাণীও নাই। উদয়াদিত্যের শয়নকক্ষের দ্বার রুদ্ধ ছিল। সহসা বাহির হইতে কে দুয়ারে আঘাত করিতে লাগিল। শশব্যস্ত যুবরাজ দুয়ার খুলিয়া দিলেন। “কেন? বিভা? কি হইয়াছে? এত রাত্রে এখানে আসিয়াছ কেন?”

পাঠকেরা পূর্ব্বেই অবগত হইয়াছেন বিভা উদয়াদিত্যের ভগিনী। বিভা কহিল—“এতক্ষণে বুঝি সর্ব্বনাশ হইল!” সুরমা ও উদয়াদিত্য এক সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিয়া উঠিলেন, “কেন, কি হইয়াছে?” বিভা ভয়কম্পিত স্বরে চুপি চুপি কি কহিল। বলিতে বলিতে আর থাকিতে পারিল না, কাঁদিয়া উঠিল, কহিল—“দাদা কি হবে?”

উদয়াদিত্য কহিলেন “আমি তবে চলিলাম!” বিভা বলিয়া উঠিল “না না তুমি যাইও না।”

উদয়াদিত্য। “কেন বিভা?”

বিভা। “পিতা যদি জানিতে পারেন? তোমার উপরে যদি রাগ করেন?”

সুরমা কহিল, “ছিঃ বিভা; এখন কি তাহা ভাবিবার সময়?”

উদয়াদিত্য বস্ত্রাদি পরিয়া কটিবন্ধে তরবারি বাঁধিয়া প্রস্থানের উদ্যোগ করিলেন। বিভা তাঁহার হাত ধরিয়া কহিল “দাদা তুমি যাইও না, তুমি লোক পাঠাইয়া দাও, আমার বড় ভয় করিতেছে।”

উদয়াদিত্য কহিলেন—“বিভা এখন বাধা দিস্‌নে; আর সময় নাই।” এই কথা বলিয়া তৎক্ষণাৎ বাহির হইয়া গেলেন।

বিভা সুরমার হাত ধরিয়া কহিল “কি হবে ভাই? বাবা যদি টের পান?”

সুরমা কহিল “আর কি হবে? স্নেহের বোধ করি আর কিছু অবশিষ্ট নাই। যেটুকু আছে সেটুকু গেলেও বড় একটা ক্ষতি হইবে না।”

বিভা কহিল “না ভাই, আমার বড় ভয় করিতেছে। পিতা যদি কোন প্রকার হানি করেন। যদি দণ্ড দেন?”

সুরমা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল —“আমার বিশ্বাস—সংসারে যাহার কেহই সহায় নাই, নারায়ণ তাহার অধিক সহায়। হে প্রভু, তোমার নামে কলঙ্ক না হয় যেন! এ বিশ্বাস আমার ভাঙিও না!”

1 উদয়াদিত্যের খেদ এবং সুরমার সান্ত্বনা

অনেক রাত হয়েছে। গ্রীষ্মকাল। বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে। গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। যশোরের যুবরাজ, প্রতাপাদিত্যের বড় ছেলে উদয়াদিত্য তাঁর শোবার ঘরের জানলার কাছে বসে আছেন। তাঁর পাশে তাঁর স্ত্রী সুরমা।

সুরমা বললেন, “প্রিয়তম, সহ্য করে থাকো, ধৈর্য ধরে থাকো। একদিন সুখের দিন আসবে।”

উদয়াদিত্য বললেন, “আমি তো আর কোনো সুখ চাই না, আমি চাই, আমি যদি রাজপ্রাসাদে না জন্মাতাম, যুবরাজ না হতাম, যশোর-অধিপতির ক্ষুদ্রতম, তুচ্ছতম প্রজার প্রজা হতাম, তাঁর বড় ছেলে, তাঁর সিংহাসনের, তাঁর সমস্ত ধন, মান, যশ, প্রভাব, গৌরবের একমাত্র উত্তরাধিকারী না হতাম! কোন তপস্যা করলে এই অতীতকে পালটে দেওয়া যায়?”

সুরমা খুব কাতর হয়ে যুবরাজের ডান হাতটা নিজের দু'হাতে নিয়ে চেপে ধরলেন, আর তাঁর মুখের দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যুবরাজের ইচ্ছে পূরণ করার জন্য তিনি প্রাণ দিতে পারেন, কিন্তু প্রাণ দিলেও এ ইচ্ছে পূরণ করতে পারবেন না, এটাই তাঁর দুঃখ।

যুবরাজ বললেন, “সুরমা, রাজার ঘরে জন্মেছি বলেই সুখী হতে পারলাম না। রাজার ঘরে সবাই বোধহয় শুধু উত্তরাধিকারী হয়েই জন্মায়, সন্তান হয়ে জন্মায় না। বাবা ছোটবেলা থেকেই আমাকে প্রতি মুহূর্তে পরখ করে দেখছেন, আমি তাঁর অর্জিত যশ-মান বজায় রাখতে পারব কি না, বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারব কি না, রাজ্যের গুরুভার বহন করতে পারব কি না। আমার প্রত্যেক কাজ, প্রত্যেক অঙ্গভঙ্গি তিনি পরীক্ষার চোখে দেখে আসছেন, স্নেহের চোখে নয়। আত্মীয়স্বজন, মন্ত্রী, রাজসভার সদস্যরা, প্রজারা—সবাই আমার প্রত্যেক কথা, প্রত্যেক কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করে আমার ভবিষ্যৎ গণনা করে আসছে। সবাই মাথা নেড়ে বলেছে—না, আমাকে দিয়ে এই বিপদের রাজ্য রক্ষা হবে না। আমি নির্বোধ, আমি কিছুই বুঝতে পারি না। সবাই আমাকে অবহেলা করতে লাগল, বাবা আমাকে ঘৃণা করতে লাগলেন। আমার বিষয়ে তিনি একেবারে আশা ছেড়ে দিলেন। একবার খোঁজও নিতেন না!”

সুরমার চোখে জল এল। সে বলল, “আহা! কী করে পারতেন!” তার দুঃখ হল, রাগও হল। সে বলল, “তোমাকে যারা নির্বোধ ভাবত, তারাই নির্বোধ!”

উদয়াদিত্য হালকা হাসলেন, সুরমার চিবুক ধরে তার রাগে লালচে মুখখানা নাড়িয়ে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর হয়ে বললেন—

“না সুরমা, সত্যিই আমার রাজ্যশাসন করার মতো বুদ্ধি নেই। তার যথেষ্ট পরীক্ষাও হয়ে গেছে। আমার যখন ষোলো বছর বয়স, তখন মহারাজ কাজ শেখানোর জন্য হোসেনখালি পরগনার ভার আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ছয় মাসের মধ্যেই ভয়ানক বিশৃঙ্খলা ঘটতে লাগল। খাজনা কমে গেল, প্রজারা আশীর্বাদ করতে লাগল; কর্মচারীরা আমার বিরুদ্ধে রাজার কাছে অভিযোগ করতে লাগল। রাজসভার সকলেরই মত হল, যুবরাজ যখন প্রজাদের এত প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন, তখনই বোঝা যাচ্ছে যে তাঁকে দিয়ে রাজ্যশাসন কখনো সম্ভব হবে না। সেই থেকে মহারাজ আমার দিকে আর বড় একটা তাকাতেন না। বলতেন—ও কুলাঙ্গারটা ঠিক রায়গড়ের খুড়ো বসন্তরায়ের মতো হবে, সেতার বাজিয়ে নেচে বেড়াবে আর রাজ্যটাকে অধঃপাতে দেবে।”

সুরমা আবার বললেন, “প্রিয়তম, সহ্য করে থাকো, ধৈর্য ধরে থাকো। যা-ই হোক, তিনি তো তোমার বাবা। আজকাল রাজ্য জয়, রাজ্য বাড়ানোর একমাত্র দুরাশায় তাঁর সমস্ত হৃদয় পূর্ণ হয়ে আছে, সেখানে স্নেহের জায়গা নেই। যত তাঁর আশা পূর্ণ হতে থাকবে, ততই তাঁর স্নেহের পরিসরও বাড়তে থাকবে।”

যুবরাজ বললেন, “সুরমা, তোমার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, তুমি দূরদর্শী, কিন্তু এবার তুমি ভুল বুঝেছ। এক তো, আশার কোনো শেষ নেই; দ্বিতীয়ত, বাবার রাজ্যের সীমা যতই বাড়তে থাকবে, তিনি যতই রাজ্য লাভ করতে থাকবেন, ততই তা হারানোর ভয় তাঁর মনে বাড়তে থাকবে; রাজকার্য যতই গুরুতর হয়ে উঠবে, ততই আমাকে তার জন্য আরও অনুপযুক্ত মনে করবেন।”

সুরমা ভুল বোঝেনি, শুধু ভুলটাকেই বিশ্বাস করেছিল; বিশ্বাস অনেক সময় বুদ্ধিকেও ছাপিয়ে যায়। সে মনেপ্রাণে চাইত, যেন এমনটাই হয়।

2 সুরমার কাছে উদয়াদিত্যের স্বীকারোক্তি

“চারিদিকে কোথাও কৃপাদৃষ্টি, আবার কোথাও অবহেলা সহ্য করতে না পেরে আমি মাঝে মাঝে পালিয়ে রায়গড়ে দাদামশাইয়ের কাছে যেতাম। বাবা খুব একটা খোঁজ নিতেন না। আঃ, সে কী পরিবর্তন! সেখানে গাছপালা দেখতে পেতাম, গ্রামবাসীদের কুটিরে যেতে পারতাম, দিনরাত রাজবেশ পরে থাকতে হত না। তাছাড়া জানো তো, যেখানে দাদামশাই থাকেন, তার ত্রিসীমানায় বিষাদ, ভাবনা বা কঠোর গাম্ভীর্য টিকতে পারে না। তিনি গেয়ে-বেজে, আমোদ করে চারপাশ পূর্ণ করে রাখেন। চারিদিকে কেবল উল্লাস আর সদ্ভাব। সেখানে গেলেই আমি ভুলে যেতাম যে আমি যশোরের যুবরাজ। সে কী আরামের ভুল! অবশেষে আমার বয়স যখন আঠারো, একদিন রায়গড়ে বসন্তের বাতাস বইছিল, চারিদিকে সবুজ কুঞ্জবন, আর সেই বসন্তেই আমি রুক্মিণীকে দেখলাম।”

সুরমা বলে উঠল, “ও কথা অনেকবার শুনেছি!”

উদয়াদিত্য বললেন, “আরও একবার শোনো। মাঝে মাঝে এক-একটা কথা বুকের ভেতর বিঁধতে থাকে, সেই কথাগুলো যদি বের করে না দিই, তাহলে আর বাঁচব কী করে! সেই কথাটা তোমার কাছে এখনও বলতে লজ্জা করে, কষ্ট হয়। তাই বারবার বলি। যেদিন আর লজ্জা করবে না, কষ্ট হবে না, সেদিন বুঝব আমার প্রায়শ্চিত্ত শেষ হয়েছে, সেদিন আর বলব না।”

সুরমা বলল, “কিসের প্রায়শ্চিত্ত, প্রিয়তম? তুমি যদি পাপ করেও থাকো, তবে সেটা সেই পাপের দোষ, তোমার দোষ নয়। আমি কি তোমাকে চিনি না? অন্তর্যামী কি তোমার মন দেখতে পান না?”

উদয়াদিত্য বলতে লাগলেন, “রুক্মিণীর বয়স আমার চেয়ে তিন বছরের বড়। সে একাকিনী বিধবা। দাদামশাইয়ের অনুগ্রহে সে রায়গড়ে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। মনে নেই, সে কী কৌশলে প্রথমে আমাকে আকর্ষণ করে নিয়ে গিয়েছিল। তখন আমার মনের মধ্যে ভরদুপুরের রোদ জ্বলছিল। এত প্রখর আলো যে কিছুই ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলাম না, চারপাশের জগৎ জ্যোতির্ময় বাষ্পে ঢাকা ছিল। সমস্ত রক্ত যেন মাথায় উঠছিল; কিছুই আশ্চর্য, কিছুই অসম্ভব মনে হত না। পথ, বিপথ, দিক-বিদিক সব একাকার হয়ে গিয়েছিল। এর আগেও আমার এমন কখনও হয়নি, এর পরেও আমার এমন কখনও হয়নি। ঈশ্বরই জানেন, তাঁর কোন উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য এই দুর্বল, বুদ্ধিহীন ক্ষুদ্র হৃদয়ের বিরুদ্ধে একদিনের জন্য গোটা জগৎকে যেন উত্তেজিত করে দিয়েছিলেন। বিশ্বচরাচর যেন একজোট হয়ে আমার এই ছোট্ট হৃদয়টাকে এক মুহূর্তে বিপথে নিয়ে গেল। মুহূর্তমাত্র—তার বেশি নয়। সমস্ত বাইরের জগতের মুহূর্তস্থায়ী এক নিদারুণ আঘাত, আর মুহূর্তের মধ্যে একটি দুর্বল হৃদয়ের মূল ছিঁড়ে গেল, বিদ্যুতের গতিতে সে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। তারপর যখন উঠল, তখন সে ধুলোমাখা, ম্লান। সেই ধুলো আর মুছল না, সেই মলিনতার চিহ্ন আর উঠল না। আমি এমন কী করেছিলাম, বিধাতা, যে এক মুহূর্তের পাপে তুমি আমার জীবনের সমস্ত শুভ্রতাকে কালি করে দিলে? দিনকে রাত করে দিলে? আমার হৃদয়ের ফুলের বাগানে মালতী আর জুঁই ফুলের মুখগুলোও যেন লজ্জায় কালো হয়ে গেল!”

বলতে বলতে উদয়াদিত্যের গৌরবর্ণ মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল, তাঁর আয়ত চোখ আরও বিস্ফারিত হলো, মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটি বিদ্যুৎশিখা যেন কেঁপে উঠল। সুরমা আনন্দ, গর্ব আর কষ্টে বলে উঠল, “আমার মাথা খাও, ও কথা থাক।”

উদয়াদিত্য বললেন, “ধীরে ধীরে যখন রক্ত ঠান্ডা হয়ে এল, সবকিছু যখন ঠিকঠাক দেখতে পেলাম, যখন জগৎটাকে আর উষ্ণ, বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক আর রক্তচক্ষু মাতালের কুয়াশামাখা ঘূর্ণমান স্বপ্নদৃশ্য বলে মনে না হয়ে সত্যিকারের কর্মক্ষেত্র বলে মনে হলো, তখন মনের কী অবস্থা! কোথা থেকে কোথায় পতন! শত সহস্র লক্ষ ক্রোশ পাতালের গভীরে, অন্ধ থেকে অন্ধতর, অন্ধতম রাত্রির মধ্যে চোখের পলকে পড়ে গেলাম। দাদামশাই স্নেহভরে ডেকে পাঠালেন; তাঁর কাছে কী বলে মুখ দেখাই? কিন্তু সেই থেকে আমাকে রায়গড় ছাড়তে হলো। দাদামশাই আমাকে না দেখে থাকতে পারেন না। আমাকে ডেকে পাঠাতেন। আমার এমন ভয় করত যে, আমি কোনোমতেই যেতে পারতাম না। তিনি নিজেই আমাকে আর বোন বিভাকে দেখতে আসতেন। তাঁর কোনো অভিমান ছিল না, কিছুই না। জিজ্ঞেসও করতেন না, কেন যাইনি। আমাদের দেখতেন, আমোদ-উল্লাস করতেন আর চলে যেতেন।”

উদয়াদিত্য হালকা হেসে, অত্যন্ত মৃদু ও কোমল প্রেমে তাঁর বড় বড় চোখ দুটি প্লাবিত করে সুরমার মুখের দিকে তাকালেন। সুরমা বুঝল, এবার কী কথা আসছে। তার মুখ নত হয়ে এল, সে কিছুটা চঞ্চল হয়ে পড়ল। যুবরাজ দুই হাতে তার দুই গাল ধরে নত মুখখানি তুলে ধরলেন; আরও কাছে গিয়ে বসলেন; মুখখানি নিজের কাঁধে ধীরে ধীরে রাখলেন। তার কোমর বাম হাতে জড়িয়ে ধরে গভীর, প্রশান্ত প্রেমে তার কপালে চুম্বন করে বললেন—

“তারপর কী হলো, সুরমা, বলো তো? এই বুদ্ধিতে উজ্জ্বল, স্নেহ-প্রেমে কোমল, হাসিতে ঝলমলে আর প্রশান্তিতে নির্মল মুখখানি কোথা থেকে উদয় হলো? আমার সেই গভীর অন্ধকার ভাঙার কোনো আশা ছিল কি? তুমি আমার ঊষা, আমার আলো, আমার আশা। কী মায়ামন্ত্রে সেই আঁধার দূর করলে?” যুবরাজ বারবার সুরমার মুখে চুম্বন করলেন। সুরমা কিছুই বলল না, আনন্দে তার চোখ জলে ভরে এল। যুবরাজ বললেন—

“এতদিন পর আমি সত্যিকারের আশ্রয় পেলাম। তোমার কাছেই প্রথম শুনলাম যে আমি নির্বোধ নই, সেটাই বিশ্বাস করলাম, সেটাই বুঝতে পারলাম। তোমারই কাছে শিখলাম যে বুদ্ধি অন্ধকারময়, এবড়োখেবড়ো, বাঁকাচোরা সরু গলির মতো নয়, বরং রাজপথের মতো সোজা, সমান ও প্রশস্ত। আগে আমি নিজেকে ঘৃণা করতাম, নিজেকে অবহেলা করতাম। কোনো কাজ করতে সাহস পেতাম না। মন যদি বলত, এটাই ঠিক, আত্মবিশ্বাসের অভাব বলত, ওটা ঠিক না-ও হতে পারে। যে যেমন ব্যবহার করত, তাই সয়ে থাকতাম, নিজে কিছু ভাবতে চেষ্টা করতাম না। এতদিন পর আমার মনে হলো, আমিও কিছু, আমিও কেউ। এতদিন আমি আড়ালে ছিলাম, তুমি আমাকে খুঁজে বের করেছ, সুরমা। তুমি আমাকে আবিষ্কার করেছ। এখন আমার মন যা ভালো বলে, সঙ্গে সঙ্গে তা আমি করতে চাই। তোমার উপর আমার এমন বিশ্বাস যে, তুমি যখন আমাকে বিশ্বাস করো, তখন আমিও নিজেকে নির্ভয়ে বিশ্বাস করতে পারি। ওই কোমল শরীরে এত শক্তি কোথায় ছিল যে তুমি আমাকেও বলীয়ান করে তুলেছ?”

অপরিসীম নির্ভরতায় সুরমা স্বামীর বুক জড়িয়ে ধরল। কী সম্পূর্ণ আত্মত্যাগের দৃষ্টিতে সে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে রইল! তার চোখ যেন বলল, “আমার আর কিছুই নেই, কেবল তুমি আছ, তাই আমার সব আছে!”

ছোটবেলা থেকে উদয়াদিত্য আত্মীয়স্বজনের উপেক্ষা সয়ে এসেছেন। তাই মাঝে মাঝে এক-একদিন নিস্তব্ধ গভীর রাতে সুরমার কাছে সেই শতবার বলা পুরোনো জীবনের কাহিনি ধাপে ধাপে আলোচনা করতে তাঁর বড় ভালো লাগে।

উদয়াদিত্য বললেন, “এমন করে আর কতদিন চলবে সুরমা? এদিকে রাজসভায় সভাসদরা কেমন একরকম করুণার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়, ওদিকে অন্তঃপুরে মা তোমাকে লাঞ্ছনা দিচ্ছেন; দাসদাসীরা পর্যন্ত তোমাকে তেমন সম্মান করে না। আমি কাউকেই ভালো করে কিছু বলতে পারি না, চুপ করে থাকি, সহ্য করে যাই। তোমার স্বভাব তেজস্বী, কিন্তু তুমিও নীরবে সয়ে যাও। যখন তোমাকে সুখীই করতে পারলাম না, আমার থেকে তোমাকে কেবল অপমান আর কষ্টই সহ্য করতে হলো, তখন আমাদের এ বিয়ে না হলেই ভালো ছিল।”

সুরমা বলল, “সে কী কথা, নাথ? এই সময়েই তো সুরমাকে প্রয়োজন। সুখের সময়ে আমি তোমার কী করতে পারতাম? সুখের সময়ে সুরমা তো বিলাসের সামগ্রী, খেলার জিনিস। সব দুঃখ ছাপিয়ে আমার মনে এই সুখ জাগছে যে আমি তোমার কাজে লাগছি, তোমার জন্য দুঃখ সহ্য করার যে অতুলনীয় আনন্দ আছে, সেই আনন্দ আমি উপভোগ করছি। কেবল দুঃখ এই যে, তোমার সমস্ত কষ্ট কেন আমি বহন করতে পারলাম না?”

যুবরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি নিজের জন্য তেমন ভাবি না। সবকিছু সয়ে গেছে। কিন্তু আমার জন্য তুমি কেন অপমান সহ্য করবে? তুমি সত্যিকারের স্ত্রীর মতো আমার দুঃখের সময়ে সান্ত্বনা দিয়েছ, ক্লান্তির সময়ে বিশ্রাম দিয়েছ, কিন্তু আমি স্বামীর মতো তোমাকে অপমান আর লজ্জা থেকে রক্ষা করতে পারলাম না। তোমার বাবা, শ্রীপুরের রাজা, আমার বাবাকে প্রধান বলে না মানায়, নিজেকে যশোরের অধীনে স্বীকার না করায়, বাবা তোমার প্রতি অবহেলা দেখিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চান। তোমাকে কেউ অপমান করলে তিনি কানেই তোলেন না। তিনি মনে করেন, তোমাকে যে পুত্রবধূ করেছেন, এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট। এক-একবার মনে হয়, আর পেরে উঠছি না, সবকিছু ছেড়ে তোমাকে নিয়ে চলে যাই। এতদিন হয়তো চলেও যেতাম, কেবল তুমিই আমাকে ধরে রেখেছ।”

3 বিভার দুঃসংবাদ ও উদয়াদিত্যের প্রস্থান

রাত গভীর হল। সন্ধ্যার অনেক তারা অস্ত গেল, গভীর রাতের অনেক তারা আকাশে উঠল। দুর্গের ফটকে থাকা প্রহরীদের পায়ের শব্দ দূর থেকে শোনা যাচ্ছে। সমস্ত জগৎ গভীর ঘুমে মগ্ন। শহরের সব প্রদীপ নিভে গেছে; ঘরের দরজা বন্ধ; হঠাৎ দু-একটা শেয়াল ছাড়া আর কোনো জনপ্রাণী নেই। উদয়াদিত্যের শোবার ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। হঠাৎ বাইরে থেকে কে যেন দরজায় আঘাত করতে লাগল। ব্যস্তসমস্ত হয়ে যুবরাজ দরজা খুলে দিলেন। “কেন? বিভা? কী হয়েছে? এত রাতে এখানে এসেছিস কেন?”

পাঠকরা আগেই জেনেছেন, বিভা উদয়াদিত্যের বোন। বিভা বলল—“এতক্ষণে হয়তো সর্বনাশ হয়ে গেল!” সুরমা ও উদয়াদিত্য একসঙ্গে জিজ্ঞেস করে উঠলেন, “কেন, কী হয়েছে?” বিভা ভয়ে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে কিছু বলল। বলতে বলতে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদে উঠে বলল—“দাদা, কী হবে?”

উদয়াদিত্য বললেন, “আমি তাহলে চললাম!”

বিভা বলে উঠল, “না না, তুমি যেয়ো না।” উদয়াদিত্য বললেন, “কেন বিভা?”

বিভা বলল, “বাবা যদি জানতে পারেন? তোমার ওপর যদি রাগ করেন?”

সুরমা বলল, “ছিঃ বিভা! এখন কি এসব ভাবার সময়?”

উদয়াদিত্য পোশাক পরে কোমরে তরবারি বেঁধে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। বিভা তাঁর হাত ধরে বলল, “দাদা, তুমি যেয়ো না, তুমি লোক পাঠিয়ে দাও, আমার খুব ভয় করছে।”

উদয়াদিত্য বললেন—“বিভা, এখন বাধা দিস না; আর সময় নেই।” এই কথা বলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন।

বিভা সুরমার হাত ধরে বলল, “কী হবে ভাই? বাবা যদি টের পান?”

সুরমা বলল, “আর কী হবে? স্নেহ বোধহয় আর কিছুই বাকি নেই। যেটুকু আছে, সেটুকু চলেও গেলে খুব একটা ক্ষতি হবে না।”

বিভা বলল, “না ভাই, আমার খুব ভয় করছে। বাবা যদি কোনো ক্ষতি করেন? যদি শাস্তি দেন?”

সুরমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“আমার বিশ্বাস—সংসারে যার কেউই সহায় নেই, নারায়ণ তার সহায়। হে প্রভু, তোমার নামে যেন কলঙ্ক না হয়! আমার এই বিশ্বাস তুমি ভেঙো না!”

1 उदयादित्य का विलाप और सुरमा की सांत्वना

रात बहुत हो चुकी है। ग्रीष्मकाल है। हवा रुक गई है। पेड़ का एक पत्ता भी नहीं हिल रहा है। यशोर के युवराज, प्रतापादित्य के ज्येष्ठ पुत्र, उदयादित्य अपने शयन-कक्ष की खिड़की पर बैठे हैं। उनके पास उनकी पत्नी सुरमा हैं।

सुरमा ने कहा, “प्रियतम, सहन कीजिए, धैर्य रखिए। एक दिन सुख के दिन आएँगे।”

उदयादित्य ने कहा, “मैं तो और कोई सुख नहीं चाहता, मैं चाहता हूँ, काश मैं राजमहल में पैदा न हुआ होता, युवराज न होता, यशोर-नरेश की सबसे छोटी, सबसे तुच्छ प्रजा की भी प्रजा होता, उनका ज्येष्ठ पुत्र, उनके सिंहासन, उनके समस्त धन, मान, यश, प्रभाव और गौरव का एकमात्र उत्तराधिकारी न होता! कौन-सी तपस्या करने से यह सारा अतीत उलटा जा सकता है।”

सुरमा अत्यंत व्याकुल होकर युवराज का दाहिना हाथ अपने दोनों हाथों में लेकर दबा लिया, और उनके मुख की ओर देखकर धीरे-धीरे गहरी साँस ली। युवराज की इच्छा पूरी करने के लिए वह प्राण दे सकती हैं, लेकिन प्राण देकर भी यह इच्छा पूरी नहीं कर सकतीं, यही दुःख है।

युवराज ने कहा, “सुरमा, राजा के घर जन्म लेने के कारण ही मैं सुखी नहीं हो सका। राजा के घर में सब शायद केवल उत्तराधिकारी बनकर जन्म लेते हैं, संतान बनकर नहीं। पिताजी बचपन से ही मुझे हर पल परखकर देख रहे हैं कि मैं उनके अर्जित यश-मान को बनाए रख पाऊँगा या नहीं, वंश का नाम रोशन कर पाऊँगा या नहीं, राज्य का गुरुभार वहन कर पाऊँगा या नहीं। मेरे हर कार्य, हर हाव-भाव को वे परीक्षा की दृष्टि से देखते आए हैं, स्नेह की दृष्टि से नहीं। स्वजन, मंत्री, राजसभासदगण, प्रजा, सब मेरी हर बात, हर काम को बारीकी से देखकर मेरे भविष्य की गणना करते आए हैं। सबने सिर हिलाकर कहा—नहीं, मुझसे इस संकटग्रस्त राज्य की रक्षा नहीं होगी। मैं निर्बुद्धि हूँ, मैं कुछ नहीं समझ पाता। सभी मेरी उपेक्षा करने लगे, पिताजी मुझसे घृणा करने लगे। उन्होंने मुझसे पूरी तरह आशा छोड़ दी। एक बार भी मेरी खोज-खबर नहीं लेते थे!”

सुरमा की आँखों में आँसू आ गए। उसने कहा, “आह! ऐसा कैसे कर सकते थे!” उसे दुःख हुआ, उसे क्रोध आया, उसने कहा, “तुम्हें जो निर्बुद्धि समझते थे, वे ही निर्बुद्धि हैं!”

उदयादित्य थोड़ा मुस्कुराए, सुरमा की ठोड़ी पकड़कर उसके क्रोध से लाल मुख को हिला दिया। क्षण भर में गंभीर होकर उन्होंने कहा—

“नहीं सुरमा, सचमुच मुझमें राज्य-शासन की बुद्धि नहीं है। इसकी पर्याप्त परीक्षा हो चुकी है। जब मैं सोलह वर्ष का था, तब महाराज ने काम सिखाने के लिए हुसैनख़ाली परगने का भार मेरे हाथों में सौंप दिया था। छह महीने के भीतर ही भारी अव्यवस्था होने लगी। लगान कम हो गया, प्रजा आशीर्वाद देने लगी; कर्मचारियों ने मेरे विरुद्ध राजा के पास शिकायतें करना शुरू कर दिया। राजसभा में सभी का यही मत हुआ कि युवराज जब प्रजा के इतने प्रिय हो गए हैं, तो यह स्पष्ट है कि उनके द्वारा राज्य-शासन कभी संभव नहीं हो पाएगा। उसी समय से महाराज मेरी ओर अधिक ध्यान नहीं देते थे। कहते थे—यह कुलांगार ठीक रायगढ़ के चाचा बसंत राय जैसा होगा, सितार बजाकर नाचता-गाता फिरेगा और राज्य को रसातल में मिला देगा।”

सुरमा ने फिर कहा, “प्रियतम, सहन कीजिए, धैर्य रखिए। कुछ भी हो, हैं तो वे पिता ही। आजकल राज्य-अर्जन, राज्य-वृद्धि की एकमात्र दुराशा से उनका सारा हृदय भरा हुआ है, वहाँ स्नेह के लिए कोई स्थान नहीं है। जैसे-जैसे उनकी आशा पूरी होती जाएगी, वैसे-वैसे उनके स्नेह का राज्य भी बढ़ता जाएगा।”

युवराज ने कहा, “सुरमा, तुम्हारी बुद्धि तीव्र है, दूरदर्शी है, लेकिन इस बार तुमने गलत समझा है। एक तो, आशा का कोई अंत नहीं; दूसरे, पिताजी के राज्य की सीमा जितनी बढ़ती जाएगी, वे जितना राज्य प्राप्त करते जाएँगे, उतना ही उसे खोने का भय उनके मन में बढ़ता जाएगा; राज-कार्य जितना गंभीर होता जाएगा, उतना ही वे मुझे उसके अयोग्य समझेंगे।”

सुरमा ने गलत नहीं समझा था, उसने केवल गलत विश्वास कर लिया था; विश्वास बुद्धि को भी लाँघ जाता है। वह एकाग्र मन से आशा करती थी कि काश ऐसा ही हो।

2 सुरमा के सामने उदयदित्य की स्वीकारोक्ति

“चारों ओर कहीं कृपादृष्टि तो कहीं उपेक्षा सहन न कर पाने के कारण मैं कभी-कभी भागकर रायगढ़ में दादा महाशय के पास चला जाता था! पिताजी ज़्यादा खोज-खबर नहीं लेते थे। आह! वह क्या परिवर्तन था। वहाँ मैं पेड़-पौधे देख पाता था, ग्रामवासियों की कुटियों में जा पाता था, दिन-रात राजसी वेश में नहीं रहना पड़ता था। इसके अलावा, तुम तो जानती ही हो, जहाँ दादा महाशय रहते हैं, उसके आसपास भी उदासी, चिंता या कठोर गंभीरता टिक नहीं सकती। गा-बजाकर, आमोद-प्रमोद करके वे चारों ओर का वातावरण भर देते थे। चारों ओर उल्लास, सद्भाव, वहाँ जाते ही मैं भूल जाता था कि मैं यशोर का युवराज हूँ। वह भूल भी कितनी सुखद थी! अंत में, जब मेरी आयु अठारह वर्ष की थी, एक दिन रायगढ़ में वसंत की हवा बह रही थी, चारों ओर हरे-भरे कुंजवन थे और उसी वसंत में मैंने रुक्मिणी को देखा।”

सुरमा बोल उठी, “यह बात कई बार सुन चुकी हूँ!”

उदयादित्य, “एक बार और सुन लो। कभी-कभी कुछ बातें मन में डंक मारती रहती हैं, अगर उन बातों को बाहर न निकालूँ, तो भला जीवित कैसे रहूँगा। वह बात तुमसे कहते हुए आज भी लज्जा आती है, कष्ट होता है, इसीलिए बार-बार कहता हूँ, जिस दिन और लज्जा नहीं आएगी, कष्ट नहीं होगा, उस दिन समझूँगा कि मेरा प्रायश्चित्त समाप्त हो गया, उस दिन और नहीं कहूँगा।”

सुरमा, “कैसा प्रायश्चित्त, प्रियतम? यदि तुमने पाप किया भी है तो वह पाप का दोष है, तुम्हारा दोष नहीं। क्या मैं तुम्हें नहीं जानती? क्या अंतर्यामी तुम्हारा मन नहीं देख सकते?”

उदयादित्य कहने लगे, “रुक्मिणी की आयु मुझसे तीन वर्ष अधिक थी। वह एक अकेली विधवा थी। दादा महाशय की कृपा से उसे रायगढ़ में रहने का आश्रय मिला था। मुझे याद नहीं कि उसने किस कौशल से मुझे पहले आकर्षित कर लिया। तब मेरे मन में दोपहर की किरणें जल रही थीं। इतना प्रखर प्रकाश था कि कुछ भी ठीक से देख नहीं पा रहा था, चारों ओर की दुनिया ज्योतिर्मय धुंध से ढकी हुई थी। सारा रक्त जैसे सिर पर चढ़ गया था; कुछ भी आश्चर्यजनक, कुछ भी असंभव नहीं लगता था; पथ, कुपथ, दिशा-विदिशा सबने एक ही आकार धारण कर लिया था। इससे पहले मेरे साथ ऐसा कभी नहीं हुआ था, और इसके बाद भी कभी नहीं हुआ। जगदीश्वर ही जानते हैं कि अपना कौन-सा उद्देश्य पूरा करने के लिए उन्होंने इस छोटे, दुर्बल, बुद्धिहीन हृदय के विरुद्ध एक दिन के लिए जैसे सारे संसार को उत्तेजित कर दिया था, पूरा विश्व जैसे एक होकर मेरे इस छोटे से हृदय को एक क्षण में कुमार्ग पर ले गया। बस एक क्षण— और अधिक नहीं, समस्त बाहरी दुनिया का एक क्षणिक और दारुण आघात, और एक क्षण में ही एक दुर्बल हृदय की जड़ें विदीर्ण हो गईं, वह बिजली की गति से धूल में जा मिला। उसके बाद जब उठा तो धूल-धूसरित, म्लान था, वह धूल फिर कभी नहीं पोंछी जा सकी, वह मलिनता का चिह्न फिर कभी नहीं मिटा। हे विधाता, मैंने ऐसा क्या किया था कि एक पाप ने एक क्षण में मेरे जीवन की सारी सफेदी को काला कर दिया? दिन को रात बना दिया? मेरे हृदय के पुष्प-वन में मालती और जुही के फूलों के मुख भी जैसे लज्जा से काले पड़ गए!”

कहते-कहते उदयादित्य का गोरा मुखड़ा रक्तवर्ण हो गया, उनके विशाल नेत्र और भी फैल गए, सिर से पाँव तक एक बिजली की लहर काँप उठी। सुरमा ने हर्ष, गर्व और कष्ट से कहा, “मेरी सौगंध, यह बात रहने दीजिए।”

उदयादित्य, “धीरे-धीरे जब रक्त ठंडा हुआ, जब सब कुछ उचित परिमाण में देख पाया; जब संसार किसी गर्म, घूमते हुए मस्तिष्क वाले, लाल आँखों वाले शराबी के धुंधले, घूमते हुए स्वप्न-दृश्य जैसा न लगकर वास्तविक कार्यक्षेत्र जैसा लगने लगा, तब मन की क्या अवस्था थी। कहाँ से कहाँ पतन हुआ! सैकड़ों-हज़ारों-लाखों कोस पाताल की गहराई में, अंधी, और अंधी, घोर अंधकारमयी रात्रि में, पलक झपकते ही मैं गिर गया। दादा महाशय ने स्नेह से बुलाकर ले गए; उनके सामने भला क्या मुँह दिखाता? लेकिन तभी से मुझे रायगढ़ छोड़ना पड़ा। दादा महाशय मुझे देखे बिना रह नहीं सकते थे। वे मुझे बुलवा भेजते थे। मुझे ऐसा डर लगता था कि मैं किसी भी तरह नहीं जा पाता था। वे स्वयं मुझे और बहन विभा को देखने आते थे। कोई अभिमान नहीं, कुछ नहीं। पूछते भी नहीं थे कि मैं क्यों नहीं गया। हमें देखते, आमोद-उल्लास करते और चले जाते।”

उदयादित्य हल्का सा मुस्कुराकर अत्यंत मृदु, कोमल प्रेम से अपनी बड़ी-बड़ी आँखों को भरकर सुरमा के मुख की ओर देखा। सुरमा समझ गई कि अब कौन सी बात आने वाली है। उसका मुख झुक गया; वह थोड़ी चंचल हो गई। युवराज ने दोनों हाथों से उसके दोनों गालों को पकड़कर झुके हुए मुख को ऊपर उठाया; और अधिक निकट जाकर बैठ गए; उसके मुख को धीरे-धीरे अपने कंधे पर रख लिया। उसकी कमर को बाएँ हाथ से घेर लिया और गहरे, प्रशांत प्रेम से उसके गाल चूमकर बोले—

“फिर क्या हुआ, सुरमा, बताओ तो? यह बुद्धि से दीप्तिमान, स्नेह-प्रेम से कोमल, हास्य से उज्ज्वल और प्रशांत भाव से निर्मल मुख कहाँ से उदय हुआ? क्या मेरे उस गहरे अंधकार के टूटने की कोई आशा थी? तुम मेरी उषा हो, मेरा प्रकाश हो, मेरी आशा हो, किस माया-मंत्र से तुमने वह अंधकार दूर कर दिया?” युवराज ने बार-बार सुरमा का मुख चूमा। सुरमा ने कुछ नहीं कहा, आनंद से उसकी आँखें आँसुओं से भर आईं; युवराज ने कहा,—

“इतने दिनों बाद मुझे सच्चा आश्रय मिला। तुमसे ही मैंने पहली बार सुना कि मैं निर्बुद्धि नहीं हूँ, उसी पर विश्वास किया, वही समझ सका। तुम्हीं से सीखा कि बुद्धि अंधकारमयी तंग गली की तरह टेढ़ी-मेढ़ी, ऊँची-नीची नहीं, बल्कि राजपथ की तरह सीधी, समतल और चौड़ी होती है। पहले मैं स्वयं से घृणा करता था, स्वयं की उपेक्षा करता था। कोई भी काम करने का साहस नहीं होता था। यदि मन कहता कि यही सही है, तो आत्म-संदेही संस्कार कहता कि यह सही नहीं भी हो सकता है। जो जैसा व्यवहार करता, वही सह लेता था, खुद कुछ सोचने की कोशिश नहीं करता था। इतने दिनों बाद मुझे लगा कि मैं कुछ हूँ, मैं कोई हूँ। इतने दिन मैं अदृश्य था, तुमने मुझे बाहर निकाला है, सुरमा, तुमने मेरी खोज की है, अब मेरा मन जिसे अच्छा कहता है, उसे मैं तुरंत पूरा करना चाहता हूँ। तुम पर मेरा ऐसा विश्वास है कि जब तुम मुझ पर विश्वास करती हो, तब मैं भी स्वयं पर निर्भय होकर विश्वास कर सकता हूँ। उस सुकुमार शरीर में इतनी शक्ति कहाँ थी कि तुमने मुझे भी बलवान बना दिया?”

किंतु असीम निर्भरता के भाव से सुरमा ने पति की छाती को घेर लिया। कितनी संपूर्ण आत्म-विसर्जन वाली दृष्टि से वह उनके मुख की ओर देखती रही! उसकी आँखों ने कहा, “मेरा और कुछ नहीं है, केवल तुम हो, इसलिए मेरा सब कुछ है!”

बचपन से ही उदयादित्य अपने रिश्तेदारों की उपेक्षा सहते आ रहे हैं, कभी-कभी किसी-किसी दिन शांत, गहरी रात में सुरमा के पास अपनी वही सैकड़ों बार कही हुई पुरानी जीवन-कहानी को खंड-खंड करके, सीढ़ी-दर-सीढ़ी चर्चा करना उन्हें बहुत अच्छा लगता है।

उदयादित्य ने कहा, “इस तरह और कितने दिन चलेगा, सुरमा? इधर राजसभा में सभासद एक अजीब तरह की कृपादृष्टि से मेरी ओर देखते हैं, और उधर अंतःपुर में माँ तुम्हें अपमानित कर रही हैं; दास-दासियाँ तक तुम्हारा वैसा सम्मान नहीं करतीं। मैं किसी को ठीक से कुछ कह नहीं पाता, चुप रहता हूँ, सहन करता जाता हूँ। तुम्हारा स्वभाव तेजस्वी है, लेकिन तुम भी चुपचाप सह जाती हो। जब मैं तुम्हें सुखी नहीं रख सका, मेरी वजह से तुम्हें केवल अपमान और कष्ट ही सहना पड़ा, तब तो हमारा यह विवाह न होता तो ही अच्छा था।”

सुरमा,—“यह कैसी बातें हैं, नाथ? इसी समय तो सुरमा की आवश्यकता है। सुख के समय में मैं तुम्हारे किस काम आती? सुख के समय में सुरमा तो विलास की वस्तु होती, खेलने की चीज़ होती। सारे दुखों को पार करके मेरे मन में यही सुख जाग रहा है कि मैं तुम्हारे काम आ रही हूँ, तुम्हारे लिए दुःख सहने में जो अतुलनीय आनंद है, मैं उसी आनंद का उपभोग कर रही हूँ। बस दुःख यही है कि मैं तुम्हारा सारा कष्ट क्यों नहीं उठा सकी?”

युवराज कुछ क्षण चुप रहकर बोले, “मैं अपने लिए उतना नहीं सोचता। सब कुछ सहने की आदत हो गई है। लेकिन मेरे लिए तुम क्यों अपमान सहोगी? तुमने एक सच्ची पत्नी की तरह मेरे दुःख के समय सांत्वना दी है, थकान के समय विश्राम दिया है, लेकिन मैं एक पति की तरह तुम्हें अपमान और लज्जा से नहीं बचा सका। तुम्हारे पिता, श्रीपुर के राजा, मेरे पिता को प्रधान नहीं मानते, स्वयं को यशोर के छत्र के अधीन स्वीकार नहीं करते, इसलिए पिताजी तुम्हारे प्रति उपेक्षा दिखाकर अपना प्रभुत्व बनाए रखना चाहते हैं। तुम्हें कोई अपमानित करे तो वे ध्यान ही नहीं देते। वे सोचते हैं कि तुम्हें जो अपनी पुत्रवधू बनाया है, वही तुम्हारे लिए बहुत है। कभी-कभी लगता है, अब और नहीं सहा जाता, सब कुछ छोड़कर तुम्हें लेकर चला जाऊँ। इतने दिनों में शायद चला भी जाता, बस तुमने ही मुझे रोक रखा है।”

3 विभा का अशुभ समाचार और उदयादित्य का प्रस्थान

रात गहरी हो गई। संध्या के कई तारे अस्त हो गए, और देर रात के कई तारे उदित हुए। प्राचीर के फाटक पर स्थित प्रहरियों के पदचाप दूर से सुनाई दे रहे थे। सारा संसार सोया हुआ था। नगर के सारे दीपक बुझ गए थे; घरों के द्वार बंद थे; इक्का-दुक्का सियारों को छोड़कर एक भी व्यक्ति नहीं था। उदयादित्य के शयनकक्ष का द्वार बंद था। सहसा बाहर से किसी ने द्वार पर आघात करना शुरू कर दिया। हड़बड़ाए हुए युवराज ने द्वार खोल दिया। “क्यों? विभा? क्या हुआ है? इतनी रात को यहाँ क्यों आई हो?”

पाठक पहले ही जान चुके हैं कि विभा उदयादित्य की बहन हैं। विभा ने कहा—“लगता है अब तक सर्वनाश हो गया!” सुरमा और उदयादित्य ने एक साथ पूछा, “क्यों, क्या हुआ है?” विभा ने भय से कांपते स्वर में धीरे-धीरे कुछ कहा। कहते-कहते वह और न रह सकी, रो पड़ी और बोली— “दादा, क्या होगा?”

उदयादित्य ने कहा, “तो मैं चलता हूँ!” विभा बोल उठी, “नहीं, नहीं, तुम मत जाओ।”

उदयादित्य: “क्यों विभा?”

विभा: “यदि पिताजी को पता चल गया तो? यदि वे तुम पर क्रोधित हुए तो?”

सुरमा ने कहा, “छिः विभा! क्या यह सब सोचने का समय है?”

उदयादित्य ने वस्त्र आदि पहनकर कमरबंद में तलवार बांधी और जाने की तैयारी की। विभा ने उनका हाथ पकड़कर कहा, “दादा, तुम मत जाओ, किसी आदमी को भेज दो, मुझे बहुत डर लग रहा है।”

उदयादित्य ने कहा— “विभा, अभी बाधा मत दो; अब और समय नहीं है।” यह कहकर वे तुरंत बाहर निकल गए।

विभा ने सुरमा का हाथ पकड़कर कहा, “क्या होगा भाभी? अगर पिताजी को पता चल गया तो?”

सुरमा ने कहा, “और क्या होगा? स्नेह तो अब कुछ भी शेष नहीं है। जो थोड़ा-बहुत है, उसके चले जाने से भी कोई बड़ा नुकसान नहीं होगा।”

विभा ने कहा, “नहीं भाभी, मुझे बहुत डर लग रहा है। यदि पिताजी ने किसी प्रकार की हानि पहुँचाई तो? यदि उन्होंने दंड दिया तो?”

सुरमा ने गहरी सांस लेकर कहा— “मेरा विश्वास है—संसार में जिसका कोई सहायक नहीं होता, नारायण उसके सबसे बड़े सहायक होते हैं। हे प्रभु, आपके नाम पर कलंक न लगे! मेरे इस विश्वास को टूटने मत देना!”

1 Udayaditya's Lament and Surma's Consolation

It was late at night. It was summertime. The wind had stopped blowing. Not even a leaf on the trees was stirring. The crown prince of Jessore, Pratapaditya's eldest son, Udayaditya, was sitting at the window of his bedchamber. Beside him was his wife, Surma.

Surma said, “Dearest, bear with it, be patient. A day of happiness will come.”

Udayaditya said, “I desire no other happiness. I wish I had not been born in a royal palace, had not been the crown prince, had been a subject of the lowliest, most insignificant subject of the ruler of Jessore—not his eldest son, not the sole heir to his throne, to all his wealth, honor, fame, influence, and glory! What penance could I perform to reverse this past?”

Surma, becoming very distressed, took the prince's right hand in both of her hands and held it tightly, and looking at his face, she let out a long, slow sigh. She could give her life to fulfill the prince's wish, but her sorrow was that even giving her life could not fulfill this wish.

The prince said, “Surma, it is because I was born into a king's family that I could not be happy. It seems that in a king's family, everyone is born only as an heir, not as a son. From my childhood, Father has been testing me at every moment, to see whether I can maintain the honor and fame he has earned, whether I can bring glory to the lineage, whether I can bear the heavy burden of the kingdom. He has been observing my every action, every gesture, with the eyes of an examiner, not with the eyes of affection. Relatives, ministers, courtiers, and subjects have all been scrutinizing my every word and deed to foretell my future. Everyone shook their heads and said—no, this perilous kingdom cannot be protected by me. I am a fool, I understand nothing. Everyone began to neglect me, Father began to despise me. He gave up on me completely. He wouldn't even check on me once!”

Tears came to Surma's eyes. She said, “Ah! How could he!” She felt sad, she felt angry, she said, “Those who thought you a fool are the fools themselves!”

Udayaditya smiled slightly, held Surma's chin, and gently shook her face, which was flushed with anger. In a moment, he became serious and said—

“No, Surma, truly I do not have the intellect for ruling a kingdom. That has been tested enough. When I was sixteen, the Maharaj, to teach me the work, entrusted the responsibility of the Hosenkhali pargana to my hands. Within six months, terrible disorder began to arise. The revenue collection decreased, the subjects began to bless me; the officials began to complain against me to the king. The consensus in the royal court was that since the crown prince has become so beloved by the subjects, it is clear that he will never be capable of ruling the kingdom. From then on, the Maharaj hardly ever looked at me. He would say—That disgrace to the family will be just like his uncle Basanta Ray of Raigarh; he will play the sitar and dance around and drive the kingdom to ruin.”

Surma said again, “Dearest, bear with it, be patient. After all, he is your father. Nowadays, his entire heart is filled with the sole, desperate hope of acquiring and expanding the kingdom; there is no room for affection there. As his ambitions are fulfilled, the realm of his affection will grow.”

The prince said, “Surma, your intellect is sharp and far-sighted, but this time you have misunderstood. Firstly, there is no end to ambition; secondly, the more my father's kingdom expands, the more territory he acquires, the more the fear of losing it will grow in his mind; the more serious the affairs of the state become, the more unfit he will consider me for them.”

Surma had not misunderstood, she had merely believed wrongly; faith can transcend intellect. She single-mindedly hoped that it would be so.

2 The Confession of Udayaditya to Surma

“Unable to bear the pitying glances from some and the neglect from others, I would occasionally run away to my grand-uncle’s place in Raigarh! Father rarely bothered to look for me. Ah, what a change that was. There, I could see trees and plants, I could visit the villagers’ cottages, and I didn’t have to wear royal attire day and night. Besides, you know that wherever Grand-uncle is, no trace of sorrow, anxiety, or stern gravity can remain. He fills the surroundings with singing, playing, and merriment. There was cheerfulness and goodwill all around; whenever I went there, I would forget that I was the Yubaraj of Jessore. What a welcome oblivion! Finally, when I was eighteen, a spring breeze was blowing in Raigarh; there were green groves all around, and in that spring, I saw Rukmini.”

Surma exclaimed, “I have heard that story many times!”

Udayaditya said, “Hear it once more. At times, a certain story keeps stinging my heart, and if I don’t let these words out, how will I live? I am still ashamed to tell you that story, it still pains me, so I tell it again and again. The day I feel no shame, no pain, that day I will know my penance is over, and I will not say it again.”

Surma said, “Penance for what, my dearest? If you have sinned, it is the sin's fault, not yours. Don't I know you? Does the one who sees into your heart not see your mind?”

Udayaditya continued, “Rukmini was three years older than me. She was a lone widow. By Grand-uncle’s grace, she was allowed to live in Raigarh. I don't remember by what trick she first drew me to her. At that time, the midday sun was blazing in my mind. The light was so harsh that I couldn't see anything clearly; the world around me was shrouded in a luminous vapor. All the blood seemed to rush to my head; nothing felt surprising, nothing impossible; path, wrong path, direction, and misdirection all merged into one. Nothing like this had ever happened to me before, and nothing like it ever happened again. Jagadishwar knows what purpose of His He was fulfilling by inciting the entire universe against this small, weak, foolish heart for a single day. The whole of creation, as if in unison, led my tiny heart astray in a moment. Just a moment—no more. A momentary, cruel blow from the entire outer world, and in an instant, the very root of a fragile heart was torn apart; with the speed of lightning, it fell and embraced the dust. When it rose again, it was dust-covered, tarnished. That dust was never wiped away; the stain of that tarnish never lifted. What had I done, O Vidhat, that for my sin you blackened all the whiteness of my life in a single moment? Turned day into night? In my heart’s flower garden, even the faces of the jasmine flowers seemed to turn black with shame!”

As he spoke, Udayaditya’s fair face turned crimson, his large eyes widened further, and a tremor like a bolt of lightning ran from his head to his feet. Surma, with a mix of joy, pride, and pain, said, “Swear on my head, let that be.”

Udayaditya said, “Slowly, when my blood cooled, when I could see everything in its proper measure; when the world no longer seemed like the misty, spinning dreamscape of a hot-headed, bloodshot-eyed drunkard, but a real field of action, what a state my mind was in! What a fall from such a height! In the blink of an eye, I fell hundreds of thousands of millions of leagues into the abyss of the netherworld, into a dark, darker, darkest night. Grand-uncle affectionately called me to him; how could I show my face to him? But from then on, I had to leave Raigarh. Grand-uncle couldn't bear not seeing me. He would send for me. I was so afraid that I could not bring myself to go. He himself would come to see me and my sister Vibha. No pride, nothing. He wouldn't even ask why I hadn't come. He would see us, make merry, and leave.”

Udayaditya smiled slightly, his large eyes flooding with a very gentle, tender love as he looked at Surma’s face. Surma understood what words were coming now. Her face lowered; she grew slightly restless. The Yubaraj took her cheeks in both his hands and lifted her bowed face; he moved closer to her; he gently laid her head on his shoulder. He wrapped his left arm around her waist and, with deep, tranquil love, kissed her cheek and said—

“Then what happened, Surma, tell me? From where did this face, radiant with intelligence, soft with affection and love, bright with smiles, and pure with tranquil grace, arise? Did I have any hope that my deep darkness would break? You are my Usha, my light, my hope. With what magic spell did you banish that darkness?” The Yubaraj kissed Surma’s face again and again. Surma said nothing; her eyes filled with tears of joy. The Yubaraj said,—

“After all this time, I have found my true refuge. From you, I first heard that I am not a fool, and I believed it, I understood it. It was from you I learned that intelligence is not a dark, small alley, crooked and uneven, but straight, level, and wide like a royal road. Before, I used to hate myself, neglect myself. I didn't dare to do anything. If my mind said, ‘This is right,’ my self-doubting nature would say, ‘It might not be right.’ I would endure whatever treatment I received, not trying to think for myself. After all this time, I feel that I am something, I am someone. I was hidden for so long; you have brought me out, Surma, you have discovered me. Now, whatever my mind says is good, I want to accomplish it at once. I have such faith in you that when you believe in me, I too can fearlessly believe in myself. Where was there so much strength in that delicate body that you have made me strong as well?”

But with a feeling of immense reliance, Surma wrapped her arms around her husband’s chest. With what a look of complete self-surrender she gazed at his face! Her eyes said, “I have nothing else, only you, and so I have everything!”

From childhood, Udayaditya had been enduring the neglect of his relatives, and sometimes, late on a quiet, deep night, he loved to discuss his old life story, told a hundred times, with Surma, part by part, step by step.

Udayaditya said, “How much longer can it go on like this, Surma? In the royal court, the courtiers look at me with a kind of pity, and in the inner quarters, Mother torments you; even the servants don't respect you much. I can't say anything properly to anyone; I remain quiet, I endure. You have a spirited nature, yet you too endure in silence. Since I couldn't make you happy, since you've only had to endure insult and pain from me, it would have been better if we had not married.”

Surma replied, “What are you saying, my lord? This is exactly the time when Surma is needed. What could I have done for you in times of happiness? In happy times, Surma is an object of luxury, a plaything. Overcoming all sorrow, this happiness awakens in my heart that I am of use to you, that I am enjoying the immeasurable joy that comes from suffering for your sake. My only sorrow is, why couldn't I bear all your troubles?”

The Yubaraj remained silent for a while and then said, “I don't worry so much for myself. I've gotten used to everything. But why should you endure insults for my sake? You have comforted me in my sorrow like a true wife, given me rest when I was weary, but I, like a husband, could not protect you from insult and shame. Because your father, the king of Shripur, does not acknowledge my father as his superior, does not accept his place under the dominion of Jessore, Father wants to maintain his own supremacy by showing you neglect. If someone insults you, he doesn't even listen. He thinks that making you his daughter-in-law is enough of an honor for you. Sometimes I think I can't take it anymore, that I'll leave everything and go away with you. I might have gone by now; only you have kept me here.”

3 Vibha's Terrible News and Udayaditya's Departure

The night grew deep. Many evening stars had set, and many late-night stars had risen. The footsteps of the guards at the fortress gate could be heard from a distance. The entire world was fast asleep. All the lamps in the city had been extinguished; the doors of the houses were shut; save for a chance jackal or two, there was not a soul to be seen. The door to Udayaditya's bedchamber was shut. Suddenly, someone began to knock on the door from outside. The flustered prince opened the door. "Why? Vibha? What has happened? Why have you come here so late at night?"

Readers are already aware that Vibha is Udayaditya's sister. Vibha said, “By now, I fear, all is lost!” Surma and Udayaditya asked in unison, “Why, what has happened?” In a voice trembling with fear, Vibha whispered something. As she spoke, she could no longer hold back and burst into tears, saying, “Dada, what will happen?”

Udayaditya said, “Then I must go!” Vibha cried out, “No, no, don't you go.”

Udayaditya: “Why, Vibha?”

Vibha: “What if Father finds out? What if he gets angry with you?”

Surma said, “Fie, Vibha! Is this the time to think of that?”

Udayaditya, having dressed and fastened a sword to his waistband, prepared to depart. Vibha, grabbing his hand, said, “Dada, don't you go. Send someone else. I am so scared.”

Udayaditya said, “Vibha, do not stop me now; there is no more time.” Saying this, he went out immediately.

Vibha, holding Surma's hand, said, “What will happen, sister? What if Father finds out?”

Surma replied, “What more can happen? I believe there is no affection left. It will not be a great loss if what little remains is also gone.”

Vibha said, “No, sister, I am terrified. What if Father causes some kind of harm? What if he punishes him?”

Surma, sighing deeply, said, “I believe that he who has no helper in this world has the greater help of Narayan. O Lord, let there be no stain upon Your name! Do not shatter this faith of mine!”

1 ウダヤディティヤの嘆きとスルマの慰め

夜は更けていた。夏のことである。風は止み、木々の葉一枚すら動かない。ジョソールの王太子、プラタパディティヤの長男であるウダヤディティヤは、寝室の窓辺に腰掛けていた。その傍らには、妻のスルマがいる。

スルマは言った。「愛しい方、耐え忍んでください、辛抱してください。いつか幸せな日が訪れますわ。」

ウダヤディティヤは言った。「私はもう何の幸せも望まない。望むのは、王宮に生まれなければ、王太子でなければよかったということだ。ジョソール王の最も小さく、最も取るに足らない民の、そのまた民であったなら。父上の長男でなければ、その王座、その富、名誉、名声、栄光のすべてを継ぐ唯一の後継者でなければよかったのだ!どのような苦行をすれば、この過去のすべてを覆すことができるのだろうか。」

スルマはひどく心を痛め、王太子の右手を両手で取り、ぎゅっと握りしめた。そして彼の顔を見つめ、ゆっくりと深いため息をついた。王太子の願いを叶えるためなら命も捧げられるが、命を捧げてもこの願いは叶えられない。それが悲しかった。

王太子は言った。「スルマ、王家に生まれたからこそ、私は幸せになれなかったのだ。王家では、誰もが後継者として生まれるばかりで、子として生まれる者はいないのだろう。父上は幼い頃から、私の一挙手一投足を試すように見てこられた。私が父上の築いた名誉と名声を保てるか、一族の面目を施せるか、王国の重責を担えるか、と。私のあらゆる行い、あらゆる仕草を、父上は慈しみの眼差しではなく、試すような眼差しで見てこられた。親族も、大臣も、廷臣たちも、民も、私の言葉一つ、行い一つを細かく取り上げては、私の未来を占ってきた。誰もが首を横に振って言った――いや、この危険な王国を彼に守ることはできまい、と。私は愚か者で、何も理解できないのだ。誰もが私をないがしろにし始め、父上は私を憎むようになられた。私に望みを抱くことを完全にやめてしまわれた。一度として気にかけてくださることもなかったのだ!」

スルマの目に涙が浮かんだ。彼女は言った。「まあ!なんてことを!」彼女は悲しみ、そして怒りを覚え、言った。「あなた様を愚か者だと思う者たちこそが愚か者ですわ!」

ウダヤディティヤはかすかに微笑み、スルマの顎を取って、怒りで赤らんだ彼女の顔を優しく揺らした。そして、一瞬のうちに真顔に戻って言った――

「いや、スルマ、本当に私には国を治める才覚がないのだ。それは、十分に証明されてしまった。私が十六歳の時、マハラジャは政務を学ばせるために、ホセンカリ管区の統治を私に任された。半年も経たないうちに、ひどい混乱が生じ始めた。税収は減り、民は私を祝福し始め、役人たちは私のことを王に訴え出た。宮廷の者たちの意見は皆一致した。王太子が民からかくも慕われているからには、彼に国を治めることなど到底できはしないだろう、と。それ以来、マハラジャは私の方をろくに見向きもなさらなくなった。こう言っておられた――『あの面汚しめは、まさにライガルの大おじバサンタ・ライのようになるだろう。シタールを弾いて踊り回り、国を破滅させるに違いない』と。」

スルマは再び言った。「愛しい方、耐え忍んでください、辛抱してください。千差万別あれど、お父上様ですもの。今はお国の獲得と拡大という一つの野心に心を満たされ、そこには慈しみの入る余地がないのです。その望みが満たされていくにつれて、慈しみの領域も広がっていくでしょう。」

王太子は言った。「スルマ、そなたの知性は鋭く、先見の明がある。だが、今回は見当違いだ。第一に、野心に終わりはない。第二に、父上の領土が広がれば広がるほど、それを失うことへの恐れもまた心の中で大きくなるだろう。王の務めが重くなればなるほど、父上は私をますますそれに不適格だと思うようになるのだ。」

スルマは見当違いをしていたわけではなく、ただそう信じたかっただけなのだ。信じる心は理屈を超える。彼女は、そうなってほしいと一心に願っていたのである。

2 スルマへのウダヤディティヤの告白

「周りからの慈悲の眼差しや、あるいは軽蔑に耐えきれず、私は時々ライガルの大おじ様のところへ逃げ込んでいました。父はたいして私の行方を探したりはしませんでした。ああ、なんと違う世界だったことか。そこでは木々や草花を目にし、村人の小屋を訪ねることができ、四六時中、王族の衣装をまとっている必要もありませんでした。それに、ご存じでしょう、大おじ様のいらっしゃるところには、悲しみや悩み、厳しい厳格さなど、その影すら存在できないのです。歌い、楽器を奏で、楽しげに周りを満たしてしまう。どこもかしこも歓喜と親愛の情に満ちていて、そこへ行くと私は自分がジョソールの王太子であることを忘れてしまうのでした。なんと心地よい忘却だったことか!そして私が十八歳の時、ある日ライガルに春の風が吹き、あたり一面が緑の木々に覆われた、そんな春に、私はルクミニーに出会ったのです」

スルマは思わず口を挟んだ。「そのお話は何度も伺いましたわ!」

ウダヤディティヤは言った。「もう一度聞いてくれ。時々、ある言葉が心の中を刺し続けることがある。その言葉を外に出さなければ、どうして生きていられようか。その話を君にすることは今でも恥ずかしく、辛い。だからこそ何度も繰り返して話すのだ。恥ずかしくもなく、辛くもなくなった日、その日こそ私の贖罪が終わったとわかるだろう。その日にはもう話すことはない」

スルマは言った。「何の贖罪ですの、愛しい方?もしあなたが罪を犯したのだとしても、それは罪の咎であって、あなたの咎ではありません。私はあなた様を存じ上げておりますわ。万物を見通すお方は、あなたの心をご覧になっていないとでも?」

ウダヤディティヤは続けた。「ルクミニーは私より三つ年上でした。彼女は若くして未亡人となり、大おじ様のご厚意でライガルに住むことを許されていたのです。彼女がどんな手練手管で最初に私を惹きつけたのか、もう思い出せません。その頃、私の心の中は真昼の太陽が燃え盛るようでした。あまりに光が眩しすぎて、何もよく見えなかった。周りの世界は光り輝く蒸気に覆われているかのようでした。全身の血が頭に上り、何一つ不思議なことも、不可能なこともないように思えました。道も、道ならぬ道も、方角も、すべてが一つに見えていた。これ以前にも、そしてこれ以後にも、私にこのようなことは一度もありませんでした。ジャガディーシュワルは、ご自身のどんな目的を果たすために、このちっぽけで、弱く、愚かな心に対抗して、たった一日だけ全世界を煽り立てたもうたのか。宇宙全体が共謀して、この私の小さな心を一瞬のうちに道ならぬ道へと誘い込んだかのようでした。ほんの一瞬――それ以上ではなかった。外の世界からの、一瞬の、しかし苛烈な一撃。そして一瞬のうちに、か弱い心の根は引き裂かれ、電光石火の速さで塵にまみれて倒れ伏した。その後、起き上がった時には、塵に汚れ、色褪せていた。その塵はもう拭えず、その汚れの跡はもう消えなかった。ビダータよ、私は何をしたというのです。一瞬のうちに私の人生の純白すべてを黒く塗りつぶすほどの罪とは?昼を夜に変えてしまうほどの罪とは?私の心の花園では、ジャスミンの花々さえも恥じらいで黒ずんでしまったかのようでした!」

語るうちに、ウダヤディティヤの白い顔は赤く染まり、大きな瞳はさらに見開かれ、頭のてっぺんから爪先まで稲妻のような震えが走った。スルマは喜びと、誇りと、そして苦しみを感じながら言った。「お願いです、その話はもうおやめください」

ウダヤディティヤは言った。「ゆっくりと血が冷めていき、すべてが本来の大きさで見えるようになった時、世界が熱に浮かされ、渦巻く脳髄と血走った眼を持つ酔っ払いの見る、霧深い回転する夢の景色ではなく、現実の営みの場であると思えるようになった時、私の心はどうだったか。どこからどこへの転落か!何万、何億クロールもの深さの奈落の底へ、暗く、より暗く、最も暗い夜の中へ、瞬く間に落ちていったのです。大おじ様は愛情を込めて私を呼び寄せました。しかし、どんな顔をしてあの方にお会いすればよいというのか。それ以来、私はライガルを去らねばなりませんでした。大おじ様は私に会わないと気が済まない方です。私を呼び寄せました。しかし私は恐ろしくて、どうしても行くことができませんでした。あの方は自ら、私と妹のビバに会いに来てくださいました。何のわだかまりもなく、何もかも。なぜ来ないのかと問い質すことさえしませんでした。ただ私たちに会い、陽気に振る舞い、そして帰って行かれるのでした」

ウダヤディティヤはわずかに微笑み、その大きな瞳を限りなく優しく柔らかな愛で満たして、スルマの顔を見つめた。スルマは、次にどんな言葉が来るかを悟った。顔はうつむき、わずかに身じろぎした。王太子は両手で彼女の両頬を包み、うつむいた顔を上げさせた。さらに近くに寄り、彼女の顔をそっと自分の肩に乗せた。左手で彼女の腰を抱き寄せ、深く穏やかな愛を込めてその額に口づけをして言った――

「そのあと、どうなったと思う、スルマ?この知性に輝き、慈愛に満ち、微笑みで明るく、穏やかさで清らかなこの顔は、どこから現れたのだろう?私のあの深い暗闇が晴れる望みなどあっただろうか?君は私のウシャ、私の光、私の希望だ。どんな魔法で、あの闇を消し去ってくれたのだい?」王太子は何度もスルマの顔に口づけした。スルマは何も言わず、喜びで瞳が涙でいっぱいになった。王太子は言った、――

「長い時を経て、私は真の拠り所を見つけた。君から初めて、私が愚か者ではないと聞き、それを信じ、それを理解することができた。君から、知性とは暗く狭い路地のように曲がりくねり、起伏があるものではなく、王道のように真っ直ぐで、平坦で、広いものだと教わった。以前の私は自分を憎み、軽蔑していた。何をするにも勇気が出なかった。心が『これが正しい』と言っても、自己不信に満ちた心が『それは正しくないかもしれない』と囁くのだ。人からどんな扱いを受けても、ただ耐えていた。自分で何かを考えようとはしなかった。長い時を経て今、私は自分が何者かであり、一人の人間であると感じられるようになった。これまで私は隠れていた。君が私を見つけ出してくれたのだ、スルマ。君が私を発見してくれた。今、私の心が良いと思うことを、私はすぐにでも実行したいと思う。君が私を信じてくれるのだから、私も恐れることなく自分を信じられる。君のその華奢な体に、私をも強くするほどの力がどこにあったというんだい?」

スルマは限りない信頼を込めて夫の胸に抱きついた。なんと完全な自己を捧げる眼差しで、彼の顔を見つめていたことか!その瞳は語っていた。「私にはもう何もありません。ただあなた様だけがおいでです。だからこそ、私にはすべてがあるのです!」

幼い頃から親族にないがしろにされてきたウダヤディティヤは、時折、静かで深い夜に、スルマに、あの百度語られた古びた人生の物語を、一段一段、少しずつ語り明かすのがとても好きだった。

ウダヤディティヤは言った。「こんな日々が、あとどれくらい続くのだろう、スルマ。あちらの王宮では廷臣たちがどこか憐れむような眼差しで私を見、こちらの奥御殿では母上が君を蔑んでいる。下働きの者たちでさえ、君をろくに敬おうとしない。私は誰にも強く何も言えず、黙って耐え忍ぶばかりだ。君は気性の激しい性格だが、君もまた黙って耐えている。君を幸せにしてやれず、私からは侮辱と苦しみしか与えられなかった。いっそ、私たちのこの結婚はなければよかったのかもしれない」

スルマは言った。「何を仰いますか、我が君?このような時こそ、スルマが必要なのではございませんか。幸せな時に、私はあなた様のために何ができたでしょう?幸せな時のスルマは、慰みもの、玩具にすぎません。すべての苦しみを乗り越えて、私の心には『私はあなた様のお役に立っているのだ』という喜びが湧き上がってきます。あなた様のために苦しむことにある、この上ない喜びを味わっているのです。ただ悲しいのは、あなた様の苦しみのすべてを、なぜ私が背負うことができないのか、ということです」

王太子はしばらく黙ってから言った。「私自身のことは、それほど案じてはいない。すべてに慣れてしまった。だが、私のために君がなぜ侮辱に耐えねばならないのだ?君は真の妻として、私の苦しみの時には慰めを、疲れの時には安らぎを与えてくれた。だが私は夫として、君を侮辱や恥辱から守ってやることができなかった。君の父上、シュリプルの王が私の父を第一人者と認めず、ジョソールの傘下に入ることを承知しないために、父上は君を冷遇することで自らの優位性を保とうとなさる。誰かが君を侮辱しても、父上は耳にも貸されない。君を息子の嫁にしたこと、それだけで君には十分な誉れだとお考えなのだ。時々思う、もう耐えられない、すべてを捨てて君を連れて逃げ出してしまいたいと。君が私を引き留めてくれているだけで、とっくにそうしていただろう」

3 ビバの恐ろしい知らせとウダヤディティヤの出発

夜が更けた。宵の明星の多くは沈み、深夜の星の多くが昇ってきた。城壁の門に立つ衛兵の足音が、遠くから聞こえてくる。全世界が眠りに落ちている。都の灯火はことごとく消え、家々の戸は閉ざされ、たまに見かけるジャッカルの他には人っ子一人いない。ウダヤディティヤの寝室の扉は閉ざされていた。突然、外から誰かが扉を叩いた。慌てふためいた若君は扉を開けた。「どうした? ビバか? 何があったのだ? こんな夜更けにどうしてここに?」

読者はすでにご存知の通り、ビバはウダヤディティヤの妹である。ビバは言った。「もう大変なことになってしまいました!」スルマとウダヤディティヤは同時に尋ねた。「どうしてだ、何があった?」ビバは恐怖に震える声で、ひそひそと何かを告げた。話しているうちにこらえきれなくなり、泣き出して言った。「兄上、どうしましょう?」

ウダヤディティヤは言った。「では、私は行く!」ビバは叫んだ。「だめ、だめです、行かないでください!」

ウダヤディティヤ。「なぜだ、ビバ?」

ビバ。「お父様がお知りになったら? あなた様をお怒りになったら?」

スルマは言った。「まあ、ビバ。今、そんなことを心配している場合ですか?」

ウダヤディティヤは衣服をまとい、腰帯に剣を差し、出発の準備をした。ビバは彼の手を取って言った。「兄上、行かないでください。誰か人を遣わしてください。私はとても怖いのです。」

ウダヤディティヤは言った。「ビバ、今は引き止めないでくれ。もう時間がないのだ。」そう言うと、すぐに出て行った。

ビバはスルマの手を取って言った。「どうしましょう、スルマ?お父様が気づかれたら?」

スルマは言った。「今さらどうなるというのです? お情けはもうほとんど残っていないでしょう。残っているわずかなものがなくなったとて、大した損害ではありませんわ。」

ビバは言った。「いいえ、スルマ、私はとても怖いのです。お父様が何か害をなされたら。罰をお与えになったら?」

スルマは深いため息をついて言った。「私は信じています。この世で誰の助けもない者には、ナーラーヤナ様がより大きな助け手となってくださると。おお、主よ、御名が汚されることがありませんように! どうか私のこの信仰を打ち砕かないでください!」